ধর্ম

ভিন্ন চোখে ফুটবল বিশ্বকাপ

আপনারা অনেকেই বিশ্বকাপ ফুটবলের খোঁজখবর রাখেন। অনেকে খেলাও দেখেন। এ সমস্ত খেলাধুলা দেখা ও ফলো করা হালাল নাকি হারাম—তার চাইতে বেশি প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন হলো, একজন আখেরাতে বিশ্বাসী ইমানদারের সঙ্গে এগুলো যায় কি না? খেলা-তামাশা মানেই হলো এটা সিরিয়াস কোনো বিষয় নয়। অথচ এসব খেলাধুলা আমাদের জীবনে এখন অত্যন্ত সিরিয়াস ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এটাকে ঘিরে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে, মারামারির ঘটনা ঘটে।

Advertisement

চার বছর পর পর বিশ্বকাপ ফুটবল ঘিরে যে উন্মাদনা হয়, সে উন্মাদনা এত ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে যে ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে ব্যয় হয়েছে ২২০ বিলিয়ন ইউএস ডলার। অথচ গোটা পৃথিবীতে প্রতি বছর ৮২ কোটি ৮০ লাখ মানুষ ক্ষুধার্ত থাকে, খাবারের অভাবে কষ্ট করে। বিশ্ব খাদ্য সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ডেভিড বিসলে বলেছেন, প্রতি বছর যে ৮২ কোটি ৮০ লাখ মানুষ ক্ষুধার্ত থাকে, এদের এক বছরের খাবারের ব্যবস্থা করা যায় মাত্র ৪০ বিলিয়ন ডলার হলে। অর্থাৎ, একটিমাত্র বিশ্বকাপ ফুটবল আসরের টাকা দিয়ে গোটা পৃথিবীর ক্ষুধার্ত মানুষের পাঁচ-ছয় বছরের ক্ষুধা নিবারণ করা সম্ভব।

প্রিয় ভাইয়েরা আমার! এই উন্মাদনা আমাদের দেশকে যেভাবে গ্রাস করছে, এটা সত্যিই উদ্বেগজনক। মাঠে খেলছে একজন; সে জিতলেও পুরস্কার পাবে, বিপুল টাকা পাবে, আবার হারলেও টাকা পাবে। সেখানে আমার কোনো জিতও নাই, হারও নাই। অথচ আমি এর পেছনে অন্ধের মতো সিরিয়াস হয়ে যাচ্ছি, নিজের আবেগ আর হার্ট নষ্ট করছি! এর চাইতে বেশি হাস্যকর, দুর্ভাগ্যজনক ও অযৌক্তিক কাজ পৃথিবীতে আর কী হতে পারে?

পৃথিবীর মুসলমানদের আত্মপরিচয় ও ইমানি চেতনা ধ্বংস করার জন্য যে সমস্ত সুক্ষ্ম আয়োজন রয়েছে, এই উন্মাদনা তারই একটি বড় অংশ। এটি বোঝার জন্য মস্ত বড় পণ্ডিত হওয়ার দরকার নেই; একটু চোখ-কান খোলা রাখলেই স্পষ্ট দেখা যায় যে, আমাদের আসল গন্তব্য ও পরিচয় ভুলিয়ে দিয়ে একটি কৃত্রিম মোহের মধ্যে ডুবিয়ে রাখার অপচেষ্টা চলছে। একজন প্রকৃত মুসলমান কখনোই এসবের সাথে নিজেকে জড়িয়ে রাখতে পারে না।

Advertisement

আরও পড়ুন ড. ইয়াসির ক্বাদি / ফুটবল বিশ্বকাপ: মুসলমান হিসেবে আমাদের করণীয়

কোরআনে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন জুয়া এবং মাদককে সরাসরি শয়তানের অপবিত্র কাজ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। আজ বিশ্বজুড়ে এই খেলাধুলাগুলোকে কেন্দ্র করেই মাদক ও জুয়ার সবচেয়ে বড় বড় আসর বসে। সেই সাথে জিনা-ব্যভিচারও ব্যাপকভাবে বাড়ে।

অথচ একজন মুসলমান, যিনি আল্লাহ, আখেরাত ও জান্নাতে বিশ্বাস করেন, তাঁর সুস্থ বিনোদনের জন্য ইসলাম বহু সুন্দর ও পবিত্র ব্যবস্থা রেখেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে দাম্পত্য জীবনে স্বামী-স্ত্রীর সুসম্পর্ক মানুষের বেঁচে থাকার অন্যতম বড় অনুঘটক।

আল্লাহ তাআলা পরিবার সৃষ্টি করেছেন যেন একে অন্যের মাধ্যমে প্রশান্তি লাভ করতে পারে, মানসিক সুখ পায় এবং সুন্দর সময় কাটে। আমাদের পরিবারগুলো আমাদের জন্য বড় আনন্দের উৎস। মায়ের মমতায় সন্তান আনন্দিত হয়, আবার সন্তানকে আদর করে মা পরিতৃপ্ত হন। বাবার স্নেহ সন্তানকে উজ্জীবিত করে, আর সন্তানের শ্রদ্ধা বাবাকে আনন্দ দেয়। ভাই-বোনের পারস্পরিক সৌহার্দ্য পুরো পরিবারে সুখের হাওয়া বইয়ে দেয়। মুসলমানদের আনন্দের জন্য তো এমন বহু পবিত্র উপলক্ষ রয়েছে। 

পক্ষান্তরে, পশ্চিমাদের পারিবারিক ব্যবস্থা আজ ভেঙে পড়েছে, তাদের পারস্পরিক সম্পর্কগুলো পুরোপুরি যান্ত্রিক ও প্লাস্টিকের মতো প্রাণহীন। তাই হয়তো তাদের জন্য এই কৃত্রিম বিনোদনের আসরগুলো সাময়িক মানসিক সান্ত্বনা হতে পারে, মাদক আর জুয়ায় ডুবে থেকে তারা একটুখানি আনন্দ পাওয়ার চেষ্টা করতে পারে। কিন্তু একজন মুসলিমের জীবনধারা ও সংস্কৃতির সাথে তো এটি কোনোভাবেই মেলে না।

Advertisement

দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের দেশেও এখন খেলাধুলাকে কেন্দ্র করে জুয়ার ভয়াবহ প্রচলন শুরু হয়েছে। ফুটবল বা ক্রিকেট বিশ্বকাপ এলে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বড় বড় মনিটরে খেলা দেখানোর যে ব্যবস্থা করা হয়, সেখানে রীতিমতো বাজি ও জুয়ার আসর বসে। গ্রামের অনেক সরল সোজা ছেলেমেয়ে সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যায়।

বিগত বছরগুলোতে ক্যাসিনো কাণ্ডের মাধ্যমে বহু কোটিপতি ও লাখোপতি যেভাবে রাস্তায় ভিখারি হয়েছে, তা নিয়ে গণমাধ্যমে প্রচুর সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে এবং অনেকেই গ্রেফতার হয়েছে। বর্তমানে সেই জুয়াকে অ্যাপসের মাধ্যমে মানুষের পকেটে পকেটে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমাদের সরকার ও প্রশাসন যে জুয়া এবং অপরাধের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত লড়াই করে যাচ্ছে, সমাজকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে—সেই জুয়া আমাদের দেশে সবচেয়ে বেশি নীরব প্রবেশাধিকার পাচ্ছে এই তথাকথিত খেলাধুলার হাত ধরে। আন্তর্জাতিক ও অনলাইন টুর্নামেন্টগুলোকে কেন্দ্র করে আমাদের তরুণ ও যুবসমাজের মধ্যে জুয়া খেলার প্রবণতা ব্যাপকভাবে বাড়ছে। দেশের নীতিনির্ধারকদের এই বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নজর দেওয়া উচিত। এই উন্মাদনা থামাতে পারলে তরুণদের বখে যাওয়া এবং জুয়ায় আসক্ত হওয়ার প্রবণতা অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

আরও পড়ুন জীবনের ম্যাচ একটি ফুটবল ম্যাচের মতোই: মুফতি মেন্‌ক

অত্যন্ত আফসোসের বিষয় যে, অনেক নামাজি ও দ্বীনদার মানুষও পরম আগ্রহে এসব খেলাধুলার পুঙ্খানুপুঙ্খ খোঁজখবর রাখেন! ভাইয়েরা আমার, আসুন আমরা আল্লাহর কাছে খাঁটি মনে তওবা করি, কারণ প্রতিটি সেকেন্ডের হিসাব আমাদের আল্লাহর দরবারে দিতে হবে। পবিত্র কোরআনের সুরা মুমিনুনের শুরুতে আল্লাহ তাআলা সফল মুমিন ও জান্নাতুল ফেরদাউসের অধিকারীদের যে বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন, তার অন্যতম হলো, তারা সমস্ত অনর্থক ও ক্রিয়াকর্ম থেকে নিজেদের দূরে রাখে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, একজন মানুষের ইসলাম তখনই সুন্দর হয়, যখন সে অনর্থক বিষয় পরিহার করে।

যে খেলাধুলা আমাদের ইহকালীন কোনো কল্যাণ বয়ে আনে না এবং আখেরাতেও যার কোনো প্রতিদান নেই, এমন একটি অহেতুক বিষয়ের পেছনে শত-সহস্র কর্মঘণ্টা অপচয় করা চরম আত্মঘাতী কাজ। এই উন্মাদনার কারণে আমাদের শিক্ষা, কর্মজীবন ও অর্থনীতি আজ ধ্বংসের মুখে পড়ছে। একটি পুরো জাতির বড় অংশ যখন আপাতদৃষ্টিতে কোনো উপকারিতা না থাকা সত্ত্বেও এমন এক পাগলামির পেছনে ঝাঁপিয়ে পড়ে, তার চেয়ে দুর্ভাগ্যজনক আর কিছুই হতে পারে না।

সমাজকে এই ধ্বংসাত্মক পথ থেকে ফিরিয়ে আনার জন্য আজ সত্যিকারের দেশপ্রেমিক, উম্মাহর দরদী ও সমাজ সংস্কারক মানুষের বড্ড অভাব। আল্লাহ তাআলা আমাদের আলেম ও সমাজনেতাদের এই কল্যাণকর কাজটি করার তওফিক দান করুন। আসুন, আমরা সবাই মিলে এই মোহাচ্ছন্ন উন্মাদনা ও পাগলামি থেকে নিজেদের এবং আমাদের পরিবারকে বাঁচানোর চেষ্টা করি।

আরও পড়ুন আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের জার্সি পরে নামাজ পড়া কি জায়েজ?

সূত্র: শায়খ আহমাদুল্লাহর অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত বক্তব্যের ভিডিও থেকে লেখাটি তৈরি করা হয়েছে।

ওএফএফ