রাজনীতি

আদ্-দ্বীন হাসপাতাল দ্রুত চালুর দাবি জামায়াতের

বিকল্প কোনো ব্যবস্থা না করে আদ্-দ্বীন হাসপাতাল বন্ধ রাখায় অন্তত ৭৫০ জন মেডিকেল ও সমপরিমাণ নার্সিং শিক্ষার্থীর একাডেমিক জীবন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, কেবল বই পড়ে কেউ ডাক্তার বা নার্স হতে পারে না, তাদের জন্য ব্যবহারিক শিক্ষা ও রোগী অপরিহার্য। হাসপাতালের কোনো দুর্বলতা থাকলে তা তদন্ত ও শাস্তির আওতায় আনার পাশাপাশি মানবিক ও যৌক্তিক কারণে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ রক্ষায় অতি দ্রুত আদ্-দ্বীন হাসপাতালটি খুলে দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি জোরালো আহ্বান জানান তিনি।

Advertisement

সোমবার (২৯ জুন) জাতীয় সংসদে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

ডা. শফিকুর রহমান দেশের স্বাস্থ্য খাতকে একটি মানবিক ও ‌‘মিশনারি’ মডেলে রূপান্তর করার ওপর জোর দেন। দেশের চিকিৎসকদের প্রতিভার প্রশংসা করে তিনি বলেন, বেসরকারি হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজগুলোর পরিদর্শনে রেগুলারেটরি সংস্থাগুলো যতটা কঠোর ও তৎপর, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা ততটাই নিষ্ক্রিয়। সরকারি খাতে বড় কোনো অপরাধ বা গাফিলতি হলেও সবাই বহাল তবিয়তে পার পেয়ে যাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অপরাধ যেখানেই হোক, সরকারকে দুই খাতকেই সমান চোখে দেখতে হবে।

সম্প্রতি বন্ধ হওয়া আদ্-দ্বীন হাসপাতাল প্রসঙ্গে টেনে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা থাকলে তার তদন্ত হোক এবং দোষীদের শাস্তি হোক, এতে কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু এই হাসপাতালের সঙ্গে প্রায় ৭৫০ জন মেডিকেল শিক্ষার্থী এবং সমপরিমাণ নার্সিং শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ জড়িত। কোনো বিকল্প ব্যবস্থা না করে হাসপাতালটি বন্ধ রাখায় এই শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার এখন অন্ধকারের মুখে। এছাড়া বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে বিপুল সংখ্যক বিদেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে, যা থেকে দেশ প্রচুর রেমিট্যান্স অর্জন করছে। মাঝপথে হাসপাতাল বন্ধের মতো সিদ্ধান্তহীনতা ও অস্থিতিশীলতা আন্তর্জাতিক মহলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করবে এবং বিদেশি শিক্ষার্থীরা আর বাংলাদেশে আসার আগ্রহ দেখাবে না। তাই মানবিক ও যৌক্তিক কারণে অতি দ্রুত আদ্-দ্বীন হাসপাতালটি খুলে দেওয়ার জন্য তিনি সরকারের প্রতি জোরালো আহ্বান জানান।

Advertisement

প্রস্তাবিত বাজেটে দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি প্রবাসীদের আস্থায় আনার বা সম্মানিত করার কোনো বিশেষ উদ্যোগ লক্ষ্য করেননি জানিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন ডা. শফিকুর রহমান। প্রবাসীদের বৈশ্বিক ও দেশীয় সংকট নিরসনে তিনি সংসদ থেকে একটি বিশেষ সর্বদলীয় ‘টাস্কফোর্স’ গঠনের প্রস্তাব পুনর্ব্যক্ত করেন। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের চরম অনিয়ম ও দুর্নীতির সমালোচনা করে তিনি বলেন, যেখানে সরকারিভাবে মাত্র ৮৫ হাজার টাকায় একজন শ্রমিকের মালয়েশিয়া যাওয়ার কথা, সেখানে একটি চক্র সিন্ডিকেট করে একেকজন নিরীহ কর্মীর কাছ থেকে ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এই সিন্ডিকেট দেশের যুবকদের সব সম্বল কেড়ে নিচ্ছে। তিনি অন্তর্র্বতীকালীন এই গণতান্ত্রিক সরকারকে শক্ত হাতে এই চেইন এবং সিন্ডিকেট ভেঙে খানখান করে দেওয়ার অনুরোধ জানান। এছাড়া দালালের খপ্পরে পড়ে মালয়েশিয়ার জেলে বন্দি থাকা শ্রমিকদের মুক্ত করতে প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক সফরের প্রচেষ্টাকে ধন্যবাদ জানিয়ে মূল অপরাধী দালালদের শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।

রাজনৈতিক প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান জুলাই বিপ্লবের বীরদের রাষ্ট্রীয় মূল্যায়নের প্রশংসা করেন এবং এর পরিধি আরও বাড়ানোর প্রস্তাব করেন। একই সঙ্গে তিনি দেশের খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি সাধারণ সব বীর মুক্তিযোদ্ধার ভাতাও যৌক্তিকভাবে বৃদ্ধির অনুরোধ জানান। বিগত সাড়ে ১৭ বছরে যারা গুম, খুন ও রাজনৈতিক জুলুমের শিকার হয়েছেন, তাদের সবার প্রতি ইনসাফ নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়ে তিনি ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবরের পল্টন ট্র্যাজেডির কথা স্মরণ করেন।

তিনি বলেন, সেদিন পল্টনে বিরোধী দলের ৩৪ জন মানুষ নিহত হয়েছিল, যার মধ্যে ১৪ জন জামায়াতে ইসলামীর এবং ২০ জন বিএনপির কর্মী ছিলেন। শরিফ উসমান হাদিসহ সব বীর শহীদ ও ভিকটিমদের শুধু সামাজিক নয়, বিচারিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে। নতুন সরকার গঠনের চার মাস পেরিয়ে গেলেও বিচার প্রক্রিয়ার গতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে তিনি দেশবাসীকে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখানোর আহ্বান জানান।

নিজ নির্বাচনি এলাকা ঢাকা-১৫ (মিরপুর-কাফরুল) আসনের চরম দুর্ভোগের চিত্র তুলে ধরে সংসদ সদস্য ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এর আগের অধিবেশনে পানি সংকটের কথা বলার পর প্রধানমন্ত্রী নিজে এর দায়িত্ব নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু বর্তমানে মিরপুরের মানুষ কারবালার মতো এক ফোঁটা পানির জন্য প্রতিদিন রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করছে। আর অন্যদিকে, কিছু অসাধু রাজনৈতিক চক্র রাতের বেলা পানির মেইন পাইপ কেটে অবৈধ সংযোগের বাণিজ্য চালাচ্ছে। দায়িত্ব যেহেতু প্রধানমন্ত্রী নিজের কাঁধে নিয়েছেন, তাই এলাকার এই সংকটের ভালো-মন্দ এবং সুনাম-বদনাম এখন সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর ওপরই বর্তাবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তবে দেশের সব সংসদ সদস্যকে সমহারে উন্নয়ন বরাদ্দ দেওয়ায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রীকে বিশেষ ধন্যবাদ জানান তিনি।

Advertisement

আঞ্চলিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে ধীরগতির সমালোচনা করতে গিয়ে সিলেট ও মৌলভীবাজারের আঞ্চলিক রসবোধের ছোঁয়ায় ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ঢাকা-সিলেট চার লেন মহাসড়কের কাজের যে গতি, তাতে মনে হয় এটি আগ্রার তাজমহলের মতো কিছু একটা হবে। কচ্ছপ বা গুই সাপের গতিতে চলা এই মহাসড়কের ঢেউ খেলানো রাস্তার কারণে মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। যোগাযোগ মন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে তিনি দ্রুত এই কাজ শেষ করার তাগিদ দেন। এছাড়া দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যশোর, খুলনা ও সাতক্ষীরার দীর্ঘমেয়াদি জলাবদ্ধতা দূরীকরণ এবং দেশের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন জেলা ভোলার ভাগ্য পরিবর্তনে ‘ভোলা সেতু’ বাস্তবায়নের জোর দাবি জানান। তিনি রসাত্মক সুরে বলেন, ভোলা তার শ্বশুরবাড়ি নয়, তবে এটি দেশের গ্যাস ও প্রাকৃতিক সম্পদের এক নিয়ামতের খনি। এই সেতু হলে তা গোটা দেশের অর্থনৈতিক চিত্র বদলে দেবে।

তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে শক্তিশালী বন্ধুরাষ্ট্র চীনের সঙ্গে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ায় প্রধানমন্ত্রী ও পানিসম্পদ মন্ত্রীকে অভিনন্দন জানান বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি বলেন, দেশের মানুষ নামের কাঙ্গাল নয়, কাজের কাঙ্গাল। রাজনীতিকদের নিজের নামের পেছনে না ছুটে কাজের পেছনে ছোটা উচিত। অতীতের সব গ্লানি, অনৈক্য ও বৈষম্য মুছে দেশের যুবসমাজের আকাঙ্ক্ষার এক নতুন, সমৃদ্ধ ও বীরের বাংলাদেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানান ডা. শফিকুর রহমান।

এমওএস/এসএনআর