দেশের ব্যান্ডসংগীতের ইতিহাসে কালজয়ী গানের তালিকা করলে ডিফরেন্ট টাচের ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’র নাম প্রথম দিকেই থাকবে। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বৃষ্টিভেজা দিন, সাংস্কৃতিক আয়োজন কিংবা ঘরোয়া আড্ডায় সমান জনপ্রিয় এই গান। প্রজন্ম বদলেছে, কিন্তু গানটির আবেদন এতটুকুও কমেনি।
Advertisement
সম্প্রতি গানটি আবারও আলোচনায় এসেছে। দেশের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিউটি রাণী পালের একটি রিল ভিডিওকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সাইবার বুলিংয়ের ঘটনা ঘটে। এর প্রতিবাদে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষক সংহতি প্রকাশ করেন। পাশাপাশি শোবিজ অঙ্গনের অনেক তারকাও বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন। সেই সূত্রেই নতুন করে আলোচনায় উঠে আসে ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’।
সহজ-সরল কথা আর হৃদয়ছোঁয়া সুরের কারণে গানটি প্রকাশের পর থেকেই শ্রোতাদের ভালোবাসা অর্জন করে। সময়ের সঙ্গে এটি শুধু একটি জনপ্রিয় গানই নয়, ডিফরেন্ট টাচের পরিচয়েরও অংশ হয়ে ওঠে। এখনো দেশের বিভিন্ন উঠতি ব্যান্ড ও শিল্পীরা নিয়মিত গানটি পরিবেশন করেন। তবে অনেকেই জানেন না, এই জনপ্রিয় গানের জন্ম হয়েছিল এক বৃষ্টিভেজা শ্রাবণের রাতে।
গীতিকার ও সুরকার আশরাফ বাবু এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, ১৯৮৭ সালে ডিফরেন্ট টাচের নতুন অ্যালবামের কাজ প্রায় শেষ। সে সময় একটি পূর্ণাঙ্গ অ্যালবামে ১২টি গান থাকত। সব গান প্রস্তুত হলেও একটি গান তখনও বাকি ছিল। পরদিন রেকর্ডিংয়ের জন্য ঢাকায় যাওয়ার কথা, অথচ শেষ গানটি কিছুতেই লেখা হচ্ছিল না।
Advertisement
সেই সময় ছিল শ্রাবণ মাস। টানা কয়েক দিন ধরে বৃষ্টি হচ্ছিল। চার দিন ধরে একনাগাড়ে বৃষ্টির কারণে ঘরের বাইরে বের হওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছিল। গভীর রাতে জানালার পাশে বসে বৃষ্টির ধারা দেখতে দেখতে হঠাৎ আশরাফ বাবুর মনে হলো, শ্রাবণের বৃষ্টি নিয়েই একটি গান লেখা যাক।
এরপর একে একে কাগজে ফুটে উঠতে থাকে সেই অমর পঙ্ক্তি-‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে...’। ভোর হওয়ার আগেই সম্পূর্ণ হয়ে যায় গানটি। শেষ মুহূর্তে লেখা সেই গানই পরে হয়ে ওঠে বাংলা ব্যান্ডসংগীতের অন্যতম জনপ্রিয় সৃষ্টি।
আরও পড়ুন ‘তাকেই বিয়ে করতে চেয়েছিলাম’, কার কথা বললেন শাকিব খান?পরে ডিফরেন্ট টাচের সদস্যরা ঢাকায় গিয়ে গানটির রেকর্ডিং করেন। অ্যালবামটি প্রকাশ করে ইলেকট্রা ভয়েস। গানটিতে প্রথম কণ্ঠ দেন আলী আহমেদ বাবু। প্রকাশের পরপরই শ্রোতাদের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’।
গানটিকে ঘিরে রয়েছে আরও একটি মজার ঘটনা। ডিফরেন্ট টাচের কণ্ঠশিল্পী মেজবাহ এক সাক্ষাৎকারে জানান, ১৯৯১ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চে একটি কনসার্টে ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’ পরিবেশন শুরু করার কিছুক্ষণ পরই হঠাৎ বৃষ্টি নেমে আসে। খোলা মঞ্চ হওয়ায় সেদিন অনুষ্ঠান বন্ধ করে দিতে হয়।
Advertisement
অদ্ভুত বিষয় হলো, পরের বছর একই স্থানে আবার কনসার্টে এই গান শুরু হতেই ফের বৃষ্টি নামে। ঘটনাটি তখন উপস্থিত দর্শক ও ব্যান্ড সদস্যদের বিস্মিত করেছিল। পরে এটি ডিফরেন্ট টাচের স্মরণীয় অভিজ্ঞতার একটি হয়ে ওঠে।
চার দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও ‘শ্রাবণের মেঘগুলো’ আজও বৃষ্টিভেজা অনুভূতি, নস্টালজিয়া আর বাংলা ব্যান্ডসংগীতের ঐতিহ্যের এক অনন্য প্রতীক। সময়ের সঙ্গে নতুন করে আলোচনায় এলেও গানটির আবেদন যেন কখনোই ফুরায় না।
এমএমএফ