প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর ঘিরে দুই দেশের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক নতুন মাত্রা পাবে বলে আশা করছেন বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিসিসিসিআই) সভাপতি মোহাম্মদ খোরশেদ আলম।
Advertisement
তার মতে, এ সফরে শুধু নতুন ঋণ বা অবকাঠামো প্রকল্প নয়, বরং প্রযুক্তি স্থানান্তর, দক্ষ জনশক্তি তৈরি, খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ও বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর মতো দীর্ঘমেয়াদি বিষয়গুলোতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
জাগো নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেন মোহাম্মদ খোরশেদ আলম। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন বিশেষ সংবাদদাতা ইব্রাহীম হুসাইন অভি।
প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর ঘিরে ব্যবসায়ী সমাজের প্রত্যাশা কী?আমি মনে করি, এই সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হওয়া উচিত বাংলাদেশে উন্নত প্রযুক্তি ও শিল্প সক্ষমতা নিয়ে আসা। আমাদের দেশে কয়লা, লোহাসহ বিভিন্ন খনিজ সম্পদ রয়েছে। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তির অভাবে সেগুলো যথাযথভাবে উত্তোলন ও ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। চীন এক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যতম দক্ষ দেশ। তাই তাদের প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আমাদের খনিজ সম্পদের উন্নয়ন ঘটানো যেতে পারে।
Advertisement
পাশাপাশি বাংলাদেশে একটি আধুনিক ন্যানো ফাইবার উৎপাদন কারখানা স্থাপন, চায়নিজ মেডিসিনভিত্তিক বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা এবং শিল্পখাতের জন্য দক্ষ জনবল তৈরিতে অন্তত ২০টি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠায় চীনের সহযোগিতা চাওয়া উচিত।
বর্তমানে বাংলাদেশ বছরে প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য চীন থেকে আমদানি করে। কিন্তু রপ্তানি হয় মাত্র ৬শ মিলিয়ন ডলার। এই বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি দীর্ঘমেয়াদে আমাদের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক নয়
এছাড়া নতুন কিছু অর্থনৈতিক অঞ্চল চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি বড় অবকাঠামো ও শিল্প প্রকল্প বাস্তবায়নে সহযোগিতা এবং প্রয়োজনে স্বল্প সুদে অর্থায়নের বিষয়েও আলোচনা হওয়া দরকার। এ ধরনের উদ্যোগ দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করবে।
বাংলাদেশ-চীনের মধ্যে বড় ধরনের বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। এটি কমানোর উপায় কী?বর্তমানে বাংলাদেশ বছরে প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য চীন থেকে আমদানি করে। কিন্তু রপ্তানি হয় মাত্র ৬শ মিলিয়ন ডলার। এই বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি দীর্ঘমেয়াদে আমাদের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক নয়।
Advertisement
এটি কমানোর জন্য বাংলাদেশি পণ্যের সরাসরি বাজার সৃষ্টি করতে হবে। আমার প্রস্তাব হলো, চীনা সরকারের সহযোগিতায় ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ নামে অন্তত ৩০টি স্থায়ী বিক্রয়কেন্দ্র বা আউটলেট প্রতিষ্ঠা করা হোক। সেখানে শুধু পোশাক নয়, চামড়াজাত পণ্য, পাটপণ্য, কৃষিপণ্য, সিরামিক, হালকা প্রকৌশল পণ্যসহ বিভিন্ন বাংলাদেশি পণ্য বিক্রি করা যাবে।
এখনই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। আগামী সাত থেকে আট বছরের শিল্প চাহিদা বিবেচনায় রেখে কোন খাতে বিনিয়োগ দরকার, কোথায় অবকাঠামো উন্নয়ন করতে হবে এবং কোন ধরনের শিল্প স্থাপন করা হবে- এসব আগে নির্ধারণ করতে হবে
যদি এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়, তাহলে আগামী তিন বছরের মধ্যে বাংলাদেশ অতিরিক্ত প্রায় তিন বিলিয়ন ডলারের পণ্য চীনে রপ্তানি করতে সক্ষম হবে বলে আমি বিশ্বাস করি।
আরও পড়ুন বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া বাণিজ্য চুক্তি আগামী বছরের মধ্যে সম্পন্নের আশাএছাড়া বাংলাদেশে একটি চীনা বাণিজ্যিক ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হলে দুই দেশের ব্যবসায়ীদের লেনদেন, অর্থায়ন ও বিনিয়োগ কার্যক্রম আরও সহজ হবে।
চীনা বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য এখন সবচেয়ে বেশি কী প্রয়োজন?আমাদের বাস্তবতা বুঝতে হবে। বিদ্যুৎ ও গ্যাসনির্ভর বড় শিল্পে এই মুহূর্তে বিপুল বিদেশি বিনিয়োগ আনা সহজ হবে না। কারণ দেশে এখনো জ্বালানির ঘাটতি রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীরা কারখানা স্থাপন করলেও উৎপাদন নির্বিঘ্নভাবে চালানো কঠিন হবে।
তাই এখনই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। আগামী সাত থেকে আট বছরের শিল্প চাহিদা বিবেচনায় রেখে কোন খাতে বিনিয়োগ দরকার, কোথায় অবকাঠামো উন্নয়ন করতে হবে এবং কোন ধরনের শিল্প স্থাপন করা হবে- এসব আগে নির্ধারণ করতে হবে।
বাংলাদেশে চীনা উদ্যোক্তারা টেক্সটাইল শিল্পে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এর একটি কারণ হলো, এখানে বন্ড সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্ত কাঁচামালের ব্যবহার ব্যাপক। এই কাঠামোর কারণে অনেক চীনা বিনিয়োগকারী টেক্সটাইলের পরিবর্তে অন্য উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগে বেশি আগ্রহী
আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো পরিকল্পনার ঘাটতি। আমরা অনেক সময় আগে বিনিয়োগ আনি, পরে দেখি বিদ্যুৎ বা গ্যাস নেই। এতে বিনিয়োগকারী যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হন, তেমনি দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হয়। বর্তমানে দেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিদ্যুৎকেন্দ্রও পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে না। তাই পরিকল্পিত শিল্পায়নের বিকল্প নেই।
চীন থেকে গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল শিল্পের যে স্থানান্তর হচ্ছে, সেই সুযোগ বাংলাদেশ কীভাবে কাজে লাগাতে পারে?বাস্তবতা হলো, গার্মেন্টস শিল্পের যে বড় স্থানান্তর হওয়ার ছিল, তার অনেকটাই ইতোমধ্যে ভিয়েতনামসহ অন্য দেশে চলে গেছে। এখন নতুন করে সেই প্রবণতা আগের মতো নেই।
আরও পড়ুন মালয়েশিয়া সফর / শ্রমবাজার খুলে দিয়ে আরও বাংলাদেশি কর্মী নেওয়ার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীরআরেকটি বিষয় হলো, বাংলাদেশে চীনা উদ্যোক্তারা টেক্সটাইল শিল্পে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এর একটি কারণ হলো, এখানে বন্ড সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্ত কাঁচামালের ব্যবহার ব্যাপক। এই কাঠামোর কারণে অনেক চীনা বিনিয়োগকারী টেক্সটাইলের পরিবর্তে অন্য উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগে বেশি আগ্রহী।
তাই আমাদের উচিত শুধু পোশাক ও টেক্সটাইল নয়, বরং ইলেকট্রনিক্স, হালকা প্রকৌশল, যন্ত্রাংশ উৎপাদন, আধুনিক উৎপাদন শিল্প এবং উচ্চমূল্য সংযোজনকারী খাতে চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য নীতিসহায়তা ও অবকাঠামো প্রস্তুত করা। তাহলেই দুই দেশ দীর্ঘমেয়াদে লাভবান হবে।
আইএইচও/এএসএ /এমএফএ