প্রবাস

ঈদের সকালে সেই একটি চিঠি এবং বদলে যাওয়া জীবন

আমান ইয়াফি, জার্মানি

Advertisement

২০১৯ সালের কথা। তখন আমি স্নাতক শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। ঠিক সেই সময় থেকেই জার্মানি যাওয়ার প্রতি আমার মনের ভেতর অন্যরকম এক টান কাজ করতে শুরু করে। উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে খোঁজখবর নেওয়া শুরু করলাম।

বিভিন্ন এজেন্সিতে যাওয়া, আগে যারা জার্মানিতে গিয়েছেন সেসব বড় ভাইদের সঙ্গে কথা বলা আর নিজে নিজে তথ্য সংগ্রহ করা—এটাই ছিল তখনকার রুটিন। খুব দ্রুতই একটা বিষয় পরিষ্কার হয়ে গেলো, জার্মানি যাওয়ার মূল চাবিকাঠি হলো দেশটির ভাষা শেখা।

যেই ভাবা সেই কাজ। নিজে নিজেই ইন্টারনেট এবং বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যমের সহায়তায় জার্মান ভাষা শেখার চেষ্টা শুরু করলাম। কিন্তু ২০২০ সালে বিশ্বজুড়ে করোনা মহামারি চলে আসায় পুরো পরিকল্পনায় বড় একটা ধাক্কা লাগে। খণ্ডকালীন চাকরি, পড়াশোনা আর ভাষা শেখা—সবকিছু একসাথে সামলাতে গিয়ে গতি অনেকটাই কমে গিয়েছিল।

Advertisement

আমার প্রাতিষ্ঠানিক ফলাফলও খুব একটা আহামরি ছিল না। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবসায় শিক্ষা শাখায় আমার অর্জিত মানদণ্ড ছিল চারের মধ্যে ২.৫৩, যা জার্মানির মূল্যায়ন পদ্ধতি অনুযায়ী দাঁড়ায় ৩.২। শুরুতেই বুঝতে পেরেছিলাম, জার্মানির সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সরাসরি সুযোগ পাওয়া আমার জন্য বেশ কঠিন হবে।

তখনই ভাবলাম, স্নাতকোত্তরের চেয়ে বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ বা কর্মমুখী শিক্ষার পথটাই হয়তো আমার জন্য বেশি বাস্তবসম্মত। মূলত এই কারণেই জার্মান ভাষা শেখার ব্যাপারে আমি আরও বেশি মনোযোগী হয়ে উঠি।

কঠোর পরিশ্রমে নিজে নিজেই ভাষার প্রাথমিক ধাপ সম্পন্ন করলাম। এরপর কর্মমুখী শিক্ষার লক্ষ্যকে সামনে রেখে একজন শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা শুরু করি। পরবর্তী ছয় মাসের একটানা চেষ্টায় ভাষার আরও দুটি উচ্চতর ধাপ সফলভাবে শেষ করলাম।

তবে এরপর যখন একটি পূর্ণকালীন চাকরিতে যোগ দিলাম, তখন ভাষার পেছনে যেভাবে সময় ও মনোযোগ দেওয়া দরকার ছিল, তা আর ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। কর্মব্যস্ততা, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা আর পারিবারিক দায়িত্ব—সব মিলিয়ে ভাষা চর্চায় সাময়িক ছেদ পড়ে। তবুও মনের কোণে জার্মানি যাওয়ার স্বপ্নটা আমি কখনই মরে যেতে দিইনি।

Advertisement

আরও পড়ুন ইতালিতে ৩ বাংলাদেশিকে হত্যা: সন্দেহভাজন আরেক বাংলাদেশিকে খুঁজছে পুলিশ

২০২২ সালে প্রথমবার স্নাতকোত্তর ভিসার জন্য সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ করি। কিন্তু প্রায় এক বছর অপেক্ষা করার পর উপলব্ধি করলাম, তখনও আমার আন্তর্জাতিক ইংরেজি দক্ষতা যাচাই পরীক্ষা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদনের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শেষ হয়নি।

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বাধ্য হয়ে সেই সময়সূচি বাতিল করতে হলো। এরপর স্নাতক পর্যায়ের জন্য নতুন করে সময় নিলেও, দুই মাস পর সেটিও বাতিল করতে হয়। অবশেষে ২০২৩ সালের ৩ নভেম্বর আবার নতুন করে স্নাতকোত্তর ভিসার জন্য সাক্ষাৎকারের সময় চূড়ান্ত করি।

এরপর ইংরেজি দক্ষতা যাচাই পরীক্ষায় অংশ নিলাম এবং কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করলাম। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে আশানুরূপ ফলাফল না পেলেও, বিকল্প হিসেবে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অফার লেটার নিজের কাছে সংগ্রহে রেখেছিলাম, যেন আপদকালীন সময়ে সেটি ব্যবহার করা যায়।

অবশেষে অপেক্ষার প্রহর কাটল। ঈদের ঠিক দুই দিন পরের এক সকাল। ঘুম থেকে উঠে প্রতিদিনের মতো যখন বৈদ্যুতিন চিঠি বা মেইল পরীক্ষা করছিলাম, হঠাৎ চোখ আটকে গেল। জার্মান দূতাবাস থেকে একটি চিঠি এসেছে—আমার কাগজপত্র জমা দেওয়ার জন্য!

সেই মুহূর্তের অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো ছিল না। একদিকে আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আর স্বস্তির আনন্দ, অন্যদিকে বুক চিরে জেগে বসল নতুন এক দুঃশ্চিন্তা—এত অল্প সময়ের মধ্যে বিশাল অঙ্কের এই অর্থের জোগান কীভাবে হবে?

জার্মান দূতাবাস থেকে সেই ডাক পাওয়ার পর থেকে হাতে ভিসা পাওয়া পর্যন্ত সময়টা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন এবং চ্যালেঞ্জিং অধ্যায়। বিপুল পরিমাণ অর্থের সংস্থান, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিখুঁতভাবে প্রস্তুত করা, মানসিক চাপ আর অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে প্রতিটি দিন ছিল একেকটি অগ্নিপরীক্ষা।

চলবে...

এমআরএম