ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পাওয়ার পর নওগাঁর নাক ফজলি আম নিয়ে দেশজুড়ে আগ্রহ বেড়েছে। কিন্তু সেই আগ্রহের সুযোগ নিয়ে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী ও চাষির বিরুদ্ধে সময়ের আগেই অপরিপক্ব আম বাজারজাত করার অভিযোগ উঠেছে। ফলে কাঙ্ক্ষিত স্বাদ না পেয়ে ক্রেতারা পড়ছেন তিক্ত অভিজ্ঞতায়। কেউ পাচ্ছেন সেদ্ধভাব ও দুর্গন্ধযুক্ত আম, আবার কোনো কোনো আম পাকছেই না। শুকিয়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
Advertisement
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অধিক মুনাফার আশায় অপরিপক্ব আম সংগ্রহ ও রাসায়নিক প্রয়োগের কারণে তৈরি হয়েছে এই পরিস্থিতি। এতে নওগাঁর জিআই স্বীকৃত নাক ফজলি আমের সুনাম ও বাজার দুটিই হুমকির মুখে পড়তে পারে।
আরও পড়ুন সংসদের সবাইকে ১০ কেজি করে আম উপহার, প্রশংসায় ভাসছেন জামায়াত আমিরঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত আরিফ রায়হান। গত ১৩ জুন নওগাঁর বদলগাছী উপজেলা থেকে দুই হাজার ৪০০ টাকায় ৪৫ কেজি নাক ফজলি আম কেনেন। দ্রুততম সময়ের মধ্যে আম হাতে পেয়ে তিনি খুশিই ছিলেন। কিন্তু দুদিন পর আম খেতে গিয়ে হতাশ হন।
‘সামান্য পাকার পর নিয়ম মেনেই আম কাটলাম। কিন্তু ভেতরে সেদ্ধভাব, টক স্বাদ আর হালকা দুর্গন্ধ ছিল। দেখে মনে হয়েছে, পরিপক্ব হওয়ার আগেই কোনো রাসায়নিক প্রয়োগ করে পাকানো হয়েছে। শেষ পর্যন্ত সব আমই ফেলে দিতে হয়েছে’
Advertisement
আরিফ রায়হান জাগো নিউজকে বলেন, ‘সামান্য পাকার পর নিয়ম মেনেই আম কাটলাম। কিন্তু ভেতরে সেদ্ধভাব, টক স্বাদ আর হালকা দুর্গন্ধ ছিল। দেখে মনে হয়েছে, পরিপক্ব হওয়ার আগেই কোনো রাসায়নিক প্রয়োগ করে পাকানো হয়েছে। শেষ পর্যন্ত সব আমই ফেলে দিতে হয়েছে।’
এমন অভিজ্ঞতা শুধু আরিফের নয়। নওগাঁর এক কৃষি কর্মকর্তাও নাক ফজলি আম উপহার পাঠিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, নওগাঁয় কর্মরত থাকায় স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী এই আম একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে উপহার হিসেবে পাঠান। কিন্তু কয়েক দিন পেরিয়ে গেলেও আমগুলো পাকেনি। পরে সেগুলো শুকিয়ে চ্যাপ্টা হয়ে যায়। উপহার পাওয়া ব্যক্তি নষ্ট আমের ছবি পাঠালে তিনি বিব্রত ও লজ্জিত হন।
আরও পড়ুন এক আমের ওজন চার কেজি, দেখতে মানুষের ভিড়কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে নওগাঁর নাক ফজলি আমের জিআই নিবন্ধনের জন্য আবেদন করা হয়। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে ‘নওগাঁর নাক ফজলি আম’ নামে ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায় আমটি। বিশ্ব মেধাসম্পদ দিবস উপলক্ষে ২০২৫ সালের ১ মে এক অনুষ্ঠানে নাক ফজলি আমচাষি সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতি অ্যাডভোকেট মোজাফ্ফর হোসেনের হাতে জিআই সনদ তুলে দেওয়া হয়।
‘নাক ফজলি একটি নাবি মৌসুমের আম। বড় আকার, পাতলা খোসা, মিষ্টি স্বাদ ও বিশেষ গন্ধের জন্য এটি পরিচিত। সাধারণত জুনের শেষ সপ্তাহে আমটি পরিপক্ব হয় এবং আগস্টের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত সংগ্রহ করা যায়। তবে এবার সেই স্বাভাবিক সময়ের আগেই বাজারে এসেছে বিপুল পরিমাণ নাক ফজলি’
Advertisement
নাক ফজলি একটি নাবি মৌসুমের আম। বড় আকার, পাতলা খোসা, মিষ্টি স্বাদ ও বিশেষ গন্ধের জন্য এটি পরিচিত। সাধারণত জুনের শেষ সপ্তাহে আমটি পরিপক্ব হয় এবং আগস্টের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত সংগ্রহ করা যায়। তবে এবার সেই স্বাভাবিক সময়ের আগেই বাজারে এসেছে বিপুল পরিমাণ নাক ফজলি।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জিআই স্বীকৃতির পর আমটির চাহিদা ও দাম বেড়ে যাওয়ায় কিছু অসাধু চাষি অধিক লাভের আশায় অপরিপক্ব অবস্থাতেই আম সংগ্রহ করেছেন। পরে রাসায়নিক প্রয়োগের মাধ্যমে দ্রুত পাকিয়ে বাজারে বিক্রি করা হয়েছে। ফলে ক্রেতারা প্রত্যাশিত স্বাদ ও গুণগত মান থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
আরও পড়ুন কাঁঠালের কেক থেকে মাশরুমের মিষ্টি, ফল মেলায় দর্শনার্থীর ভিড়নওগাঁ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মনজুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘বদলগাছী এলাকার অনেক নাক ফজলি গাছের বয়স বেশি। বয়সজনিত কারণেও কিছু সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে প্রকৃত কারণ নির্ণয়ে আম গবেষণা কেন্দ্রের সহযোগিতা নেওয়া হবে। তারা বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করে সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারবেন।’
‘জিআই স্বীকৃতির পর চাহিদা বেড়েছে। বেশি লাভের আশায় কিছু চাষি সঠিক সময়ের আগে আম সংগ্রহ করেছেন। এর নেতিবাচক প্রভাব এখন বাজারে পড়ছে। এভাবে চলতে থাকলে নাক ফজলি আমের প্রতি ক্রেতাদের আস্থা কমে যাবে। একসময় বাজার হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে ঐতিহ্যবাহী এই আম’
চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. শরফ উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘বাজারে ইথিলিনভিত্তিক বিভিন্ন ধরনের রাইপেন পাওয়া যায়। এসব রাসায়নিক প্রয়োগ করলে ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আম খাওয়ার উপযোগী দেখায়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আম তখনো পরিপক্ব হয় না।’
আরও পড়ুন রাজশাহীর আমে মুগ্ধ মার্কিন রাষ্ট্রদূততিনি আরও বলেন, ‘যে সময় নাক ফজলি পরিপক্ব হওয়ার কথা, তার আগেই বাগান থেকে বেশিরভাগ আম নামিয়ে ফেলা হয়েছে। ফলে ক্রেতারা আম খাওয়ার সময় বুঝতে পারছেন এটি অপরিপক্ব। অনেক ক্ষেত্রে ভেতরে ও বাইরে পচন ধরছে, আবার স্বাদও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।’
গত দুই দশকে নাক ফজলি আম নিয়ে তেমন কোনো অভিযোগ ছিল না। এর কারণ হিসেবে শরফ উদ্দিন বলেন, তখন নির্ধারিত সময়েই আম সংগ্রহ করা হতো।
আরও পড়ুন শখের বশে নার্সারি / বছরে ১০ লাখ টাকার আম বিক্রি করেন কবির হোসেনতিনি বলেন, ‘জিআই স্বীকৃতির পর চাহিদা বেড়েছে। বেশি লাভের আশায় কিছু চাষি সঠিক সময়ের আগে আম সংগ্রহ করেছেন। এর নেতিবাচক প্রভাব এখন বাজারে পড়ছে। এভাবে চলতে থাকলে নাক ফজলি আমের প্রতি ক্রেতাদের আস্থা কমে যাবে। একসময় বাজার হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে ঐতিহ্যবাহী এই আম।’
এসআর/এএসএম