একই বাড়িতে থাকা মানেই যে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকবে, এমনটি সব সময় ঠিক হয় না। অনেক পরিবারে দেখা যায়, সবাই একসঙ্গে থাকলেও একে অপরের সঙ্গে খুব কম কথা বলেন। দিনের বেশির ভাগ সময় কেটে যায় কাজ, পড়াশোনা কিংবা মোবাইল ফোনে ব্যস্ত থেকে। ফলে ধীরে ধীরে একই ছাদের নিচে থেকেও মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়।
Advertisement
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সম্পর্ক শুধু একসঙ্গে বসবাসের ওপর নির্ভর করে না। বরং নিয়মিত যোগাযোগ, পারস্পরিক সম্মান, সময় দেওয়া এবং একে অপরের অনুভূতি বোঝার চেষ্টাই একটি সম্পর্ককে দৃঢ় করে। এসবের অভাব হলে একই বাড়িতে থেকেও অনেকেই একাকী অনুভব করতে পারেন।
কথাবার্তা কমে যাওয়াপরিবারের সদস্যদের মধ্যে দূরত্ব বাড়ার অন্যতম কারণ হলো যোগাযোগের অভাব। অনেক সময় প্রয়োজন ছাড়া কেউ কারো সঙ্গে কথা বলেন না। কেবল খাওয়া, বাজার বা দৈনন্দিন কাজের প্রয়োজনেই কথা হয়। কিন্তু মনের কথা, দিনের অভিজ্ঞতা বা ছোট ছোট আনন্দ ভাগাভাগি করার অভ্যাস হারিয়ে গেলে সম্পর্কেও দূরত্ব তৈরি হয়।
মোবাইল ও প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহারবর্তমানে পরিবারের সবাই একই ঘরে থাকলেও প্রত্যেকে নিজের মোবাইল ফোন বা অন্য ডিভাইসে ব্যস্ত থাকেন। একসময় সন্ধ্যার পর পরিবারের সবাই একসঙ্গে গল্প করতেন। এখন সেই সময়ের জায়গা দখল করেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও বা অনলাইন বিনোদন। ফলে একসঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ কমে যাচ্ছে।
Advertisement
অফিস, ব্যবসা, পড়াশোনা এবং নানা দায়িত্বের কারণে অনেকেই পরিবারের জন্য আলাদা সময় বের করতে পারেন না। দিনের শেষে সবাই এতটাই ক্লান্ত থাকেন যে, প্রয়োজনীয় কথাবার্তার বাইরে আর কোনো আলাপ হয় না। দীর্ঘদিন এমন চলতে থাকলে আবেগের সংযোগ দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
একে অপরকে না শোনাঅনেক সময় আমরা নিজের কথা বলতেই বেশি আগ্রহী থাকি, কিন্তু অন্যের কথা মন দিয়ে শুনি না। পরিবারের কেউ কোনো সমস্যার কথা বলতে চাইলে সেটিকে গুরুত্ব না দেওয়া বা দ্রুত বিচার করে ফেলা সম্পর্কের মধ্যে আস্থার ঘাটতি তৈরি করতে পারে। ধীরে ধীরে মানুষ নিজের অনুভূতি প্রকাশ করাই বন্ধ করে দেন।
ছোট অভিমান জমে বড় দূরত্বসব সম্পর্কেই মতের অমিল বা ভুল বোঝাবুঝি হতে পারে। কিন্তু সেই সমস্যাগুলো নিয়ে খোলামেলা আলোচনা না করলে ছোট অভিমান ধীরে ধীরে বড় দূরত্বে রূপ নেয়। অনেকেই মনে করেন, সময়ের সঙ্গে সব ঠিক হয়ে যাবে। বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে না বলা কষ্ট সম্পর্ককে আরও দুর্বল করে দেয়।
তুলনা ও অতিরিক্ত সমালোচনাপরিবারে যদি বারবার অন্য কারও সঙ্গে তুলনা করা হয় বা প্রতিটি কাজের সমালোচনা করা হয়, তাহলে সম্পর্কের উষ্ণতা কমে যায়। এতে আত্মবিশ্বাসে প্রভাব পড়ে এবং পরিবারের সদস্যরা নিজেদের গুটিয়ে নিতে শুরু করেন। একটি সুস্থ সম্পর্কের জন্য সমালোচনার পাশাপাশি প্রশংসা ও উৎসাহও জরুরি।
Advertisement
একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া, বেড়াতে যাওয়া কিংবা অন্তত দিনে কিছু সময় গল্প করা সম্পর্ককে শক্তিশালী করে। কিন্তু যখন পরিবারের প্রত্যেকে আলাদা রুটিনে চলতে শুরু করেন, তখন সেই সুযোগ কমে যায়। নিয়মিত ছোট ছোট মুহূর্ত ভাগাভাগি করাও পারিবারিক বন্ধনকে দৃঢ় রাখতে সাহায্য করে।
মানসিক চাপের প্রভাবকর্মক্ষেত্রের চাপ, আর্থিক উদ্বেগ বা ব্যক্তিগত সমস্যার কারণে অনেকেই চুপচাপ হয়ে যান। তখন পরিবারের সঙ্গে আগের মতো সময় কাটাতে বা কথা বলতে ইচ্ছা করে না। যদি এই পরিস্থিতি দীর্ঘদিন চলতে থাকে, তাহলে অজান্তেই সম্পর্কের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হতে পারে।
আরও পড়ুন ব্যক্তিগত কথা বেশি শেয়ার করলে কেন মানুষের আগ্রহ কমে যেতে পারে দূরত্ব কমানোর উপায়পরিবারের সম্পর্ক ভালো রাখতে প্রতিদিন বড় কোনো আয়োজনের প্রয়োজন নেই। ছোট ছোট অভ্যাসই বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
প্রতিদিন অন্তত ১৫-২০ মিনিট মোবাইল ছাড়া একসঙ্গে সময় কাটানো। পরিবারের সদস্যদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা। ছোট সাফল্যেও প্রশংসা করা। অভিমান জমতে না দিয়ে সময়মতো কথা বলা। সপ্তাহে অন্তত একবার একসঙ্গে খাওয়ার বা ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা করা। পরিবারের সদস্যদের ব্যক্তিগত মতামত ও সীমারেখার প্রতি সম্মান দেখানো। আরও পড়ুন কথা কম বলার অভ্যাস মানেই আবেগহীনতা নয়একই ছাদের নিচে থাকা মানেই মানসিকভাবে কাছাকাছি থাকা নয়। সম্পর্ক টিকে থাকে যত্ন, সময়, শ্রদ্ধা এবং আন্তরিক যোগাযোগের ওপর। তাই পরিবারে যদি দূরত্ব তৈরি হতে শুরু করে, তাহলে সেটিকে স্বাভাবিক ভেবে এড়িয়ে না গিয়ে ছোট ছোট পরিবর্তনের মাধ্যমে আবারও সম্পর্কের উষ্ণতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা উচিত। একসঙ্গে কিছুটা সময় কাটানো বা মন দিয়ে অন্যের কথা শোনাই সম্পর্ককে নতুন করে গড়ে তুলতে পারে।
সূত্র: সাইকোলজি টুডে, মিডিয়াম ও অন্যান্য
এসএকেওয়াই