ফল আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভিটামিন, খনিজ, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং ফাইবারে সমৃদ্ধ ফল শরীরকে সুস্থ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই অনেকেই মনে করেন, যত বেশি ফল খাওয়া যাবে, তত বেশি পুষ্টি পাওয়া যাবে। বিশেষ করে বিভিন্ন ধরনের ফল একসঙ্গে মিশিয়ে তৈরি করা ফলের সালাদ বর্তমানে বেশ জনপ্রিয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একসঙ্গে একাধিক খাওয়া কি সত্যিই স্বাস্থ্যকর?
Advertisement
পুষ্টিবিদদের মতে, ফল অবশ্যই স্বাস্থ্যকর খাবার। তবে যেকোনো ভালো জিনিসের মতো ফল খাওয়ার ক্ষেত্রেও পরিমাণ ও ভারসাম্য গুরুত্বপূর্ণ। একসঙ্গে অনেক ধরনের ফল খেলে শরীর বিভিন্ন ধরনের পুষ্টি পেলেও কিছু ক্ষেত্রে সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
বিভিন্ন ফলে থাকে ভিন্ন পুষ্টিগুণপ্রতিটি ফলের পুষ্টিগুণ আলাদা। যেমন কমলা, লেবু ও আমলকীতে ভিটামিন সি বেশি থাকে। কলা পটাশিয়ামের ভালো উৎস। পেঁপে ও আমে রয়েছে ভিটামিন এ। ডালিম, আঙুর ও বেরিজাতীয় ফলে থাকে প্রচুর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। তাই বিভিন্ন ফল একসঙ্গে খেলে শরীর নানা ধরনের ভিটামিন ও খনিজ উপাদান পায়। এ কারণে অনেক পুষ্টিবিদ ফলের বৈচিত্র্যকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখেন। তবে বৈচিত্র্য মানেই একসঙ্গে একাধিক ফল খেতে হবে, এমন নয়।
অতিরিক্ত ফ্রুক্টোজের সমস্যাফলের মধ্যে থাকা প্রাকৃতিক চিনিকে বলা হয় ফ্রুক্টোজ। সাধারণত ফলের ফ্রুক্টোজ ক্ষতিকর নয়, কারণ এর সঙ্গে ফাইবার ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদানও থাকে। কিন্তু একসঙ্গে অনেক ধরনের ফল খেলে মোট ফ্রুক্টোজের পরিমাণ বেশ বেড়ে যেতে পারে। এতে কিছু মানুষের পেট ফাঁপা, গ্যাস, অস্বস্তি কিংবা হজমের সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে যাদের হজমশক্তি দুর্বল বা যাদের আইবিএস রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে একসঙ্গে অতিরিক্ত ফল খাওয়া অস্বস্তির কারণ হতে পারে।
Advertisement
ফল ফাইবারের ভালো উৎস। ফাইবার হজমশক্তি উন্নত করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধে সাহায্য করে। তবে অতিরিক্ত ফাইবারও শরীরের জন্য সবসময় ভালো নয়। একসঙ্গে বেশি ফল খেলে ফাইবারের পরিমাণ অনেক বেড়ে যেতে পারে। এর ফলে পেটব্যথা, গ্যাস, পেট ফাঁপা কিংবা পাতলা পায়খানার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।বিশেষ করে যারা নিয়মিত পর্যাপ্ত ফাইবার খান না, তাদের জন্য হঠাৎ এত বেশি ফল খাওয়া হজমতন্ত্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
টকের সঙ্গে মিষ্টি নয়টকজাতীয় ফল যেমন আঙুর, ড্রাগন, আপেল, ডালিম ইত্যাদির সঙ্গে মিষ্টি ফল যেমন কলা মেশানো যাবে না। একই কারণে কলার সঙ্গে পেয়ারা মেশানো উচিত নয়। কয়েকটি গবেষণায় দেখা গেছে, এই মিশ্রণের কারণে বমিভাব, মাথাব্যথা ইত্যাদি হতে পারে।
আরও পড়ুন পাকা কাঁঠাল দিয়ে তৈরি করা যায় যেসব মজাদার খাবার ডায়াবেটিস রোগীদের সতর্কতাডায়াবেটিস থাকলে ফল খাওয়ার ক্ষেত্রেও সচেতন হওয়া জরুরি। যদিও ফল স্বাস্থ্যকর, তবুও এতে প্রাকৃতিক চিনি থাকে। যদি একসঙ্গে অনেক ধরনের মিষ্টি ফল যেমন আম, আঙুর, কলা, কাঁঠাল ও লিচু খাওয়া হয়, তাহলে রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। তাই ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে ফলের পরিমাণ ও ধরন নির্বাচন করতে পুষ্টিবিদ বা চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
ফলের সালাদ কি খারাপ?না, ফলের সালাদ স্বাস্থ্যকর খাবার হতে পারে, যদি তা সঠিকভাবে তৈরি করা হয়। পুষ্টিবিদদের মতে, ৩ থেকে ৫ ধরনের মৌসুমি ফল দিয়ে তৈরি সালাদ শরীরের জন্য যথেষ্ট উপকারী। এতে প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাওয়া যায় এবং অতিরিক্ত চিনি বা ফাইবারের ঝুঁকিও কম থাকে। ফলের সালাদে অতিরিক্ত চিনি, সিরাপ, মিষ্টি দই বা কৃত্রিম ফ্লেভার যোগ না করাই ভালো।
Advertisement
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিদিন ২ থেকে ৪ পরিবেশন ফল খাওয়া যথেষ্ট। একবারে ১৫-১৬টি ফল খাওয়ার চেয়ে দিনের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ফল খাওয়া বেশি উপকারী।
উদাহরণস্বরূপ, সকালে পেঁপে বা পেয়ারা, দুপুরে তরমুজ বা আনারস এবং বিকেলে আপেল বা কমলা খাওয়া যেতে পারে। এতে শরীর ধীরে ধীরে পুষ্টি গ্রহণ করতে পারে এবং হজমেও সুবিধা হয়।
আরও পড়ুন যেসব ফল খেলে রক্ত বাড়ে মৌসুমি ফলের গুরুত্বমৌসুমি ফল সাধারণত বেশি সতেজ, পুষ্টিকর এবং সহজলভ্য হয়। তাই বিদেশি বা অপ্রচলিত ফলের দীর্ঘ তালিকার পরিবর্তে স্থানীয় ও মৌসুমি ফলের ওপর গুরুত্ব দেওয়া ভালো।
আম, কাঁঠাল, লিচু, পেয়ারা, পেঁপে, জাম, আনারস, কমলা, ডালিম কিংবা কলার মতো ফল নিয়মিত খাদ্যতালিকায় রাখলেই প্রয়োজনীয় পুষ্টির বড় অংশ পাওয়া সম্ভব।
একসঙ্গে একাধিক ফল খাওয়া সবসময় ক্ষতিকর নয়, তবে এটিকে স্বাস্থ্যকর অভ্যাসও বলা যায় না। শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী পরিমিত পরিমাণে এবং বৈচিত্র্য বজায় রেখে ফল খাওয়াই সবচেয়ে ভালো উপায়। সুস্থ থাকার জন্য শুধু ফল নয়, সুষম খাদ্যাভ্যাসই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই ফলের সংখ্যা নয়, বরং সঠিক পরিমাণ ও পুষ্টির ভারসাম্যের দিকেই বেশি গুরুত্ব দিন। সূত্র: বিবিসি, হার্ভার্ড হেলথ, মায়ো ক্লিনিক
এসএকেওয়াই