খেলাধুলা

গণিতবিদের ভবিষ্যদ্বাণীতে আলোচনায় নেদারল্যান্ডস, এবার কি ইতিহাস বদলাবে?

নেদারল্যান্ডস। প্রতি বিশ্বকাপ আসরেই ফেবারিট হিসেবে মাঠে নামলেও শিরোপা জয়ের স্বাদ নিতে পারেনি দেশটি। তবে, বেশ কয়েকবার সেমিফাইনাল, এমনকি ফাইনালেও খেলেছে দলটি। ইয়োহান ক্রুইফ, মার্কো ফন বাস্তেন, ওয়েইসলি স্নাইডার, আরিয়ান রোবেনদের মতো খেলোয়াড়রা ডাচ ফুটবল ইতিহাসে কিংবদন্তী হয়ে আছেন। যুগে যুগে তাদের পায়ের ছন্দে মেতেছে ফুটবল বিশ্ব। নেদারল্যান্ডসের এবারের স্কোয়াডেও একাধিক তারকা ফুটবলার রয়েছেন।

Advertisement

নেদারল্যান্ডসের ফুটবল ইতিহাসের দিকে তাকালে ফুটবলপ্রেমীদের মনে আফসোস থেকেই যাবে। তারাই একমাত্র দল যারা ১৯৭৪,১৯৭৮ এবং ২০১০ সাল মিলিয়ে সর্বমোট তিনবার বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলার পরেও কোনো শিরোপা ঘরে তুলতে পারেনি। এর বাইরে ১৯৯৮ এবং সর্বশেষ ২০১৪ বিশ্বকাপেও সেমিফাইনাল খেলেছে তারা।

এবারের বিশ্বকাপে সেভাবে আলোচনায় নেই ইউরোপের এই দেশটি। স্পেন, ফ্রান্স কিংবা আর্জেন্টিনার মতো ফেবারিটদের ভিড়ে দলটি অনেকটা আন্ডারডগ হিসেবেই বিশ্বকাপ যাত্রা শুরু করেছে। এমনকি প্রথম ম্যাচে এশিয়ার দেশ জাপানের সাথে ২-২ গোলের ড্র করায় আলোচনার টেবিল থেকে ছিটকে পড়েছে নেদারল্যান্ডস।

নেদারল্যান্ডসের ফুটবলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ সাফল্য হয়ত ১৯৮৮ সালের উয়েফা ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ জয়। সেই একবারই তারা বড় কোনো টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল।

Advertisement

কিন্তু ফুটবল দুনিয়ার সাড়াজাগানো ট্যাকটিক টোটাল ফুটবলের জন্ম এই নেদারল্যান্ডসেই। টোটাল ফুটবল হলো এমন এক খেলার ধরন যেখানে খেলোয়াড়দের কোনো নির্ধারিত পজিশন থাকে না। ম্যাচের গতিপ্রকৃতি অনুযায়ী যে কোনো খেলোয়াড় যে কোনো পজিশনের দায়িত্ব পালন করতে প্রস্তুত থাকেন।

তবে ফুটবল ভক্তদের কাছে ২০২৬ বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডসের নতুন করে আলোচনায় আসার প্রধান কারণ মূলত একজন জার্মান গণিতবিদ! জার্মান গণিতবিদ জোয়াকিম ক্লেমেন্ট ২০২৬ বিশ্বকাপ নিয়ে একটি চমকপ্রদ ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। তার মতে, এবারের আসরে চ্যাম্পিয়ন হবে নেদারল্যান্ডস।

এ ভবিষ্যদ্বাণীতে কারো কারো চোখ কপালে উঠতে পারে। কিন্তু ক্লেমেন্ট অতীতের তিনটি বিশ্বকাপের বিজয়ী দলের সঠিক ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। যেমন — ২০১৪ সালে ব্রাজিলে নিজ দেশ জার্মানি, ২০১৮ সালে রাশিয়ায় ফ্রান্স এবং ২০২২ সালে কাতারে আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ন হবে বলে মত দিয়েছিলেন এই গণিতবিদ। এই তথ্য জানার পর ফুটবল ভক্তদের একটু ঝাঁকুনি লাগতে পারে। তবে, নড়েচড়ে বসে কিছুটা হিসেব মিলিয়ে নিতে পারেন আপনিও।

ক্লেমেন্ট জানান, শুরুতে তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন যে বিশ্বকাপের বিজয়ী দল নির্ভুলভাবে ভবিষ্যদ্বাণী করা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু ২০১৪ সালে প্রথমবার তার মডেল ব্যবহার করে জার্মানির জয় সঠিকভাবে অনুমান করার পর তিনি নিজেই অবাক হয়ে যান।

Advertisement

জার্মান সংবাদমাধ্যম ডের স্পিগেলকে তিনি বলেন, ‘প্রথমবার যখন জার্মানি ব্রাজিলে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হলো, আমি ভীষণভাবে হতবাক হয়েছিলাম। বিশেষ করে তখন সবাই বলছিল, দক্ষিণ আমেরিকায় ইউরোপীয় কোনো দল কখনও বিশ্বকাপ জেতেনি। এই ইতিহাসের বিপরীতে এটা ঘটেছিল।’

ক্লেমেন্টের এই পূর্বাভাস এখন ফুটবল বিশ্বে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে, বিশেষ করে নেদারল্যান্ডসের সম্ভাবনা নিয়ে। এবারের আসরে নেদারল্যান্ডসকে খুব বেশি শক্তিশালী দল বলবার যেমন সুযোগ নেই, তেমনই তাদের বাতিলের খাতায় ফেলে দেওয়ারও কোনো উপায় নেই। চলমান বিশ্বকাপ ফুটবল বিশ্বকাপে রোনাল্ড কোম্যানের অধীনে সেই চিরাচরিত ৪-৩-৩ ফর্মেশনেই তাদের মাঠে নামতে দেখা যাচ্ছে।

শুরুর একাদশে গোলবারের নিচে প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব ব্রাইটনের গোলরক্ষক বার্ট ভারব্রুগ্গেনকেই শুরুর একাদশে দেখা যাচ্ছে। কোনো ইনজুরিজনিত ঘটনা না ঘটলে পুরো আসর জুড়ে তাকেই মূল একাদশে দেখতে পাওয়া যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তার ব্যাক আপ হিসেবে আছেন আরেক প্রিমিয়ার লিগ ক্লাব সুন্ডারল্যান্ডের গোলরক্ষক রবিন রোয়েফস এবং বুন্দেসলিগার ক্লাব বায়ার লেভারকুসেনের গোলরক্ষক মার্ক ফ্লেক্কেন।

ডিফেন্সের দিকে তাকালে নেদারল্যান্ডসের সম্ভাব্য লাইন আপ থেকে একটু ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়। মূল একাদশে লেফট ব্যাক হিসেবে জাপানের বিপক্ষে শুরুর একাদশে ছিলেন টটেনহামের ডিফেন্ডার মিকি ভ্যান ডি ভেন, যিনি মূলত একজন সেন্টার ব্যাক।

কিন্তু ২৬ সদস্যের দলে থাকা একমাত্র লেফট ব্যাক চেলসিতে খেলা জরেল হাতো অভিজ্ঞতার দিক থেকে পিছিয়ে থাকায় পুরো টুর্নামেন্টেই ফন ডি ভেনকে তার মূল পজিশন থেকে সরে এসে লেফট ব্যাক হিসেবেই খেলতে দেখা যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে দলে থাকা আরেক সেন্টার ব্যাক নাথান আকেও লেফট ব্যাকে খেলতে পারেন যা কোচ রোনাল্ড কোম্যানের একাদশের গভীরতার দিকেই ইঙ্গিত করে।

রাইট ব্যাক পজিশনে কোনো সন্দেহ ছাড়াই ড্যানজেল ডামফ্রিস শুরুর একাদশে থাকতে চলেছেন। ইন্টার মিলান থেকে সদ্য রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেওয়া এই ডিফেন্ডারের ব্যাক আপ হিসেবে রয়েছেন প্রিমিয়ার লিগে খেলা লুতসারেল গিরত্রুইদা।

সেন্টার ব্যাক হিসেবে শুরুর একাদশে পাকাপোক্ত অবস্থানে আছেন লিভারপুল তারকা ভার্জিল ফন ডাইক। তাকে সঙ্গ দেবেন ব্রাইটনে খেলা জ্যান পল ফন হেকে।

তবে ইনজুরিজনিত কারণে নেদারল্যান্ডস জাতীয় দল থেকে ছিটকে গেছেন একাধিক তারকা ডিফেন্ডার। এদের মধ্যে রয়েছেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ম্যাথিয়াস ডি লিখট, আর্সেনালের জুরিয়েন টিম্বার এবং লিভারপুলের ফুলব্যাক জেরেমি ফ্রিম্পং।

মিডফিল্ডের দিকে তাকালে নেদারল্যান্ডসের শক্তিমত্তা বোঝা যায় আরও ভালোভাবে। শুরুর একাদশে যে তিনজন রয়েছেন তারা হলেন বার্সেলোনার মাঝমাঠের প্রাণ ফ্র্যাঙ্কি ডি ইয়ং,লিভারপুলের মিডফিল্ডার রায়ান গ্র্যাভেনবার্খ এবং ম্যানচেস্টার সিটির মিডফিল্ডার টিজানি রাইন্ডার্স।

মিডফিল্ডে নেদারল্যান্ডস যেমন গ্র্যাভেনবার্খের থেকে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে শারীরিক শক্তিমত্তায় এগিয়ে বল দখলে নিতে পারবে তেমনই রাইন্ডার্সের মতো সৃজনশীল মিডফিল্ডারের থেকে প্রতিপক্ষের ডি বক্সে বলের সরবরাহও পাবে। এছাড়া ফ্র্যাঙ্কি ডি ইয়ংয়ের মতো একজন ডিপ লায়িং প্লেমেকারও গোলের সুযোগ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারবেন, যা নেদারল্যান্ডসের মাঝমাঠকে শক্তিশালী হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত করে।

এছাড়া ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডে তাদের ব্যাকআপ হিসেবে দলে রয়েছেন টেউন কুপমেইনার্স এবং মার্টেন ডি রুন। এছাড়া ম্যাটস উইফার মূলত রাইট ব্যাক হলেও তিনি সেন্ট্রাল মিড এবং ডিফেন্সিভ মিডেও খেলতে পারেন। এছাড়া সেন্ট্রাল মিডফিল্ড এবং এটাকিং মিডফিল্ডে বদলি অপশন হিসেবে আরও রয়েছেন গুস টিল এবং কুইন্টেন টিম্বার।

প্রথম ম্যাচের পর ফ্র্যাঙ্কি ডি ইয়ংয়ের ইনজুরির বিষয়ে বিভিন্ন খবর পাওয়া যাচ্ছে। সেক্ষত্রে দ্বিতীয় ম্যাচে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ সুইডেনের বিপক্ষে ব্যাক আপ বেঞ্চ থেকে কেউ সুযোগ পেতে পারেন তার জায়গায়।

নেদারল্যান্ডসের ফরোয়ার্ড লাইন আপে একাধিক নাম থাকলেও শুরুর তিনজনের নাম মোটামুটি পরিষ্কার। লেফট উইংয়ে লিভারপুল তারকা কোডি গাকপো, রাইট উইংয়ে প্রিমিয়ার লিগের আরেক ক্লাব ওয়েস্টহ্যামে খেলা ক্রিসেন্সিও সামারভিয়ে এবং সেন্টার ফরোয়ার্ড হিসেবে থাকতে চলেছেন রোমার ফরোয়ার্ড ডনইয়েল মালেন। বয়সের দিকে তাকালে তাদের সবাই মোটামুটি তরুণ, তবে অভিজ্ঞতার দিক থেকেও তাদের পিছিয়ে রাখবার সুযোগ নেই।

চলতি মৌসুমে লিভারপুলের জার্সিতে কোডি গাকপো ৩৬ ম্যাচে গোল করেছেন ৭টি এবং অ্যাসিস্ট করেছেন ৫টি। সামারভিয়ে করেছেন ৩১ ম্যাচে ৫ গোল এবং ২ অ্যাসিস্ট। সংখ্যাগুলো খুব বড় না হলেও এদিক থেকে এগিয়ে আছেন দলেন নম্বর নাইন ডনইয়েল মালেন। ইতালিয়ান জায়ান্ট রোমার জার্সিতে চলতি মৌসুমে ১৮ ম্যাচে গোল করেছেন ১৪টি এবং এসিস্ট করেছেন ২ টি।

উইঙ্গারদের ব্যাকআপ হিসেবে দলে রয়েছেন গালাতাসারেইয়ের নোয়া ল্যাং এবং আরেক ডাচ কিংবদন্তী ফুটবলার প্যাট্রিক ক্লাইভার্টের ছেলে জাস্টিন ক্লাইভার্ট। তবে জাস্টিন মূলত এটাকিং মিডফিল্ডার হলেও সমানতালে খেলতে পারেন দুই উইংয়ে। দলে উইঙ্গারের সংকট থাকায় তাকে উইংয়ে খেলানোর সম্ভাবনাই বেশি।

এর বাইরে সেন্টার ফরোয়ার্ড হিসেবে ব্যাক আপ হিসেবে রয়েছেন আরও তিনজন ফরোয়ার্ড। সুন্ডারল্যান্ডের ব্রায়ান ব্রবি, কোরিন্থিয়ান্সের মেম্ফিস ডিপাই এবং আয়াক্সের উওট উইঘর্স্ট। অভিজ্ঞতার বিচারে ডিপাই এবং উইঘর্স্ট অনেকটা এগিয়ে থাকায় দলের শিরোপা জয়ের লড়াইয়ে তাদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিশ্বকাপের শিরোপাখরা নেদারল্যান্ডসের এই তারুণ্যনির্ভর দল কাটাতে পারবে কিনা তা দেখা যাবে মাঠের লড়াইয়ে। ডাচ ভক্তরাও জার্মান গণিতবিদ জোয়াকিম ক্লেমেন্টের ভবিষ্যদ্বাণীর বাস্তবায়নের আশায় আরও একবার বুক বাঁধবে। তবে বাস্তবতা হলো ডাচদের থেকেও বেশি ফেবারিট দল এবারের আসরে রয়েছে।

আরএএইচইউএল/আইএন