দেশজুড়ে

ময়মনসিংহে এইচআইভির নীরব বিস্তার, ঝুঁকিতে তরুণরা

২৫ বছর বয়সী সুমন (ছদ্মনাম) দীর্ঘদিন ধরে জ্বর, দুর্বলতা ও অস্বাভাবিক ওজন কমে যাওয়ার সমস্যায় ভুগছিলেন। বিভিন্ন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলেও সুস্থ হচ্ছিলেন না। শেষ পর্যন্ত ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালের এইচআইভি টেস্টিং সার্ভিস (এইচটিসি) সেন্টারে রক্ত পরীক্ষা করান তিনি। সেখানেই জানতে পারেন, তিনি হিউম্যান ইমিউনোডেফিসিয়েন্সি ভাইরাসে (এইচআইভি) আক্রান্ত।

Advertisement

সুমন বলেন, প্রথমে খুব ভয় পেয়েছিলাম। রিপোর্ট দেখে মনে হয়েছিল জীবন শেষ। এখন নিয়মিত ওষুধ খাই, চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলি। কিন্তু মানুষ জানলে কী ভাববে, সেই ভয়টাই বেশি কাজ করে।

সুমনের গল্পটি ব্যতিক্রম নয়। বরং ময়মনসিংহে নীরবে বাড়তে থাকা এইচআইভি সংক্রমণের বাস্তব চিত্রেরই একটি অংশ। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত সাড়ে ছয় বছরে ময়মনসিংহ বিভাগে এইচআইভি সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে রয়েছেন শিক্ষার্থী, তরুণ-তরুণী, কর্মজীবী, বিবাহিত নারী-পুরুষ, এমনকি শিশুও।

ছয় বছরে আক্রান্ত ২৫২, মৃত্যু ৮

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এআরটি সেন্টার সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সাল থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত মোট ১৩ হাজার ৬৮৭ জনের এইচআইভি পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে ১২২ জনের শরীরে এইচআইভি শনাক্ত হয়েছে।

Advertisement

এছাড়া ময়মনসিংহের বিভিন্ন হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে আরও ১৩০ জন আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটির ময়মনসিংহ শাখাতেই শনাক্ত হয়েছেন ৪৬ জন।

আরও পড়ুন রাজশাহীতে এইচআইভি আক্রান্তদের ৬৬ শতাংশই সমকামী ইপিআই টিকা, যক্ষ্মা-এইডসের ওষুধ কিনতে ৪৬৩ কোটি টাকা অনুমোদন

সব মিলিয়ে ময়মনসিংহ বিভাগের চার জেলায় এ সময়ে মোট ২৫২ জন এইচআইভি আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে আটজনের মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে বাকি ২৪৪ জন মমেক হাসপাতালের এইচটিসি সেন্টারের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করছেন।

স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টরা বলছেন, শনাক্ত হওয়া রোগীর সংখ্যা প্রকৃত চিত্রের চেয়ে কম হতে পারে। কারণ সামাজিক লজ্জা, ভয় ও কুসংস্কারের কারণে অনেকেই পরীক্ষা করাতে আগ্রহী হন না।

বছরভিত্তিক পরিসংখ্যানে উদ্বেগজনক ঊর্ধ্বগতি

মমেক এইচটিসি সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে এক হাজার মানুষের পরীক্ষা করে মাত্র একজনের শরীরে এইচআইভি শনাক্ত হয়েছিল। ২০২১ সালে ২ হাজার ৩৯২ জনের মধ্যে শনাক্ত হয় একজন। কিন্তু ২০২২ সালে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১০ জনে। ২০২৩ সালে শনাক্ত হয় ১৬ জন। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা বেড়ে ৩১ জনে পৌঁছে। ২০২৫ সালে শনাক্ত হয় ৪৩ জন, যা এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ।

Advertisement

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, ২০২৬ সালের মাত্র প্রথম পাঁচ মাসেই ৭৮৬ জনের পরীক্ষা করে ২০ জনের শরীরে এইচআইভি শনাক্ত হয়েছে। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে চলতি বছরেও আক্রান্তের সংখ্যা নতুন রেকর্ড গড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সবচেয়ে ঝুঁকিতে ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সীরা

স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য বলছে, আক্রান্তদের বড় অংশের বয়স ১৮ থেকে ৪৫ বছরের মধ্যে। তবে সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীদের মধ্যে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ময়মনসিংহের বিভিন্ন মেস ও ভাড়া বাসায় বসবাসকারী কিছু তরুণ বিভিন্ন লোকেশনভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগ ও ডেটিং অ্যাপ ব্যবহার করে একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছেন। এর মধ্যে সমকামী পুরুষদের জন্য ব্যবহৃত কয়েকটি ডেটিং অ্যাপও রয়েছে। এসব অ্যাপের মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা কাছাকাছি অবস্থানকারী অন্য ব্যবহারকারীদের খুঁজে পেয়ে যোগাযোগ স্থাপন করেন এবং পরে ব্যক্তিগতভাবে দেখা করেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অনিরাপদ যৌন আচরণে জড়িয়ে পড়লে এইচআইভিসহ বিভিন্ন যৌনবাহিত সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে।

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এইচটিসি সেন্টারের ফোকাল পারসন ডা. আরিফ মাহবুব জাগো নিউজকে বলেন, ‌‌‘শুধু তরুণদের নৈতিক অবক্ষয়কে দায়ী করলে সমস্যার প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে না। শিক্ষার্থী, বিবাহিত নারী-পুরুষসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের শরীরে এইচআইভি শনাক্ত হচ্ছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মানুষ যেন ভয় বা লজ্জার কারণে পরীক্ষা থেকে দূরে না থাকেন।

তার মতে, এইচআইভি এখন আর নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি একটি জনস্বাস্থ্যগত চ্যালেঞ্জে পরিণত হচ্ছে।

হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সমাজে এখনও অনেক ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, এইচআইভি শুধু নির্দিষ্ট কিছু জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।

আরও পড়ুন কুমিল্লায় বাড়ছে এইডস রোগী, বেশিরভাগই পুরুষ সমকামী ও যৌনকর্মী এইচআইভি পজিটিভ হলেই জীবন এখন আর থেমে যায় না

মমেক হাসপাতালের এইচটিসি সেন্টারের কাউন্সিলর কাম অ্যাডমিনিস্ট্রেটর মো. আবদুল আল মামুন জাগো নিউজকে বলেন, ‘বর্তমানে সমকামী জনগোষ্ঠীর তুলনায় সাধারণ জনগোষ্ঠীর মধ্যেই বেশি এইচআইভি শনাক্ত হচ্ছে। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী যেমন আক্রান্ত হচ্ছেন, তেমনি সাধারণ মানুষও আক্রান্ত হচ্ছেন। কেউ কেউ আক্রান্ত মা-বাবার মাধ্যমে জন্মগতভাবেও সংক্রমিত হচ্ছেন।

তিনি বলেন, রক্ত, বীর্য ও বুকের দুধের মতো নির্দিষ্ট শারীরিক তরলের মাধ্যমে এ ভাইরাস ছড়ায়। অনিরাপদ যৌন সম্পর্ক এবং একই সুই বা সিরিঞ্জ একাধিক ব্যক্তি ব্যবহার করাও বড় ঝুঁকির কারণ।

তিনি জানান, প্রতিদিন গড়ে ৭ থেকে ১৫ জন ব্যক্তি এইচটিসি সেন্টারে পরীক্ষা করাতে আসছেন। শনাক্ত রোগীদের নিয়মিত ফলোআপ, কাউন্সেলিং ও চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। গুরুতর রোগীদের ঢাকার মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে পাঠানো হয়।

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীতেও বাড়ছে সংক্রমণ

ট্রান্সজেন্ডার, হিজড়া ও অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যেও এইচআইভি সংক্রমণ উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বন্ধু সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার সোসাইটির ময়মনসিংহ শাখার ড্রপ-ইন সেন্টার ম্যানেজার আব্দুল্লাহ আল আশিক বলেন, আমাদের সেন্টারে নিয়মিত এইচআইভি পরীক্ষা করা হয়। যাদের শরীরে এইচআইভি শনাক্ত হয়, তাদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনতে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এইচটিসি সেন্টারে রেফার করা হয়।

তার মতে, দ্রুত শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে সংক্রমণের ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।

শিক্ষাবিদ লে. কর্নেল (অব.) ড. মো. শাহাব উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘তরুণদের মধ্যে বাড়তে থাকা সংক্রমণ, শিক্ষার্থীদের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা এবং জন্মগত সংক্রমণের নজির সব মিলিয়ে এটি শুধু স্বাস্থ্য খাতের নয়, পুরো সমাজের জন্য একটি সতর্কবার্তা।

আরও পড়ুন যৌন সম্পর্কই এইচআইভি ছড়ানোর একমাত্র কারণ নয় বাড়ছে এইডস / ভালোবাসা দিবসে ‘আপত্তিকর কাজ’ নয়, কম্বোডিয়ার স্কুলগুলোতে নোটিশ

তিনি বলেন, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠনগুলোকে সচেতনতা বৃদ্ধিতে আরও সক্রিয় হতে হবে। মানুষকে জানতে হবে এইচআইভি কীভাবে ছড়ায় এবং কীভাবে ছড়ায় না। ভুল ধারণা ও সামাজিক কুসংস্কার দূর করতে না পারলে সংক্রমণ প্রতিরোধ কঠিন হবে।

ওষুধসংকটে বাড়ছে রোগীদের দুর্ভোগ

এইচআইভি আক্রান্তদের জন্য হাসপাতালে বিনামূল্যে এআরভি (ARV) ওষুধ সরবরাহ করা হলেও অন্যান্য সহায়ক ওষুধের সংকট রোগীদের ভোগান্তি বাড়িয়েছে।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে রোগীদের জন্য সরবরাহ করা বেশ কিছু সহায়ক ওষুধ বন্ধ রয়েছে। ফলে প্রয়োজনীয় ওষুধ এখন নিজ খরচে কিনতে হচ্ছে। অনেক রোগী আর্থিকভাবে অসচ্ছল হওয়ায় চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে হিমশিম খাচ্ছেন। এতে চিকিৎসা নিয়মিতভাবে চালিয়ে যাওয়া নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে প্রয়োজনীয় সব ধরনের ওষুধের সরবরাহ স্বাভাবিক হয়েছে এবং বর্তমানে রোগীরা নিয়মিতভাবে প্রয়োজনীয় ওষুধ পাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এআরটি সেন্টারের কাউন্সিলর কাম অ্যাডমিনিস্ট্রেটর মো. আবদুল আল মামুন।

তিনি বলেন, গত মাসে সব ধরনের ওষুধ সরবরাহ শুরু হয়েছে। বর্তমানে রোগীরা বিনামূলেই এসব ওষুধ নিতে পারেন।

‘ভয় নয়, প্রয়োজন দ্রুত পরীক্ষা’

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. মুহম্মদ মাঈন উদ্দিন খান বলেন, হাসপাতালে আসা প্রত্যেক রোগীকে যথাযথ চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। ভয় বা লজ্জার কারণে পরীক্ষা না করিয়ে রোগ গোপন রাখা সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। যত দ্রুত শনাক্ত হবে, চিকিৎসার ফল তত ভালো হবে।

তিনি আরও বলেন, সাধারণ স্বাস্থ্যসেবার জন্য আগে যে সহায়ক ওষুধ সরবরাহ করা হতো, রোগীরা যাতে আবারও সেগুলো বিনামূল্যে পান, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ময়মনসিংহে এইচআইভি সংক্রমণের বর্তমান চিত্র একটি নীরব কিন্তু গুরুতর সতর্কসংকেত। আক্রান্তদের সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন না করে চিকিৎসা ও সহায়তার আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে সচেতনতা বৃদ্ধি, ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ কমানো, নিয়মিত পরীক্ষা এবং সামাজিক কুসংস্কার দূর করার উদ্যোগ জোরদার করতে হবে।

তাদের ভাষ্য, ভয় নয়, প্রয়োজন সচেতনতা; লুকিয়ে রাখা নয়, প্রয়োজন পরীক্ষা। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না গেলে আগামী দিনে এই নীরব বিস্তার আরও বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিতে পারে।

এইচএসভি/কেএইচকে/জেআইএম