দেশজুড়ে

আমের চেয়ে বেশি খরচ ক্যারেট-পরিবহনে, বিপাকে চাষিরা

চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও সুনাম কুড়িয়েছে। তবে সেই আম এখন চাষিদের মুখে হাসির বদলে বাড়াচ্ছে দুশ্চিন্তা। উৎপাদন খরচ বাড়লেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত দাম। চাষি ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ, মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব, ক্যারেট সংকট এবং পরিবহন ও কুরিয়ার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে মৌসুমজুড়ে আমের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা। ফলে লাভের বদলে লোকসানের হিসাব কষতে হচ্ছে অনেককে।

Advertisement

চাষিদের জানান, গত কয়েক বছর ধরেই আমের ন্যায্য দাম না পাওয়ায় আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তারা। উৎপাদন খরচ দিন দিন বাড়লেও সেই তুলনায় বাজারে আমের দাম স্থিতিশীল থাকছে না, বরং অনেক ক্ষেত্রে কমে যাচ্ছে। এতে করে মৌসুম শেষে লাভের বদলে লোকসানের হিসাব কষতে হচ্ছে অনেক কৃষককে। ফলে আমচাষে আগ্রহও কিছুটা কমে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে চাষি ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আমের দাম কমে যার কারণের মধ্যে রয়েছে বাজারে সরবরাহের অতিরিক্ত চাপ, পরিবহন ও প্যাকেজিং খরচ বৃদ্ধি, মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব এবং মৌসুমের নির্দিষ্ট সময়ে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ আম বাজারে আসা। বিশেষ করে প্যাকেজিংয়ের জন্য ব্যবহৃত ক্যারেট সংকট ও বাড়তি দামও আমের সামগ্রিক বাজারদরে প্রভাব ফেলছে। আর কুরিয়ার চার্জ তো সরাসরি চাষিদের গলা কাটছে।

জানা গেছে, কানসাট বাজার থেকে এক মণ আম কিনতে খরচ হয় প্রায় ২ হাজার টাকা। সেই আম পরিবহনের জন্য প্রয়োজন হয় অন্তত তিনটি ক্যারেট, কারণ সেখানে ৬০ কেজিকে এক মণ হিসেবে ধরা হয় এবং প্রতিটি ক্রেটে গড়ে ২০ কেজি আম রাখা যায়। বর্তমানে তিনটি ক্যারেট কিনতেই খরচ হচ্ছে প্রায় ৯০০ টাকা। ফলে আমের মূল্যের সঙ্গে শুধু প্যাকেজিং বাবদই মোট খরচ দাঁড়ায় প্রায় ২ হাজার ৯০০ টাকা। অর্থাৎ বিক্রির আয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ চলে যাচ্ছে ক্যারেট খাতে, যা কৃষকের লাভের পরিমাণ অনেকটাই কমিয়ে দিচ্ছে। তবে এখানেই শেষ নয়, আম বাজারজাত করতে আরও নানা খরচ বহন করতে হয়।

Advertisement

‘চলতি মৌসুমে আমের বাজার পরিস্থিতি, চাষিদের বিভিন্ন সমস্যা এবং প্যাকেজিং খরচ বৃদ্ধিসহ সার্বিক বিষয়গুলো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। কৃষক ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের চেষ্টা চলছে।’

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শ্রমিক খরচ। আম সংগ্রহ, বাছাই এবং ক্যারেট ভরার কাজে মৌসুমে অতিরিক্ত শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। মৌসুমের সময় শ্রমিক সংকট এবং চাহিদা বৃদ্ধির কারণে মজুরিও বেড়ে যায়। তিনটি ক্যারেট লেবার পেপারসহ খরচ অন্তত ৩০০ টাকা। এর পরে কেজিতে ১৬ থেকে ২০ টাকা যোগ হবে কুরিয়ার খরচ। এখন পর্যন্ত আম বাজার থেকে পরিবহনে আম উঠতেই আপনার খরচ প্রায় ৪ হাজার ৪০০ টাকা। অর্থাৎ ২ হাজার টাকার আমের বিপরীতে অন্যান্য খাতেই ব্যয় হয় প্রায় ২ হাজার ৪০০ টাকা। ফলে উৎপাদনের পরবর্তী ধাপেও বাড়তি ব্যয়ের চাপ বহন করতে হচ্ছে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের। আর এসব খরচ বিবেচনায় রেখেই ক্রেতারা আমের দাম নির্ধারণ করেন।

সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, কুরিয়ার সার্ভিসে প্রতি কেজি আম পাঠাতে গড়ে প্রায় ১৬ টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে। দূরবর্তী জেলা বা রাজধানীর বাজারে আম পাঠাতে গেলে এই ব্যয় আরও বৃদ্ধি পায়। ফলে স্থানীয় বাজারের বাইরের ক্রেতাদের কাছে আম পৌঁছাতে গিয়ে কৃষকদের মোট ব্যয় অনেক বেড়ে যাচ্ছে।

আরও পড়ুন আমের লাভ গিলে খাচ্ছে ‘ঢলন’ প্রথা

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্যাকেজিং খরচ, শ্রমিক খরচ এবং পরিবহন ব্যয় একসঙ্গে বেড়ে যাওয়ায় পুরো আম বিপণন ব্যবস্থা এখন চাপে রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগীরা এই বাড়তি খরচকে অজুহাত হিসেবে দেখিয়ে কৃষকদের কাছ থেকে কম দামে আম কিনে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে একদিকে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, অন্যদিকে বাজারে ন্যায্য দামের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।

Advertisement

শ্যামপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা আতিকুর রহমান ভোর থেকেই অনেক আশা নিয়ে নিজের বাগানের লক্ষণভোগ আম ভ্যানে করে কানসাট বাজারে নিয়ে আসেন। সকাল ৯টার দিকে বাজারে পৌঁছে তিনি ক্রেতার অপেক্ষায় বসে থাকেন। কিন্তু সময় গড়াতে থাকলেও কাঙ্ক্ষিত ক্রেতার দেখা মেলেনি। বাজারে আমের সরবরাহ বেশি থাকায় এবং ক্রেতা কম থাকায় দুপুর ১টা পর্যন্ত তিনি তার আনা এক ভ্যান আম বিক্রি করতে পারেননি।

এতে হতাশা প্রকাশ করে তিনি জাগো নিউজকে বলেন, আমের ন্যায্য দাম না পাওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও বিক্রি না হওয়ায় পরিবহন ও অন্যান্য খরচের চাপ আরও বেড়ে যাচ্ছে।

‘একসময় বাঁশের ঝুড়িতেই আম পরিবহন ও বিক্রি করা হতো। তবে ২০১৬ সালের পর থেকে ধীরে ধীরে বাজারে প্লাস্টিকের ক্যারেট ব্যবহার শুরু হয়। শুরুতে একটি ক্রেট ৬০ থেকে ৭০ টাকায় পাওয়া গেলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর দাম কয়েকগুণ বেড়েছে।’

আম ব্যবসায়ী হামিদুর রহমান সুজন জাগো নিউজকে বলেন, একসময় বাঁশের ঝুড়িতেই আম পরিবহন ও বিক্রি করা হতো। তবে ২০১৬ সালের পর থেকে ধীরে ধীরে বাজারে প্লাস্টিকের ক্যারেট ব্যবহার শুরু হয়। শুরুতে একটি ক্রেট ৬০ থেকে ৭০ টাকায় পাওয়া গেলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর দাম কয়েকগুণ বেড়েছে। বর্তমানে একটি ক্রেট কিনতে গুনতে হচ্ছে ৩০০ টাকায়। অথচ একই সময়ে আমের বাজারদর তুলনামূলকভাবে কমেছে। ফলে আমচাষি ও ব্যবসায়ীদের উৎপাদন ও বিপণন ব্যয় বেড়ে গেলেও লাভের পরিমাণ কমে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, আমের দাম কমলেও প্যাকেজিং খরচ, পরিবহন ব্যয় ও শ্রমিক খরচ ক্রমাগত বাড়ছে, যা ব্যবসায়ীদের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

আমচাষি রাফিকুল ইসলাম বলেন, প্লাস্টিকের ক্যারেট ব্যবসার সঙ্গে একটি সিন্ডিকেট জড়িত রয়েছে। আমের মৌসুম শেষ হওয়ার পর এসব ব্যবসায়ী বাজার থেকে বিপুল পরিমাণ ক্যারেট কিনে মজুত করেন। পরে নতুন মৌসুম শুরু হলে চাহিদা বেড়ে যাওয়ার সুযোগ নিয়ে সেই ক্যারেটগুলো অনেক বেশি দামে বিক্রি করেন। ফলে মৌসুমের শুরুতেই চাষি ও ব্যবসায়ীদের বাড়তি খরচ বহন করতে হয়।

আরও পড়ুন শার্শার বেলতলায় আমের দামে ধস

তিনি বলেন, এভাবে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে ক্রেটের দাম বাড়ানো হলে এর প্রভাব সরাসরি আমের উৎপাদন ও বিপণন ব্যয়ের ওপর পড়ে, যার চাপ শেষ পর্যন্ত চাষিদেরই বহন করতে হয়।

শিবগঞ্জ ম্যাংগো প্রোডিউসার কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডের সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল খান শামীম বলেন, একসময় আমচাষে প্রধান খরচ ছিল বাগান পরিচর্যা, সার, সেচ ও শ্রমিক ব্যয়। কিন্তু বর্তমানে উৎপাদন খরচের পাশাপাশি আম বাজারজাতকরণের ব্যয়ও আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে। বিশেষ করে প্যাকেজিং সামগ্রীর দাম বৃদ্ধি চাষি ও ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন করে বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে। আম সংগ্রহের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠাতে ক্যারেট, কার্টন, কাগজ, টেপ ও অন্যান্য প্যাকেজিং উপকরণ ব্যবহার করতে হচ্ছে। পাশাপাশি কুরিয়ার ও পরিবহন চার্জও প্রতি বছর বাড়ছে।

তিনি বলেন, আম নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দিতে উন্নত প্যাকেজিংয়ের বিকল্প নেই। কিন্তু এসব উপকরণের দাম যেভাবে বাড়ছে, তাতে চাষিদের লাভের অংশ ক্রমেই কমে যাচ্ছে। আমের দাম তুলনামূলকভাবে স্থির থাকলেও বা অনেক ক্ষেত্রে কমলেও উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের খরচ লাগাতার বেড়েই চলেছে।

ইসমাইল খান শামীম বলেন, বাগানে কীটনাশক প্রয়োগ, রোগবালাই দমন, শ্রমিক মজুরি, পরিবহন ব্যয় এবং কুরিয়ার চার্জ সবকিছুর বোঝা শেষ পর্যন্ত চাষিদেরই বহন করতে হচ্ছে। এমনকি সাধারণত কানসাট আম বাজারে যে আম বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকা কেজি দরে সে আম অনলাইনে বিক্রি হচ্ছে দেড়শ টাকায়।

বর্তমানে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে অনেক ক্ষেত্রে আমের প্রকৃত মূল্যের চেয়ে প্যাকেজিং ও পরিবহন খরচের পরিমাণ বেশি হয়ে যাচ্ছে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, এতে ছোট ও মাঝারি চাষিরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও সে অনুযায়ী আমের দাম না পাওয়ায় অনেক চাষি হতাশ হয়ে পড়ছেন।

‘আম নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দিতে উন্নত প্যাকেজিংয়ের বিকল্প নেই। কিন্তু এসব উপকরণের দাম যেভাবে বাড়ছে, তাতে চাষিদের লাভের অংশ ক্রমেই কমে যাচ্ছে। আমের দাম তুলনামূলকভাবে স্থির থাকলেও বা অনেক ক্ষেত্রে কমলেও উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের খরচ লাগাতার বেড়েই চলেছে।’

শিবগঞ্জ ম্যাংগো প্রোডিউসার কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডের সাধারণ সম্পাদক মনে করেন, প্যাকেজিং সামগ্রীর বাজারে নজরদারি বৃদ্ধি এবং চাষিদের জন্য বিশেষ সহায়তা না থাকলে ভবিষ্যতে আমচাষ আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠবে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় এই কৃষিখাতের ওপর।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা বিপণন কর্মকর্তা মো. মোমিনুল হক বলেন, আম বিপণন ব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে চাষিদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনা এবং উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যে দূরত্ব কমানোর বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, চলতি মৌসুমে আমের বাজার পরিস্থিতি, চাষিদের বিভিন্ন সমস্যা এবং প্যাকেজিং খরচ বৃদ্ধিসহ সার্বিক বিষয়গুলো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। কৃষক ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের চেষ্টা চলছে।

আরও পড়ুন আমের লাভ গিলে খাচ্ছে ক্যারেট

মোমিনুল হক আরও বলেন, আম দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফল। তাই চাষিদের স্বার্থ রক্ষা এবং আমের সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। বাজারে যেন কোনো ধরনের কৃত্রিম সংকট, অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি বা মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব না থাকে সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নজরদারি অব্যাহত রেখেছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে চলতি মৌসুমে ৩৭ হাজার হেক্টর জমিতে ৪ লাখ ৫৮ হাজার ৯১২ টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

এনএইচআর/এএসএম