বয়স ৪০ পেরোনোর পর মানুষের শরীরে ধীরে ধীরে নানা পরিবর্তন দেখা দিতে শুরু করে। কর্মব্যস্ততা, অনিয়মিত জীবনযাপন, মানসিক চাপ, ঘুমের অভাব কিংবা দীর্ঘদিনের অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস-সবকিছুর প্রভাব পড়তে থাকে শরীরে। বিশেষ করে অনেক বাবাই পরিবারের দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে নিজের স্বাস্থ্যের দিকে তেমন গুরুত্ব দেন না। অসুস্থতা গুরুতর না হওয়া পর্যন্ত তারা চিকিৎসকের কাছেও যেতে চান না।
Advertisement
কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেক বড় রোগের লক্ষণ শুরুতে খুব স্পষ্টভাবে বোঝা যায় না। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করলে রোগ দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হয় এবং চিকিৎসাও সহজ হয়। তাই ৪০ পেরোনো বাবাদের জন্য কিছু স্বাস্থ্য পরীক্ষা অত্যন্ত জরুরি।
আরও পড়ুন পিঠের ব্যথায় ভুগছেন? সমাধান এই ৪ ব্যায়ামে কেন ৪০-এর পর স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়ানো জরুরি?৪০ বছরের পর শরীরের বিপাকক্রিয়া ধীরে হতে শুরু করে। একই সঙ্গে বাড়তে পারে- উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, কোলেস্টেরল, কিডনি সমস্যা, লিভারের জটিলতা ও হাড়ের দুর্বলতা। অনেক সময় এসব রোগ দীর্ঘদিন নীরবে শরীরে বাসা বাঁধে। তাই উপসর্গ না থাকলেও নিয়মিত কিছু পরীক্ষা করানো জরুরি। যেমন-
রক্তচাপ পরীক্ষাউচ্চ রক্তচাপকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ এটি অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই হৃদরোগ, স্ট্রোক কিংবা কিডনি সমস্যার ঝুঁকি বাড়ায়। হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমাতে, স্ট্রোক প্রতিরোধে ও কিডনি সুরক্ষায় এই পরীক্ষা জরুরি। অন্তত বছরে একবার রক্তচাপ পরীক্ষা করা উচিত। যদি আগে থেকেই উচ্চ রক্তচাপ থাকে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ।
Advertisement
বাংলাদেশে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে ৪০-এর পর ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। এমনকি অনেক মানুষ দীর্ঘদিন বুঝতেই পারেন না যে তাদের ডায়াবেটিস রয়েছে। তাই লক্ষণ না থাকলেও ফাস্টিং ব্লাড সুগার, এইচবিএ১সি ও র্যান্ডম ব্লাড সুগার পরীক্ষা করা জরুরি।
কোলেস্টেরল পরীক্ষাঅতিরিক্ত কোলেস্টেরল ধমনিতে চর্বি জমায়, যা হৃদরোগের অন্যতম কারণ। এই পরীক্ষায় যা দেখা হয় খারাপ কোলেস্টেরল, ভালো কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইড। উচ্চ কোলেস্টেরল থাকলেও অনেক সময় শরীরে কোনো উপসর্গ দেখা যায় না। কিন্তু ভেতরে ভেতরে হার্টের ক্ষতি হতে থাকে।
হৃদরোগ পরীক্ষা৪০-এর পর পুরুষদের হৃদরোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। এজন্য প্রয়োজন ইসিজি, ইকোকার্ডিওগ্রাম, ট্রেডমিল পরীক্ষা (টিএমটি) ও কার্ডিয়াক চেকআপ।
আরও পড়ুন গরমেও সর্দি-কাশি-গলাব্যথায় ভুগছেন? জানুন প্রতিকার যাদের বেশি সতর্ক হওয়া উচিত ধূমপায়ী উচ্চ রক্তচাপ আছে ডায়াবেটিস আছে অতিরিক্ত মানসিক চাপ থাকে লিভার ও কিডনি ফাংশন টেস্টঅনেক সময় লিভার বা কিডনির সমস্যা দীর্ঘদিন ধরা পড়ে না। নিয়মিত পরীক্ষা করলে প্রাথমিক পর্যায়ে সমস্যার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা- সিরাম ক্রিয়েটিনিন, ইউরিয়া, এসজিপিটি/এসজিওটি ও মূত্র নিয়মিত পরীক্ষা।
Advertisement
৪০ পেরোনোর পর পুরুষদের মধ্যে প্রোস্টেটের সমস্যা দেখা দিতে পারে। যেমন- ঘন ঘন প্রস্রাব, প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া, রাতে বারবার বাথরুমে যাওয়া। এজন্য জরুরি পিএসএ পরীক্ষা ও ডিজিটাল রেক্টাল পরীক্ষা। সমস্যা হলে দ্রুত ইউরোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
আরও পড়ুন স্তন ক্যানসার / নতুন পরীক্ষায় কেমোথেরাপি ছাড়াই মিলতে পারে মুক্তি চোখের পরীক্ষাবয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চোখের সমস্যা বাড়তে পারে। এ সময় গ্লুকোমা, ছানি, দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া ও ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি এর ঝুঁকি বাড়ে। তাই অন্তত ১-২ বছর পরপর চোখ পরীক্ষা করা ভালো।
দাঁত ও মাড়ির পরীক্ষাঅনেকেই দাঁতের স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দেন না। অথচ মাড়ির সংক্রমণ হৃদরোগের ঝুঁকিও বাড়াতে পারে। বছরে অন্তত একবার ডেন্টাল চেকআপ করা উচিত।
ওজন ও বিএমআই পরীক্ষাঅতিরিক্ত ওজন শুধু বাহ্যিক সমস্যা নয়; এটি ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপের বড় কারণ। তাই নিয়মতো ওজন, কোমরের মাপ ও বিএমআই পরীক্ষা করতে হবে। একই সঙ্গে নিয়মিত ব্যায়াম ও সুষম খাদ্যাভ্যাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ক্যানসার স্ক্রিনিংকিছু ক্যানসার প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা গেলে চিকিৎসা অনেক সহজ হয়। এজন্য কোলন ক্যানসার পরীক্ষা, ফুসফুসের পরীক্ষা (ধূমপায়ীদের জন্য) ও প্রোস্টেট ক্যানসার স্ক্রিনিং জরুরি। পরিবারে ক্যানসারের ইতিহাস থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষা করানো উচিত।
আরও পড়ুন বেশি মাংস খেয়ে বদহজম? জেনে নিন দ্রুত সমাধান মানসিক স্বাস্থ্যের দিকেও নজর জরুরি৪০-এর পর অনেক পুরুষ কর্মক্ষেত্র, পরিবার ও আর্থিক চাপের কারণে মানসিক ক্লান্তিতে ভোগেন। কিন্তু তারা সাধারণত নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেন না। মনে রাখতে হবে মানসিক স্বাস্থ্যও শারীরিক স্বাস্থ্যের মতোই গুরুত্বপূর্ণ।
সুস্থ থাকতে যেসব অভ্যাস জরুরি নিয়মিত হাঁটুন: প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটার অভ্যাস হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়। পর্যাপ্ত ঘুমান: প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতিদিন ৭-৮ ঘণ্টা ঘুম জরুরি। ধূমপান ও অতিরিক্ত চা-কফি কমান: ধূমপান হৃদরোগ ও ক্যানসারের অন্যতম বড় কারণ। বেশি পানি পান করুন: শরীরের বিপাকক্রিয়া ঠিক রাখতে পানি গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করুন: শরীর খারাপ হওয়ার অপেক্ষা না করে বছরে অন্তত একবার পূর্ণ স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো উচিত। আরও পড়ুন জীবনযাপনেই লুকিয়ে পুরুষের বন্ধ্যত্বের ঝুঁকি পরিবারেরও ভূমিকা আছেঅনেক বাবাই নিজের স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দিতে চান না। তারা ভাবেন, ‘আমি ঠিক আছি।’ তাই পরিবারের সদস্যদেরও সচেতন হতে হবে। বাবাকে নিয়মিত চেকআপে উৎসাহ দিন, স্বাস্থ্যকর খাবারের অভ্যাস তৈরি করুন, হাঁটার সঙ্গী হন ও মানসিক চাপ কমাতে পাশে থাকুন। কারণ একজন সুস্থ বাবা মানে একটি নিরাপদ পরিবার।
বয়স বাড়া স্বাভাবিক, কিন্তু অসচেতনতা নয়। ৪০ পেরোনোর পর নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা শুধু রোগ শনাক্ত করার জন্য নয়, বরং সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবন ধরে রাখার জন্যও জরুরি। এই বাবা দিবসে বাবাকে শুধু শুভেচ্ছা নয়, স্বাস্থ্য সচেতনতার উপহারও দিন। কারণ পরিবারের জন্য যিনি সারাজীবন ভাবেন, তার নিজের সুস্থ থাকাটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
জেএস/