ফরিদপুরে ন্যায্যমূল্য না পেয়ে চরম হতাশায় পেঁয়াজ পানিতে ফেলে দিচ্ছেন কৃষকরা। উৎপাদন খরচের অর্ধেকেরও কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ায় অনেকেই ক্ষোভ, হতাশা ও অসহায়ত্ব থেকে খাল, পুকুর ও ডোবার পানিতে পেঁয়াজ ফেলে দিচ্ছেন। ঘাম ঝরিয়ে উৎপাদিত ফসলের এমন পরিণতি স্থানীয়দেরও ব্যথিত করেছে।
Advertisement
সম্প্রতি সালথা উপজেলার খোয়াড় গ্রামের একটি ডোবার পানিতে কৃষকদের পেঁয়াজ ফেলে দিতে দেখা যায়। এ দৃশ্য স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে। কৃষকদের ভাষ্য, বাজারে বর্তমান দামে পেঁয়াজ বিক্রি করার চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে ফেলে দেওয়াই যেন কম কষ্টের।
সালথার পেঁয়াজ চাষি দাউদ মাতুব্বর বলেন, ‘বর্তমানে প্রতি মণ পেঁয়াজ ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ এক মণ পেঁয়াজ উৎপাদন করতে সার, বীজ, সেচ, ডিজেল, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি মিলিয়ে ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। এরপর মৌসুম শেষে ঘরের চাঙ বা মাচায় সংরক্ষণ করতে হয়। পাঁচ-ছয় মাস পর সংরক্ষণের কারণে ওজন কমে এক মণ পেঁয়াজ প্রায় ৩০ কেজিতে নেমে আসে। সব মিলিয়ে লোকসান ছাড়া কিছুই থাকছে না।’
একই গ্রামের কৃষক আবুল মাতুব্বর বলেন, ‘কৃষকের এমন দুর্দশা সত্ত্বেও সরকারের তেমন কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে। দেশের অধিকাংশ মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হলে একসময় মানুষ চাষাবাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে।’
Advertisement
শুধু সালথা নয়, জেলার নগরকান্দা, বোয়ালমারী, ভাঙ্গা, সদরপুর ও মধুখালী উপজেলার পেঁয়াজ চাষিরাও একই সংকটে রয়েছেন। উৎপাদন ভালো হলেও বাজারে দাম না থাকায় অধিকাংশ কৃষক লোকসান গুনছেন। অনেকেই ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেছেন। এখন সেই ঋণের কিস্তি পরিশোধ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
সালথার কৃষক আহম্মদ মাতুব্বর বলেন, ‘এক বিঘা জমিতে পেঁয়াজ আবাদ করতে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি খরচ হয়। এক মণ পেঁয়াজ বিক্রি করে এখন এক কেজি গরুর মাংসও কেনা যায় না। এভাবে চলতে থাকলে আগামী বছর পেঁয়াজ চাষ করবো কি না, সেটাই ভাবছি।’
ফরিদপুর শহরের পাইকারি ব্যবসায়ী শাহজাহান ব্যাপারী বলেন, ‘এ বছর ফলন ভালো হয়েছে। বিভিন্ন জেলা থেকেও প্রচুর পেঁয়াজ বাজারে আসছে। ফলে দাম কমেছে। তবে কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় বাজার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।’
কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশে চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বৃদ্ধি এবং আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাবের কারণে প্রতিবছরই পেঁয়াজের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দেয়। দাম বাড়লে ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হন, আর দাম কমে গেলে সর্বস্ব হারান কৃষকরা। দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণের সুযোগ না থাকায় কৃষক বাধ্য হয়ে কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করেন কিংবা নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় ফেলে দেন।
Advertisement
সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দবির উদ্দিন বলেন, ‘পেঁয়াজের দাম না থাকায় কৃষক কষ্টে আছেন, এটি সত্য। তারা ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না বলে অবগত হয়েছি।’
এ বিষয়ে সালথা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম বলেন, ‘চলতি মৌসুমে সালথা উপজেলায় পেঁয়াজ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১১ হাজার ৫০০ হেক্টর। তবে কৃষকদের আগ্রহে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে ১২ হাজার ৫৮৫ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে। এ বছর উপজেলায় প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার ১২৫ মেট্রিক টন পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়েছে। আমাদের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি কেজি পেঁয়াজ উৎপাদনে কৃষকের গড়ে প্রায় ২৪ টাকা খরচ হয়। অর্থাৎ প্রতি মণের উৎপাদন খরচ দাঁড়ায় প্রায় ৯৬০ টাকা।’
তিনি আরও বলেন, ‘কৃষকদের সংরক্ষণ পদ্ধতি সম্পর্কে নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তবে বাজারমূল্য নির্ধারণ কৃষি বিভাগের হাতে নেই।’
ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মো. শাহাদুজ্জামান জানান, পেঁয়াজ সংরক্ষণে কৃষকদের সহায়তা দিতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জেলায় ১ হাজার ৪৩০টি এয়ারফ্লো মেশিন বিতরণ করা হয়েছে। চলতি বছর ইতোমধ্যে ৭০০টি বিতরণ করা হয়েছে এবং আরও প্রায় আড়াই হাজার মেশিন সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এন কে বি নয়ন/এফএ/জেআইএম