দেশের অন্যতম দর্শনীয় ধর্মীয় স্থান সিলেটের হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার। প্রতিদিন হাজারো ভক্ত, পর্যটক ও দর্শনার্থী মাজারে এসে জিয়ারত করেন। মাজার সংলগ্ন পুকুরে বড় বড় গজার মাছ, জালালি কবুতর, চিত্রনায়ক সালমান শাহ’র কবরসহ ঐতিহাসিক স্থাপনা ও নানা নিদর্শন দেখতে ভিড় জমান দর্শনার্থীরা। কথিত সোনার কই-মাগুর দেখতেও থাকে দর্শনার্থীদের দীর্ঘ সারি।
Advertisement
তবে শাহজালাল (রহ.)-এর ব্যবহৃত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিচিহ্ন- তলোয়ার, খড়ম ও থালা-বাটির দেখা মেলে না দর্শনার্থীদের। মাজারের নিয়ন্ত্রণাধীন ‘সরেকওম’ ও ‘মুফতি’ দুই গোষ্ঠীর দুইটি বাড়িতে রয়েছে এসব স্মৃতিচিহ্ন। যার কারণে আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ মানুষ এসব ঐতিহাসিক নিদর্শন দেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। তবে তলোয়ার, খড়ম ও থালা-বাটির খবর যারা জানেন, তারা দুই বাড়ি ঘুরে ঘুরে অনুমতি সাপেক্ষে এসব নিদর্শন দেখার সুযোগ পান।
এদিকে শাহজালাল (রহ.) এর ব্যবহৃত এসব ঐতিহাসিক নিদর্শন সংরক্ষণে রাখতে জাদুঘর স্থাপনের নির্দেশ রয়েছে উচ্চ আদালতের। এক আইনজীবীর রিটের প্রেক্ষিতে গত ৫ মার্চ বিচারপতি রাজিক-আল-জলিল ও বিচারপতি আনোয়ারুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এক রিট আবেদনের শুনানি শেষে এ আদেশ দেন। তবে উচ্চ আদালতের আদেশ থাকলেও এখনও শাহজালালের ব্যবহৃত এসব ঐতিহাসিক নিদর্শন দুই গোষ্ঠীর কাছেই রয়েছে।
প্রতি শুক্রবার শাহজালালের মাজারে সবচেয়ে বেশি দর্শনার্থীর সমাগম ঘটে। মাজার সংলগ্ন মসজিদে জুমার নামাজ পড়তে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার ভক্ত-আশেকান ও দর্শনার্থীরা ছুটে আসেন। এদিন মাজারের ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো দেখতে উপচে পড়া ভিড় থাকে।
Advertisement
মাজার-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর ব্যবহৃত তলোয়ার ও কাঠের খড়ম বর্তমানে দরগাহ এলাকার মুফতি নাজিমুদ্দিন আহমদের বাড়িতে সংরক্ষিত রয়েছে। অন্যদিকে তার ব্যবহৃত বলে প্রচলিত থালা-বাসন বা প্লেট-বাটি রাখা হয়েছে মোতওয়াল্লি বাড়িতে। কোনো দর্শনার্থী আগ্রহ প্রকাশ করলে এবং অনুমতি নিলে এসব সামগ্রী দেখানো হয়। তবে এগুলো প্রদর্শনের জন্য মাজার এলাকায় কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা নেই।
গত শুক্রবার স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে শাহজালালের মাজারে আসেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরের কোমারশীল মোড় এলাকার বাসিন্দা জামাল উদ্দিন। তিনি আগে থেকেই জানতেন হযরত শাহজালালের ব্যবহৃত তলোয়ার, খড়ম ও থালাবাটি দুইটি বাড়িতে রাখা আছে। কিন্তু কোন দুই বাড়িতে সেগুলো রয়েছে ঠিকানা জানতেন না। পরে স্থানীয় একজনের সহযোগিতা নিয়ে থাকা মুফতি গোষ্ঠীর একটি বাড়িতে গিয়ে তলোয়ার ও খড়ম আর সরেকওম গোষ্ঠীর মোতোয়াল্লির বাড়িতে গিয়ে থালাবাটি দেখে আসেন। কিন্তু তাদেরকে কোনো ছবি তুলতে দেওয়া হয়নি।
সরেজমিনে ওই মাজার ভক্ত দম্পতির সঙ্গে গেলে দেখা যায়, মুফতি বাড়ির (বাসা নম্বর ৪৭-৫৫) একটি গলিতে ঢুকে ভেতরের একটি বাড়িতে স্টিলের গ্রিলের ভেতর বারান্দায় রাখা রয়েছে হযরত শাহজালালের ব্যবহৃত তলোয়ার ও কাঠের খড়ম। দর্শনার্থীরা বাইরে থেকে আওয়াজ দিলে একজন ব্যক্তি এসে বারান্দায় লাইট জ্বালান। পরে এক মিনিটের মধ্যে দেখা শেষ হওয়ার পরপরই বারান্দার লাইট বন্ধ করে চলে যান।
পরে ওই দম্পতির সঙ্গে মোতোয়াল্লির বাড়িতে গেলে দেখা যায়- বৈঠকখানার যে কক্ষটিতে শাহজালালের ব্যবহৃত থালা-বাটি রাখা হয় সেটি নেই। দর্শনার্থীরা এগুলো দেখার আগ্রহ প্রকাশ করলে একজন নিরাপত্তাকর্মী বাড়ির ভেতর থেকে একটি কাঠের বাক্স নিয়ে আসেন। পরে কোনো ধরনের ছবি না তোলার শর্ত দিয়ে বাক্সটি খুলে থালা-বাটি দেখান। পরে আবার সেটি বাক্সবন্দি করে বাড়ির ভেতরে নিয়ে যান।
Advertisement
জামাল উদ্দিন বলেন, ‘মাজারে যারা আসেন তারা অনেকেই জানেন না হযরত শাহজালাল (রহ.) এর ব্যবহৃত জিনিসপত্র আজও সংরক্ষণ করে রাখা আছে। যারা জানেন, তারা এভাবে দুই বাড়ি ঘুরে ঘুরে দেখেন।’
তিনি বলেন, ‘এই নিদর্শনগুলো আমাদের ঐতিহ্য। এসবের প্রতি মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি ও আবেগ জড়িত। এসব নিদর্শন মাজার প্রাঙ্গণে বা অফিসে প্রদর্শন করে রাখলে সবাই দেখতে পারতো।’
আরও পড়ুন শাহজালালের মাজারের দানবাক্স সিলগালা, পাহারা বসালো প্রশাসনঐতিহাসিক সূত্র ও স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, ১৩০৩ সালে ৩৬০ আউলিয়াকে সঙ্গে নিয়ে সিলেটে আগমন করেন হযরত শাহজালাল (রহ.)। গৌড়ের রাজা গৌড় গোবিন্দের বিরুদ্ধে অভিযানে অংশ নেওয়া এই সুফি সাধক ছিলেন একাধারে আধ্যাত্মিক নেতা ও যোদ্ধা। তার ব্যবহৃত বলে সংরক্ষিত তলোয়ারটিকে সেই ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
মাজারে আগত দর্শনার্থীদের অনেকেই জানান, শাহজালাল (রহ.)-এর স্মৃতিবিজড়িত এসব সামগ্রী প্রত্যক্ষ করার মধ্যে এক ধরনের আবেগ ও ঐতিহাসিক অনুভূতি রয়েছে। বিশেষ করে তলোয়ারটি তাদের কাছে ইসলামের প্রচার, ন্যায় প্রতিষ্ঠা ও সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
শুক্রবার জুমার নামাজের পর মোতোয়াল্লি বাড়ির সামনে দর্শনার্থী পরিচয়ে মাজারের একজন খাদেমের সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। এসময় তিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আমাদের মধ্যে সমঝোতার ভিত্তিতে এক বাড়িতে তলোয়ার ও কাঠের খড়ম এবং আরেকটি বাড়িতে থালা-বাটি সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে। দর্শনার্থীরা গেলে তাদেরকে দেখানো হয়।
তিনি বলেন, এখন একটি পক্ষ মাজার নিয়ে লাফালাফি করছে। এ ব্যাপারে আমাদের কোনো কথা নেই। তাদের বাড়াবাড়ি এমনিতেই শেষ হয়ে যাবে। মাজারের খেদমতকারীরা বছরের পর বছর মাজার পরিচালনা করে যাচ্ছেন, তাদের কোনো সমস্যা নেই। তাদের সমস্যা কেন, সেটা তারাই জানে।
এদিকে এসব ঐতিহাসিক নিদর্শন সংরক্ষণে মাজার এলাকায় জাদুঘর স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। গত ৫ মার্চ বিচারপতি রাজিক-আল-জলিল ও বিচারপতি আনোয়ারুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এক রিট আবেদনের শুনানি শেষে এ আদেশ দেন।
আদালত একইসঙ্গে শাহজালাল (রহ.)-এর ব্যবহৃত সামগ্রী বর্তমান অবস্থা থেকে স্থানান্তর বা তৃতীয় পক্ষের কাছে হস্তান্তরের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। পাশাপাশি ১৯৬৮ সালের অ্যান্টিকুইটিজ অ্যাক্ট অনুযায়ী এসব সামগ্রী তালিকাভুক্ত করে রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষণ এবং এ বিষয়ে একটি উপদেষ্টা কমিটি গঠনের নির্দেশনা কেন দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন।
রিট আবেদনে বলা হয়, শাহজালাল (রহ.)-এর ব্যবহৃত তলোয়ার, খড়ম, জায়নামাজ, থালাবাসন ও অন্যান্য মূল্যবান নিদর্শনের কিছু অংশ ব্যক্তিগতভাবে সংরক্ষিত থাকায় দর্শনার্থীরা সেগুলো সহজে দেখার সুযোগ পান না। একইসঙ্গে যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে ঐতিহাসিক সম্পদ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
আরও পড়ুন শাহজালাল-শাহপরাণ / মাজারে দানের কোটি কোটি টাকা যায় কোথায়, হিসাব চায় প্রশাসনমাজারে আগত দর্শনার্থীদের মতে, জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করা হলে একদিকে যেমন এসব ঐতিহাসিক নিদর্শন নিরাপদে সংরক্ষিত হবে, অন্যদিকে দেশ-বিদেশ থেকে আগত ভক্ত, পর্যটক ও গবেষকরাও সহজে সেগুলো দেখার সুযোগ পাবেন।
মামুন হোসেন নামে এক দর্শনার্থী বলেন, হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর স্মৃতিবিজড়িত এসব নিদর্শন শুধু ধর্মীয় আবেগের বিষয় নয়; বরং সিলেটের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই এগুলোকে আধুনিক পদ্ধতিতে সংরক্ষণ এবং জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবি।
এ বিষয়ে জানতে শাহজালাল (রহ.) মাজারের মোতোয়াল্লি ফতেহ উল্লাহ আল আমান এর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করলে তিনি সাঁড়া দেননি।
সম্প্রতি শাহজালালের মাজারে আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও কমপ্লেক্স তৈরি করতে সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছেন সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম। এরই মধ্যে তিনি মাজারে দানের বড় তিনটি ডেগ সিলগালা ও নতুন দানবাক্স স্থাপন করেছেন। শনিবার (২০ জুন) দানের ডেগের ওপর সিসি ক্যামেরাও স্থাপন করেছেন। তার এই সাহসী উদ্যোগকে অনেকে স্বাগত জানালেও কেউ কেউ দ্বিমতও পোষণ করছেন।
হযরত শাহজালালের ব্যবহৃত জিনিসপত্র দুই বাড়িতে রাখার বিষয়ে জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম বলেন, মাজারের প্রতিটি কার্যক্রম পর্যায়ক্রমে শৃঙ্খলার মধ্যে আনা হবে।
এফএ/এমএস