দেশে ফল প্রক্রিয়াজাতকরণে স্টোরেজ, প্রযুক্তি ও বছরব্যাপী উৎপাদনে জোর দিতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন বছরব্যাপী ফল উৎপাদন প্রকল্পের সাবেক প্রকল্প পরিচালক ও ফল বিশেষজ্ঞ ড. মো. মেহেদী মাসুদ। তিনি বলেন, দেশে বছরে প্রায় ১ কোটি ৫২ লাখ মেট্রিক টন ফল উৎপাদন হলেও এর ৬৫ শতাংশ মাত্র চার মাসে উৎপাদন হয়। ফলে বছরের বাকি সময় ফলের সংকট তৈরি হয়। মৌসুমি উৎপাদন ব্যবস্থার কারণে ফল সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানিতে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে।
Advertisement
গত শনিবার (২৭ জুন) সকালে রাজধানীর বাড্ডায় জাগো নিউজ কার্যালয়ে ‘ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ: সমস্যা ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় তিনি এ কথা বলেন।
জাগো নিউজের সম্পাদক কে. এম. জিয়াউল হকের সঞ্চালনায় গোলটেবিল বৈঠকে ড. মেহেদী মাসুদ বলেন, একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বছরে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার ফল নষ্ট হয়। কিন্তু বাস্তবে এ ক্ষতির পরিমাণ আরও অনেক বেশি। যদি প্রতি কেজি ফলের গড় মূল্য ৫০ টাকা ধরা হয় ও প্রায় ৫০ লাখ মেট্রিক টন ফল নষ্ট হয়, তাহলে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় কমপক্ষে ২৫ হাজার কোটি টাকা। প্রতি কেজি ফলের গড় মূল্য ১০০ টাকা হিসাবে ধরলে এই ক্ষতি প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছায়।’
আরও পড়ুন জুমের জমিতে ফলের নীরব বিপ্লবনতুন করে আরও ফলের বাগান করার চেয়ে প্রতিবছর যে বিপুল পরিমাণ ফল নষ্ট হচ্ছে, সেগুলো সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত করার উদ্যোগ নিলেই দেশের অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি। ‘এজন্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) ফল প্রক্রিয়াজাত শিল্পে এগিয়ে আসতে হবে এবং সরকারকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে হবে,’ বলেন ড. মেহেদী।
Advertisement
গোলটেবিল বৈঠকে আলোচকরাগত এক যুগ ধরে বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ করতে গিয়ে দেখা গেছে, প্রযুক্তি ও সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অফ সিজনেও অনেক ফল উৎপাদন সম্ভব। উদাহরণ হিসেবে তিনি কাটিমন আমের কথা উল্লেখ করে বলেন, বর্তমানে সারা বছর এই আম উৎপাদন হচ্ছে। মৌসুমে যে আমের দাম ১০০ টাকা কেজি, অফ সিজনে সেটিই ৫০০ টাকায় বিক্রি হয়। ফলে কৃষকের আয়ও কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
লিচুর উৎপাদনকাল বাড়ানোর উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন তিনি। বলেন, লিচুর মৌসুম শেষ হওয়ার পর রামবুটান ও লংগানের মতো একই গোত্রের ফল দেশে চাষ শুরু হয়েছে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এসব ফলের বাণিজ্যিক উৎপাদন হচ্ছে, যা লিচুজাতীয় ফলের সরবরাহ কয়েক মাস পর্যন্ত বাড়িয়েছে।
প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার ফল নষ্টফল সংরক্ষণে পর্যাপ্ত কোল্ড স্টোরেজ না থাকাকে অন্যতম বড় সংকট হিসেবে উল্লেখ করেন ড. মেহেদী মাসুদ। তিনি বলেন, বিভিন্ন প্রতিবেদনে বছরে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার ফল নষ্ট হওয়ার কথা বলা হলেও প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ আরও অনেক বেশি। তার মতে, ফলের গড় মূল্য বিবেচনায় প্রতি বছর অন্তত ২৫ হাজার কোটি টাকা থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকার ফল নষ্ট হয়।
আরও পড়ুন পাহাড়ের ঢালে আনারসের রাজত্বতিনি বলেন, নতুন করে আরও ফলের বাগান করার চেয়ে নষ্ট হওয়া ফল প্রক্রিয়াজাত করতে পারলে দেশের অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব। এজন্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) ফল প্রক্রিয়াজাত শিল্পে বিনিয়োগের সুযোগ বাড়াতে হবে।
Advertisement
ড. মেহেদী মাসুদ বলেন, দেশের উদ্যোক্তাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কোল্ড স্টোরেজের অভাব। অনেক উদ্যোক্তা ফল রপ্তানির আগে পর্যাপ্ত সংরক্ষণ সুবিধা পান না। সরকারিভাবে আধুনিক স্টোরেজ সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে উদ্যোক্তারা আরও বেশি ফল সংরক্ষণ ও রপ্তানি করতে পারবেন।
বছরব্যাপী কাঁঠাল উৎপাদনের আহ্বানড. মেহেদী মাসুদ বলেন, বাংলাদেশে বছরব্যাপী উৎপাদনের সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা রয়েছে কাঁঠালে। ভিয়েতনামের বারোমাসি জাতের কাঁঠাল দেশে সম্প্রসারণ করা গেলে সারা বছর কাঁঠাল রপ্তানি সম্ভব হবে। এতে দেশের কৃষি অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
তিনি আরও জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচা কাঠালেরও ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। নিউইয়র্কের সুপারমার্কেটে বাংলাদেশি টাকায় প্রায় দেড় হাজার টাকা কেজি দরে কাঁচা কাঁঠাল বিক্রি হতে দেখা গেছে।বৈঠকে আরও আলোচনা করেন ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজের সাবেক উপাচার্য, গবেষক ও কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের পোস্ট হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. গোলাম ফেরদৌস চৌধুরী, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ আরিফুর রহমান, বিএসটিআইয়ের উপপরিচালক (খাদ্য ও কৃষি) এনামুল হক, প্রাণ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ইলিয়াছ মৃধা, হাসেম ফুডস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবুল হাসেম, বাংলাদেশ অ্যাগ্রো-প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. ইকতাদুল হক, ক্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন, কাজু অ্যান্ড কফি অ্যাগ্রোর নির্বাহী পরিচালক মো. মাহাতাব আলী, চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষি উদ্যোক্তা ইসমাইল খান শামীম ও নওগাঁর কৃষি উদ্যোক্তা সোহেল রানা। ইএইচটি/এএসএ/ এমএফএ