‘জোগো বোনিতো’। পর্তুগিজ ভাষায় এই শব্দগুচ্ছের ইংরেজি অর্থ ‘দ্য বিউটিফুল গেম’। অর্থাৎ ‘সুন্দর খেলা।’ এই শব্দবন্ধের পেটেন্ট শুধুমাত্র ব্রাজিলিয়ানদের। ফুটবলে সুন্দর এবং ছন্দময় খেলার কথা বলা হলেই সবার আগে আসে ব্রাজিলের নামটি। মেসি-ম্যারাডোনারা যত সুন্দর ফুটবলই উপহার দিন না কেন, ‘জোগো বোনিতো’র মালিক শুধুই ব্রাজিল।
Advertisement
কিন্তু গত কয়েক বছরে সেই চেনা ব্রাজিলকে যেন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। ফল আসছিল, ম্যাচ জিতছিল, কিন্তু হৃদয় জিততে পারছিল না। মাঠে ছিল না সেই শিল্প, ছিল না সেই আত্মবিশ্বাসী (সাম্বা) নৃত্য।
‘জোগো বোনিতো’ এখন কেবলই অতীত। রোনালদো, রিভালদো, রোনালদিনহো, কাকাদের সঙ্গে যেন ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের সৌন্দর্য হারিয়ে গেছে। এখন ‘জোগো বোনিতো’ যেন জাদুঘরে গেলে দেখতে পাওয়া যায়। ও হ্যাঁ, ইউটিউবেও পাবেন। ব্রাজিলের পুরনো খেলা এখন ইউটিউব ঘাঁটলে পাওয়া যায়। বর্তমান দলটির খেলা সরাসরি দেখার চেয়ে ব্রাজিল ফুটবল ভক্তদের অনেকেই রোনালদো-রোনালদিনহোদের খেলা দেখে মন ভরায়।
‘জোগো বোনিতোর’ ছিটেফোঁটা এখনও টিকে আছে। নেইমার যেন সেই সৌন্দর্যের স্মৃতি খানিকটা বয়ে বেড়াচ্ছেন। আরও একজনের পায়ে দেখা যাচ্ছে ‘সুন্দর খেলার’ লিগ্যাসি। তিনি ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। ব্রাজিল দলটি যেমনই খেলুক, ভিনিসিয়ুসের খেলা মন-প্রাণভরে দেখা যায়। তার গোলগুলোও সুন্দর।
Advertisement
মরক্কোর বিপক্ষে যে গোলটি দিয়েছিলেন, ব্রাজিল ভক্তদের চোখে লেগে আছে। এরপর হাইতির বিপক্ষে করা গোল কিংবা আজ (বৃহস্পতিবার) স্কটিশ গোলরক্ষককে ‘ডজ’ দিয়ে যে গোলটি সহজেই স্কটল্যান্ডের জালে জড়িয়ে দিলেন, তা রীতিমত চোখ ধাঁধানো।
নেইমার নেই (প্রথম ২ ম্যাচে), বিশ্বকাপে ব্রাজিল যেন এমনিতেই খানিকটা নিষ্প্রভ। দলে থাকলেও খেলতে পারছিলেন না। যত ভালো কোচই হন না কেন, জোড়াতালি দেওয়া একটি দলকে কার্লো আনচেলত্তি কতটুকুই বা টেনে নিতে পারবেন? একে তো বড় দলের তকমা, তারওপর হেক্সা জয়ের প্রচণ্ড একটি চাপ, কার্লো আনচেলত্তির মাথায় ‘জোগো বোনিতো’র ভূত স্বাভাবিকভাবেই চেপে বসার কথা না।
জয়ই যখন সবকিছুর মূলমন্ত্র, তখন ‘ছন্দময়’ ফুটবলের অলিক স্বপ্ন দেখাটাও ‘অপরাধ’। আনচেলত্তি হাঁটলেন- প্রত্যাশার চাপ মেটানোর দিকে। পায়ের তলায় তো মাটি দরকার। শিষ্যদের তিনি শিখিয়ে দিলেন- যে কোনো মূল্যে জয় চাই। জেতার অভ্যেস তৈরি হলেই না কেবল ভিন্ন কিছু নিয়ে চিন্তা করা যায়।
মরক্কোর বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে এলোমেলো ব্রাজিলকে দেখে ভক্ত-সমর্থকদের চূড়ান্তরূপে হতাশ হওয়ার জোগাড়। মনে হচ্ছিল না, এই দলটি বিশ্বকাপের অন্যতম ফেবারিট। যে ছন্দময় ফুটবলকে ভালোবেসে তারা ব্রাজিলের সমর্থক, সেই ফুটবল কোথায়? এ যে আর আট-দশটা সাধারণ দলের মতো খেলা! না আছে ছন্দ, না আছে গতি, আর না আছে জয়ের ক্ষুধা কিংবা গোল করার কোনো কারিশমা।
Advertisement
মানলাম, মরক্কো গত বিশ্বকাপের সেমিফাইনালিস্ট। কিন্তু ‘ব্রাজিল’ নামটা তো নিজে থেকেই অনেক বড়। কথায় বলে না, ‘ধারে কাটে না ভারে কাটে’- ব্রাজিলের বর্তমান দলটির ধার নেই, ভার তো আছে!
সেই ‘ভারে’র ছিঁটেফোটাও দেখা যায়নি মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচে। বলের দখল তো দূরে থাক পায়েই থাকে না, পাস দিলে রিসিভ করতে পারে না, নিখুঁত পাস- তো যেন ব্রাজিল ফুটবলারদের কাছে স্বপ্ন মনে হচ্ছিল। এক ভিনিসিয়ুস জুনিয়র যদি ব্যক্তিগত কারিশমায় ওইদিন গোলটি করতে না পারতেন, তাহলে রীতিমত লজ্জা নিয়েই মাঠ ছাড়তে হতো।
‘ভয়ঙ্কর মরক্কো’ (অন্তত ব্রাজিলের বর্তমান ফুটবল দলটির কাছে) বাধা কাটানোর পর দুর্বল হাইতিকে পেয়ে খানিকটা খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেছিলো ব্রাজিল। ম্যাতিয়াস কুনহার জোড়া এবং ভিনিসিয়ুসের একটি গোলে ৩-০ ব্যবধানে জয় পেয়েছে ঠিক, কিন্তু নিজেদের খেলা দিয়ে ব্রাজিল ফুটবলাররা সমর্থকদের মন ভরাতে পারেননি। তবুও, স্বান্তনা- জয়ের অভ্যেস তো তৈরি হচ্ছে! আনচেলত্তিরও হয়তো মূল ভরসা এখানে- একবার জয়ের খোঁজ পেলে এই ব্রাজিলকে তিনি অনেকদূর এগিয়ে নিতে পারবেন।
‘সি’ গ্রুপের শেষ ম্যাচে মুখোমুখি স্কটল্যান্ডের। হাইতির চেয়ে ঢের এগিয়ে থাকা একটি দল। সবচেয়ে বড় কথা, দলটি ইউরোপের। আফ্রিকান এবং ক্যারিবিয়ান ফুটবলের চেয়ে ইউরোপের ফুটবল অবশ্যই কঠিন। নকআউটের আগে এটাই ব্রাজিলের জন্য অনেক বড় পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় পাস করার সঙ্গে দলটি নিজেদের খোলস ছেড়ে কতটা বেরিয়ে আসতে পারছে, সেটাও ছিল সমর্থকদের কাছে অনেক বড় একটি দেখার বিষয়। আবার এই ম্যাচেই মাঠে ফিরছেন নেইমার, এমন একটি হাইপও উঠে গিয়েছিল।
স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রদের জয়ের অভ্যেস ধরে রাখার সঙ্গে ছন্দে ফেরারও দারুণ প্রচেষ্টা দেখা গেছে। বল দখলে রেখে খেলার চিরাচরিত যে দৃশ্য ব্রাজিলের দেখা যায়, সেটার কিঞ্চিত হলেও দেখা মিলেছে স্কটিশদের বিপক্ষে। বলা যায় বিশ্বকাপে ধীরে ধীরে যেন পুরোনো খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।
স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয়টি শুধু একটি জয় নয়, এটি ছিল ব্রাজিলের আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়া এবং ছন্দময় ফুটবল ফিরিয়ে আনার একটি বার্তা। এটি ছিল নিজেদের হারানো পরিচয় আবার খুঁজে পাওয়ার ইঙ্গিত। সবচেয়ে বড় কথা, ব্রাজিল এখন শুধু জিতছে না; ব্রাজিল খেলছেও।
স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে শুরু থেকেই বলের নিয়ন্ত্রণ ছিল তাদের পায়ে। আক্রমণে ছিল গতি, উইং দিয়ে ছিল ধারাবাহিক চাপ, মাঝমাঠে ছিল নিয়ন্ত্রণ আর রক্ষণে ছিল দৃঢ়তা। প্রতিটি আক্রমণে যেন ফুটে উঠছিল আত্মবিশ্বাস। এমন এক ব্রাজিল, যাদের দেখে সমর্থকরা আবারও স্বপ্ন দেখতে শুরু করতে পারে।
ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ছিলেন ব্রাজিলের ছন্দে ফেরার মূল ব্যক্তি। স্কটিশ ডিফেন্সকে বারবার তছনছ করে দিয়েছেন তিনি। যেখান থেকে করেছেন দুটি গোল করেছেন, আরও কয়েকবার স্কটল্যান্ডের রক্ষণকে ভোগান্তিতে ফেলেছেন। তবে শুধু গোলের জন্য নয়, তার শরীরী ভাষাই বলে দিচ্ছিল ব্রাজিল কতটা আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠছে। বল পেলেই প্রতিপক্ষকে চ্যালেঞ্জ করা, ড্রিবল করে এগিয়ে যাওয়া, ঝুঁকি নেওয়ার সাহস- এসবই তো ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের চিরচেনা বৈশিষ্ট্য।
দীর্ঘদিন ধরে ব্রাজিলের খেলা নিয়ে সবচেয়ে বড় অভিযোগ ছিল, তারা যেন ইউরোপীয় ধাঁচের যান্ত্রিক ফুটবলে আটকে যাচ্ছে। ফলের জন্য খেলছে; কিন্তু আনন্দের জন্য নয়। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে সেই অভিযোগের জবাব দিয়েছে সেলেসাওরা। তাদের খেলায় ছিল স্বাধীনতা, কিছুটা সৃজনশীলতা, ছিল দর্শকদের জন্য কিছু বিশেষ উপহার দেওয়ার চেষ্টা।
কার্লো আনচেলত্তির হাত ধরে এই পরিবর্তনের আভাস ধীরে ধীরে স্পষ্ট হচ্ছে। অভিজ্ঞ এই ইতালিয়ান কোচ জানেন, ব্রাজিলের ডিএনএ শুধু শৃঙ্খলা দিয়ে তৈরি নয়। সেখানে সৌন্দর্যও আছে, কল্পনাও আছে। আর এ দুইয়ের সমন্বয় ঘটাতে পারলেই সবচেয়ে ভয়ংকর হয়ে ওঠে ব্রাজিল।
স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটি দেখার পর মনে হয়েছে, সেই পথেই হাঁটছে সেলেসাওরা। এখনও তারা নিখুঁত নয়। এখনও উন্নতির জায়গা আছে। সামনে আরও কঠিন প্রতিপক্ষ অপেক্ষা করছে। কিন্তু বিশ্বকাপের এ পর্যায়ে এসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ব্রাজিল নিজেদের খুঁজে পেতে শুরু করেছে।
যে ব্রাজিলকে দেখে দর্শকরা মুগ্ধ হয়, যে ব্রাজিলকে দেখে শিশুরা ফুটবল খেলতে শেখে, যে ব্রাজিলকে দেখে বিশ্বকাপের রং আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে- সেই ব্রাজিলের আভাস মিলছে আবার। ভিনিসিয়ুস এই ফিরে আসার কেন্দ্রীয় চরিত্র হলে, সেখানে আরও আশার খবর হলো- নেইমার ফিরেছেন মাঠে।
ইনজুরিপ্রবণ এই ফুটবলার যদি বিশ্বকাপের বাকি অংশ নিজের সত্যিকার খেলাটা উপহার দিতে পারেন, তাহলে সত্যিই এই ব্রাজিলকে সামনে ভয়ঙ্কররূপে দেখতে পাবে প্রতিপক্ষরা। আর ভক্ত-সমর্থকরা দেখবে তাদের সেই প্রিয় ‘জোগো বোনিতো’কে। দেখবে আত্মবিশ্বাসী সাম্বা নাচ। জয়ের সঙ্গে ছন্দময় ফুটবল- জমে একেবারে খির হয়ে যাবে, নিশ্চিত!
আইএইচএস/এমএমআর