জাতীয়

গড়পাড়া ইমামবাড়ির মহররমের মিছিলের ইতিহাস

৬১ থেকে ১৪৪৮- এক-দুই বছর না, গুনে গুনে ১৩৮৭ বছর। পেরিয়ে গেছে সুদীর্ঘ সময়। কিন্তু কালের গর্ভে বিলীন হয়নি কারবালার ঘটনা। হারিয়ে যায়নি ইমাম হোসেন (রা.) এর মহান আত্মত্যাগের কথা। শুধু মুসলমানদের মাঝে নয়, জাতি, ধর্ম, বর্ণ, নির্বিশেষে পৃথিবীর সব মানুষের হৃদয়ে ইমাম হোসেনের শহীদের ঘটনা জাগ্রত আছে। বিশ্বনবি হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর প্রিয় দৌহিত্র এবং মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর পরিবার-পরিজনের ওপর পাপিষ্ঠ ইয়াজিদের অত্যাচারের কথা এখনো দুঃখভারাক্রান্ত হৃদয়ে স্মরণ করে বিশ্ব।

Advertisement

অন্যদিকে ভর্ৎসনা পায় ইয়াজিদ ও তার পক্ষ। কুচক্রী, স্বৈরাচার, পাপিষ্ঠ ইয়াজিদের হাত থেকে ইসলামকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে অকাতরে প্রাণ দেওয়া ও নিজেকে উৎসর্গ করা ইমাম হোসেন (রা.), তার পরিবার ও অনুসারীদের জন্য অব্যাহত আছে গভীর শ্রদ্ধা, অকৃত্রিম ভালোবাসা ও সম্মান। ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা সারাবছরই ইমাম হোসেন, তার পরিবার ও অনুসারীদের প্রতি সম্মান পোষণ করেন। প্রতি মহররমের চাঁদে তাকে ঘিরে আয়োজন করা হয় নানা স্মরণ অনুষ্ঠান। বিশ্বের সর্বত্র আশুরার দিনে ইমাম হোসেন (রা.) স্মরণে অনুষ্ঠিত হয় স্মরণসভা ও সেমিনার।

শুধু আলোচনায়ই সীমাবদ্ধ থাকে না তার বন্দনা। শত্রুর হাত থেকে ইসলাম রক্ষা করা এই পুণ্যাত্মার স্মরণে ১০ মহররম মুসলিম বিশ্বে আয়োজন করা হয় শোক মিছিল। যাতে কোটি কোটি ইমামভক্ত প্রকাশ করেন হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা। নগ্নপদে পবিত্র তাজিয়া, নিশানসহ সাজানো হয় মিছিল। বাংলাদেশেও ইমাম হোসেন (রা.) এর স্মরণে মিছিল বের হয়। রাজধানী ঢাকার হোসনি দালান, বিবিকা রওজা, মোহাম্মদপুর ইমামবাড়ি থেকে বের হয় তাজিয়া মিছিল।

রাজধানীর অদূরে মানিকগঞ্জের গড়পাড়া ইমামবাড়ি থেকেও স্মরণাতীত কাল থেকে মহররমের পবিত্র মিছিল বের হয়। শুধু মিছিল বের করা নয়, প্রায় দেড়শ বছর ধরে কারবালার শোকবিধুর ঘটনা এক শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে আসছে গড়পাড়া ইমামবাড়ি। হুগলি ইমামবাড়ির ন্যায় পবিত্র মহররমের যাবতীয় কার্যক্রম ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে পালিত হচ্ছে এখানে। পবিত্র মহররম উপলক্ষে গড়পাড়া ইমামবাড়িতে ১০ দিনের ব্যাপক কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়।

Advertisement

মহররমের চাঁদ ওঠার রাত থেকে ইমামবাড়ি প্রাঙ্গণ শোক সংকুল ক্ষেত্রে রূপ নেয়। চন্দ্রোয়ের দিন সন্ধ্যায় বেজে ওঠে ইমামবাড়ির দামামা। কারবালা যুদ্ধের স্মরণে প্রায় শতবর্ষ ধরে সংরক্ষিত আছে এ বিশাল ডংকা। এরপর ইমামবাড়ির দ্বার উন্মোচন করা হয়। শুরু হয় বিভিন্ন কার্যক্রম। প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যায় আয়োজিত হয় মিলাদ মাহফিল, ফাতেহা, নেয়াজ, মার্সিয়া-মাতম। এর সঙ্গে ইমাম হোসেনের সততা ও ন্যায়-নিষ্ঠার কথাও শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হয়।

মহররমের ১ তারিখ থেকে বের হয় ৩০টি কাসেদের দল। কারবালার বেদনাবিধুর ঘটনা প্রচারের জন্য জারি-মার্সিয়ার মাধ্যমে মানিকগঞ্জের জেলা ও পুলিশ প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে মানিকগঞ্জ জেলার প্রায় সর্বত্র, টাঙ্গাইলের একাংশ, পাবনার আংশিক এলাকা, রাজশাহীর কিয়দংশ, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, নাটোর জেলার লালপুর চলে যায় কাসেদের দল। সপ্তাহকালের বেশি সময় পর আশুরার দিন দুপুর ২টার মধ্যে এসব দল ফিরে আসে ইমামবাড়িতে।

আশুরার দিন জোহরের নামাজের পর পবিত্র নেয়াজ ও ফাতেহা পর্বের পর শুরু হয় মূল মিছিলের প্রস্তুতি। ‘হায় হোসেন, হায় হোসেন’ রবে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করা বিশাল শোক মিছিলের যাত্রা শুরু হয় বিকেল ৩টায়। ইমাম হোসেনের শেষ মঞ্জিলের নকশা পবিত্র তাজিয়া, তাবুত, সিপার, সম্মানিত দুলদুল আর কারবালার স্মৃতি বহনকারী হাজার হাজার লাল, সবুজ আর কালো নিশান সম্বলিত মিছিল মানিকগঞ্জ শহর প্রদক্ষিণ করে সরকারি দেবেন্দ্র কলেজ মাঠে মাগরিবের নামাজের সময় গিয়ে উপস্থিত হয়। হাজার হাজার ইমামভক্ত রোজা শেষে ইফতার ও মাগরিবের নামাজ আদায় করেন সরকারি দেবেন্দ্র কলেজ মাঠে।

তারপর শুরু হয় ইমাম হোসেন (রা.) ও তার সঙ্গীদের স্মরণে আলোচনা। গড়পাড়া ইমামবাড়ির সাবেক খাদেম শাহ মোখলেসুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে ওই শোকসভার সভাপতিত্ব করছেন। তার সভাপতিত্বে ইরানের ধর্মীয় নেতা, বিভিন্ন সময় ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানসহ বিভিন্ন দূতাবাসের রাষ্ট্রদূত, ফার্স্ট সেক্রেটারি, কালচারাল কাউন্সিলর ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা শোকসভায় অংশ নেন। পাশাপাশি স্থানীয় সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা শোকসভায় প্রতিবারই অংশ নেন। সভা শেষে কারবালার মহান শহীদদের আত্মার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের পাশাপাশি মুসলিম বিশ্বের মঙ্গল, কল্যাণ, সমৃদ্ধি ও শান্তি কামনা করে বিশেষ মোনাজাতও করা হয়।

Advertisement

১৯২১ সালে গড়পাড়া ইমামবাড়ি প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠাতা সে সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুফি সাধক, অসাম্প্রদায়িক চেতনার ধারক-বাহক এবং অত্র অঞ্চলে ইসলামের শান্তির বাণী প্রচারকারী সাধক মহাপুরুষ হজরত শাহ খলিলুর রহমান। মানিকগঞ্জে ইসলামের প্রচার ও প্রসারে অসামান্য অবদান রাখা এ সাধক প্রবর আসলে তার মায়ের ইচ্ছার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন।

হজরত শাহ খলিলুর রহমানের মা মোসাম্মাত বিবি মরিয়ম জন্মসূত্রে ছিলেন ভারতের বিহার প্রদেশের ভাগলপুর জেলার মোজাফফরপুরের বাসিন্দা। হজরত শাহ খলিলুর রহমানের (র.) বাবা হজরত মওলানা শাহ আব্দুর রহমানের (র.) জন্ম মানিকগঞ্জের আলীনগর গ্রামে হলেও তিনি বড় হন বিহারে; তার চাচা ব্রিটিশ ভারতে দুই বাংলার প্রথম জেলা মুসলিম জজ খান বাহাদুর এরাদত আলীর সাহচর্য্য। শেষ পর্যন্ত সেই বিহারেই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন হজরত শাহ আব্দুর রহমান।

সুন্নি আব্দুর রহমানের স্ত্রী বিবি মরিয়ম ছিলেন বিহারের সুফি সাধক ও পীর হজরত শাহ সৈয়দ এমদাদ আলীর (র.) কন্যা। বিয়ের রাতেই স্ত্রী বিবি মরিয়মকে নিজ আলয় মানে মানিকগঞ্জের গড়পাড়ার আলীনগরে ফেরার আহ্বান জানান আব্দুর রহমান। কিন্তু শিয়া মতালম্বী বিবি মরিয়ম স্বামীর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে উল্টো শর্ত জুড়ে দেন। গড়পাড়ার আলীনগরে পবিত্র মহররম পর্ব ও আশুরা অনুষ্ঠান আয়োজন করতে পারলেই আমি সেখানে যাবো, অন্যথায় নয়।

হজরত শাহ আব্দুর রহমান তাতে সানন্দে রাজি হয়ে অল্প কিছুদিনের মধ্যে সস্ত্রীক নিজ গ্রাম গড়পাড়ার আলীনগরে ফিরে আসেন। আর তারা গড়পাড়া আসার পরই শুরু হয় মহররমের স্মৃতি অনুষ্ঠান। বাংলা ১৩০০ সালে পরলোকে পাড়ি জমান শাহ আব্দুর রহমান। পিতা-মাতার সূচিত মহররম স্মৃতি অনুষ্ঠানমালা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন তাদের সুযোগ্য মেজ ছেলে আধ্যাত্মিক সাধক হজরত শাহ খলিলুর রহমান। ইংরেজি ১৯২১ সালে (বাংলা ১৩২৮) প্রতিষ্ঠিত হয় গড়পাড়া ইমামবাড়ি।

প্রতিষ্ঠাতা সে সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুফি সাধক অসাম্প্রদায়িক চেতনার ধারক, বাহক এবং অত্র অঞ্চলে ইসলামের শান্তির বাণী প্রচারকারী সাধক মহাপুরুষ হজরত শাহ খলিলুর রহমান। হিন্দু জমিদারদের শৌর্য-বীর্য ও হিন্দু অধ্যুষিত মানিকগঞ্জে ইসলাম প্রচার ও প্রসারে অসামান্য অবদান রাখা খলিলুর রহমানকে ধরা হয় মানিকগঞ্জে মুসলিম ‘রেনেসার’ অন্যতম অগ্রদূত। এ সুফি সাধক আসলে তার মায়ের ইচ্ছার বাস্তব রূপ দিতে গিয়েই ইমামবাড়ি প্রতিষ্ঠা করেন।

বলে রাখা ভালো হজরত শাহ খলিলুর রহমান সাহেবের মা মোসাম্মাত বিবি মরিয়ম ছিলেন জন্মগতভাবে শিয়া মতালম্বী। জন্মসূত্রে ভারতের বিহার প্রদেশের ভাগলপুর জেলার মোজাফফরপুরের বাসিন্দা। হজরত শাহ খলিলুর রহমানের বাবা ব্রিটিশ ভারতের অন্যতম সুফি সাধক হজরত শাহ আব্দুর রহমানের পীর হজরত শাহ সৈয়ত এমদাদ আলীর কন্যা ছিলেন বিবি মরিয়ম।

তিনি বিয়ের পর শর্ত জুড়ে দেন যে, মহররম পর্ব বা মহররমের যাবতীয় অনুষ্ঠান পালন না করলে তিনি বিহার থেকে তৎকালীন পূর্ব বাংলার মানিকগঞ্জ মহকুমার গড়পাড়া ইউনিয়নের আলীনগর গ্রামে যাবেন না। পরে হজরত শাহ আব্দুর রহমান সে শর্ত মেনে বলেন, আমি নিজ গায়ে মহররম প্রতিষ্ঠার প্রাণপণ চেষ্টা করবো। শেষ পর্যন্ত শাহ আব্দুর রহমান ও বিবি মরিয়মের দ্বিতীয় পুত্র শাহ খলিলুর রহমান ১৯২১ সালে ইমামবাড়ি প্রতিষ্ঠা করেন। তার প্রতিষ্ঠিত ইমামবাড়িই গড়পাড়া ইমামবাড়ি নামে পরিচিত। সেই ইমামবাড়ি থেকে বের হওয়া আশুরার শোক মিছিল প্রথম মানিকগঞ্জ শহরে যায় ১৯২৪ সালে। হজরত শাহ খলিলুর রহমানের ছোট ভাই হজরত শাহ হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে মিছিল প্রথম মানিকগঞ্জ শহরে পা রাখে।

গড়পাড়া ইমামবাড়ির মিছিল মানিকগঞ্জ শহরে যাওয়ারও একটা ইতিহাস আছে। প্রথম দিকে গড়পাড়া ইমামবাড়ির আশুরার শোক মিছিলের গন্তব্য ছিল গড়পাড়ার পুরাতন হাটখোলা। ১৯২৪ সালের প্রথম দিকে তখনকার মানিকগঞ্জের বিশিষ্ট সামাজিক ও শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ খান বাহাদুর আওলাদ হোসেন খান, আব্দুল লতিফ বিশ্বাস, মশিউর রহমান রাজা মিয়া ও অ্যাডভোকেট আনেয়ার শিকদার এসে গড়পাড়া ইমামবাড়ির পীর সাহেব হজরত শাহ খলিলুর রহমানকে এ আশুরার শোক মিছিল গড়পাড়া থেকে মানিকগঞ্জে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেন।

হজরত শাহ খলিলুর রহমান পরিষ্কার বলে দেন, ‘এ আশুরার মিছিল সম্পূর্ণ ধর্ম উদ্দেশ্যে করা। মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর প্রাণপ্রিয় দৌহিত্র সত্য ও অসত্যের পার্থক্য রচে দেওয়া মহামানব হজরত ইমাম হোসেন (রা.) ও পাপিষ্ঠ ইয়াজিদের হাতে ৬১ হিজরি কারবালায় নির্মমভাবে শহীদ হওয়া ৭২ পুণ্যাত্মা স্মরণে। এটা শুধুই হজরত ইমাম হোসেনের স্মরণে আয়োজিত। এ মিছিলকে কোনো রাজনৈতিক রং দেওয়া যাবে না ‘

মানিকগঞ্জের তখনকার নেতৃবৃন্দ তা মেনে নিয়েই গড়পাড়া ইমামবাড়ির আশুরার মিছিলকে শহরে নিয়ে যান। সেই থেকে গড়পাড়া ইমামবাড়ির বিরাট শোক মিছিল প্রতি বছর আশুরার দিন বিকেলে মানিকগঞ্জ শহরে আসে।

বাংলা ১৩৬৩ সালের ২২ কার্তিক হজরত শাহ খলিলুর রহমান ইহলোক ত্যাগ করেন। তারপর তার দুই ভাতিজা শাহ আমিনুর রহমান ও শাহ মোখলেসুর রহমান সততা, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে চার যুগের বেশি সময় মহররমের যাবতীয় কার্যক্রম দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করেন। ২০১০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি শাহ আমিনুর রহমান ইহলোক ত্যাগ করে পরলোকে পাড়ি জমান।

তার প্রয়াণের পর ছোট ভাই শাহ মোখলেসুর রহমান গড়পাড়া ইমামবাড়ির মহররমের সমুদয় কার্যক্রম পরিচালনা করেন। কিন্তু ২০২০ সালের ২০ মে শাহ মোখলেসুর রহমানও পরলোক গমন করেন। তারপর থেকে বর্তমান প্রজন্মর দুই বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্য শাহ আরিফুর রহমান বাবু ও শাহ শাহজাদা রহমান বাঁধন শতাব্দী প্রাচীন গড়পাড়া ইমামবাড়ির মহররম পর্বসহ সমুদয় কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন।

সময়ের প্রবাহতায় আজ এই গড়পাড়া ইমামবাড়িতে আশুরার দিন সমবেত হয় লক্ষাধিক ইমামভক্ত। তাদের আন্তরিক উপস্থিতিতে তৈরি হয় বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শোক মিছিল। কালের চক্রে গড়পাড়া ইমামবাড়ির এ বৃহৎ শোক মিছিল মানিকগঞ্জের ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে।

লেখক: জ্যেষ্ঠ খাদেম, গড়পাড়া ইমামবাড়ি দরবার শরিফ, মানিকগঞ্জ।

এআরবি/বিএ