গর্ভধারণের সময় শরীরে নানা ধরনের হরমোনগত পরিবর্তন ঘটে। এর পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনের কারণেও অনেক নারীর মাড়ি ফুলে যাওয়া, মাড়ি থেকে রক্ত পড়া কিংবা দাঁতে ক্ষয় ধরার মতো সমস্যা দেখা দেয়। তাই এই সময়ে দাঁতের যত্ন অবহেলা করা উচিত নয়।
Advertisement
অনেকের ধারণা, গর্ভাবস্থায় দাঁতের চিকিৎসা বা প্রয়োজনীয় ওষুধ গ্রহণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বাস্তবে বিষয়টি এমন নয়। বরং দাঁতের সংক্রমণ বা তীব্র সমস্যা দীর্ঘদিন অবহেলা করলে তা মা ও গর্ভের শিশুর জন্য ঝুঁকির কারণ হতে পারে। তবে চিকিৎসা অবশ্যই গর্ভাবস্থার সময় অনুযায়ী পরিকল্পনা করে করতে হয়।
আরও পড়ুন পিরিয়ডে পেট ফাঁপা? জেনে নিন সহজ সমাধান গর্ভাবস্থার কোন সময়ে কী ধরনের চিকিৎসা করা যায়? প্রথম তিন মাস (প্রথম ট্রাইমেস্টার): গর্ভধারণের প্রথম তিন মাসে শিশুর গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ গঠিত হতে থাকে। তাই এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল সময়। এ সময়ে তীব্র ব্যথা বা গুরুতর সংক্রমণ না থাকলে দাঁতের চিকিৎসা ও অপ্রয়োজনীয় ওষুধ গ্রহণ এড়িয়ে চলাই ভালো। দ্বিতীয় তিন মাস (দ্বিতীয় ট্রাইমেস্টার): চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ মাস পর্যন্ত সময়কে দাঁতের চিকিৎসার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ ধরা হয়। এ সময়ে প্রয়োজন অনুযায়ী দাঁতে ফিলিং করা, রুট ক্যানেল চিকিৎসা, স্কেলিং, বিশেষ প্রয়োজন হলে দাঁত তুলে ফেলা- এসব চিকিৎসা নিরাপদভাবে করা যায়। শেষ তিন মাস (তৃতীয় ট্রাইমেস্টার): গর্ভাবস্থার শেষ দিকে দীর্ঘ সময় ডেন্টাল চেয়ারে চিৎ হয়ে শুয়ে থাকা অনেকের জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে। এতে রক্তচাপ কমে যাওয়ার আশঙ্কাও থাকে। তাই এই সময়ে সাধারণত জরুরি ব্যথা বা সংক্রমণের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং সম্ভব হলে বাকি চিকিৎসা সন্তান জন্মের পর করা হয়। আরও পড়ুন নাক ডাকার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি চান? জানুন সমাধান চিকিৎসার সময় যেসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ডেন্টাল এক্স-রে: সংক্রমণের মাত্রা নির্ণয়ের জন্য এক্স-রে প্রয়োজন হলে তা করা যেতে পারে। তবে অবশ্যই গর্ভবতীর পেট ও থাইরয়েড সুরক্ষার জন্য লিড অ্যাপ্রোন বা বিশেষ সুরক্ষা কভার ব্যবহার করতে হবে। রুট ক্যানেল ও ফিলিং: দাঁতের গভীর সংক্রমণ দূর করতে রুট ক্যানেল চিকিৎসা করা নিরাপদ। পাশাপাশি মার্কারিমুক্ত কম্পোজিট ফিলিংও ব্যবহার করা যায়। স্কেলিং ও মাড়ির চিকিৎসা: গর্ভাবস্থায় অনেকের মাড়িতে প্রদাহ বা ‘প্রেগন্যান্সি জিঞ্জিভাইটিস’ দেখা দেয়। এ সমস্যা নিয়ন্ত্রণে স্কেলিং কার্যকর ও প্রয়োজনীয় একটি চিকিৎসা। লোকাল অ্যানেসথেসিয়া: দাঁত অবশ করার জন্য ব্যবহৃত কিছু নির্দিষ্ট লোকাল অ্যানেসথেটিক ইনজেকশন গর্ভাবস্থায় নিরাপদ হিসেবে স্বীকৃত। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শে এগুলো ব্যবহার করা যায়। আরও পড়ুন এই ভিটামিনের অভাবে বাড়তে পারে নাকের রক্তপাত ওষুধ ব্যবহারে বাড়তি সতর্কতাব্যথা কমানোর জন্য প্যারাসিটামল তুলনামূলক নিরাপদ। আইবুপ্রোফেন, অ্যাসপিরিন ও ডাইক্লোফেনাক-জাতীয় ব্যথানাশক ওষুধ এড়িয়ে চলতে হবে। এগুলো গর্ভের শিশুর হৃদ্যন্ত্র ও রক্তসঞ্চালনে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে এবং মায়েরও জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
দাঁতের সংক্রমণে প্রয়োজন হলে পেনিসিলিন, অ্যামোক্সিসিলিন অথবা ক্লিনডামাইসিন চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবহার করা যেতে পারে। টেট্রাসাইক্লিন-জাতীয় অ্যান্টিবায়োটিক গর্ভাবস্থায় গ্রহণ করা উচিত নয়। এটি শিশুর হাড়ের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত করতে পারে এবং ভবিষ্যতে শিশুর দাঁতের রং স্থায়ীভাবে হলুদ বা কালচে হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।
Advertisement
গর্ভাবস্থায় বমির পর মুখে তৈরি হওয়া অ্যাসিড দাঁতের এনামেল ক্ষয় করতে পারে। তাই বমির পরপরই পরিষ্কার পানি দিয়ে ভালোভাবে কুলকুচি করুন। এ সময় মিষ্টি ও শর্করাযুক্ত খাবার খাওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে, যা দাঁতে ক্যাভিটির ঝুঁকি বাড়ায়। প্রতিবার খাবার খাওয়ার পর সম্ভব হলে দাঁত ব্রাশ করুন। তা সম্ভব না হলে অন্তত ভালোভাবে কুলকুচি করার অভ্যাস গড়ে তুলুন।
মনে রাখবেনগর্ভাবস্থায় দাঁতের যেকোনো সমস্যা অবহেলা না করে দ্রুত দন্তচিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। সঠিক সময়ে নিরাপদ চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সতর্কতা মেনে চললে মা ও গর্ভের শিশুর সুস্থতা নিশ্চিত করা অনেকটাই সহজ হয়।
তথ্যসূত্র: আমেরিকান ডেন্টাল অ্যাসোসিয়েশন (এডিএ), ব্রিটিশ ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস)
জেএস/
Advertisement