মুস্তাফা মনোয়ার স্যার, আপনাকে বিদায় বলব না। আপনি দৈহিকভাবে অনুপস্থিত হয়ে গেলেও আপনার কর্মে, খ্যাতিতে ও সৃজনের রেখাগুলোয় আমাদের বাতিঘর হয়েই থাকবেন। গতকাল ২৯ জুন, সোমবার সকালে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৯০ বছর বয়সে আপনার জীবনপ্রদীপ নিভে গেল বটে, কিন্তু আপনি বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব হিসেবেই আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন। বিশেষ করে ‘বাংলাদেশের পাপেটম্যান’ হিসেবে খ্যাত আপনি দীর্ঘদিন নিউমোনিয়া ও প্রোস্টেট ক্যানসারের সঙ্গে যুদ্ধ করেও কর্মের মধ্য দিয়ে বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন—আপনি সচল। এই যে মনের শক্তি, তা অল্প কথার এই শোকগাথায় বর্ণনা করা দুরূহ, খুবই দুরূহ। শুধু এটুকুই বলব, চেতনা ও মূল্যবোধের সড়কটি আমাদের জন্য প্রশস্ত করতে আপনি ছিলেন অবিরাম সৃজনী শক্তির এক বটবৃক্ষ, নতুন কিছু সৃষ্টির এক অসাধারণ ক্ষমতাধর মানুষ।
Advertisement
স্যার, আপনার শূন্যতা পূরণ হবে না; বরং বলা চলে, সেই শূন্যতার পরিসর ক্রমাগত আমাদের সামনে বিস্তৃত হবে। আপনার একটি কথা খুব মনে পড়ছে। আপনি বলেছিলেন, ‘শিল্পকলা কখনো পুরোনো হয় না।’ আপনার এই কথার সঙ্গে স্মরণে আসে রবীন্দ্রনাথও। কবিগুরু বলে গেছেন, ‘চিরপুরাতন নতুন শিশু।’ রবীন্দ্রনাথের কথাটির মতোই মনে হয় আপনার কথাটিও। সব শিল্পকলাই আপনার কাছে নতুন হিসেবে সমাদৃত হয়েছে। সত্যিই তো, কবিতা, গান কিংবা চিত্রকলা যত আগেই নির্মিত হোক না কেন, তা সব সময় নতুনই থাকে।
ফের স্মরণ করি আপনার আরেকটি বক্তব্য। কণ্ঠশীলন আয়োজিত আপনার ৮০তম জন্মবার্ষিকী উদ্যাপন অনুষ্ঠানে রাজধানীর ধানমণ্ডির ছায়ানট সংস্কৃতি ভবনের রমেশচন্দ্র দত্ত স্মৃতি মিলনায়তনে আপনি বলেছিলেন। ছায়ানট ও কণ্ঠশীলনের সভাপতি সন্জীদা খাতুনের পাশে বসে আপনি বলছিলেন, ‘পাকিস্তানি আমলে বাংলা সংস্কৃতির যা কিছু শ্রেষ্ঠ, তার সবকিছুকেই বিধর্মী সংস্কৃতি বলা হতো। সপ্তাহে একদিন রবীন্দ্রনাথের গান প্রচার করা যেত। তাঁর লেখা কোনো নাটক করা যেত না। তো একবার সিদ্ধান্ত হলো, ভারত ফারাক্কা বাঁধ দিচ্ছে। সেটার বিরুদ্ধে বেশি করে প্রচার করতে হবে। এই সুযোগে রবীন্দ্রনাথের “মুক্তধারা” নাটকটি মঞ্চস্থ করলাম। তখন খুব শোরগোল উঠল, কেন এটা হলো? আমি বললাম, “মুক্তধারা তো বাঁধ দেওয়ার বিরুদ্ধে বলে।” তখন পাকিস্তানিরা বলল, “বহুত আচ্ছা কিয়া।” এরপর “ডাকঘর” নাটকটিও করলাম।’
স্যার, আপনার এই কৌশলী কর্মধারা একদিকে যেমন রবীন্দ্রবর্জনের বিরুদ্ধে অভিনব প্রতিবাদ, অন্যদিকে বিরুদ্ধবাদীদের প্রতি এক শক্ত চপেটাঘাত। মনের বয়সটাই যে আসল, তা আপনি বহুবিধ কর্মের মধ্য দিয়ে দেখিয়ে গেছেন। আপনারই ভাষায়, ‘বয়স হলো একটা অঙ্কের ব্যাপার, আরেকটা মনের তৃপ্তির ব্যাপার। পৃথিবীকে দেখার ব্যাপার, পৃথিবীকে ভালোবাসার ব্যাপার। সেইখানে বয়স বাড়ে না।’ এই অমিয় বাণী আমাদের সামনে চেতনার উজ্জীবনের অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। এ কারণেই আপনি চিরকাল অনুসরণীয় হয়ে থাকবেন।
Advertisement
আপনি আমাদের একজন গুণী চিত্রশিল্পী। চিত্রশিল্পে আপনার পদচারণা, বাংলাদেশে নতুন শিল্পাঙ্গন হিসেবে পাপেটের বিকাশ, টেলিভিশন নাটকে অতুলনীয় কৃতিত্ব, শিল্পকলার উদার ও মহৎ শিক্ষক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা, দ্বিতীয় সাফ গেমসের ‘মিশুক’ নির্মাণ এবং ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পেছনের লাল সূর্যের প্রতিরূপ স্থাপনাসহ শিল্পের নানা পরিকল্পনায় আপনি বরাবরই আপনার সৃজনী ও উদ্ভাবনী প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। এ কারণেই আপনি অতীত হবেন না; বর্তমান হয়েই থাকবেন।
ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার মনোহরপুর গ্রামে ১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর জন্ম। বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে আপনার কর্মপরিসর। জানা যায়, ভর্তি হয়েছিলেন কলকাতার শিশু বিদ্যাপীঠে। পরবর্তীতে নারায়ণগঞ্জ গভর্নমেন্ট স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করে কলকাতায় স্কটিশ চার্চ কলেজে ভর্তি হন। পরে সেখানে পড়াশোনা না করে কলকাতা চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৫৯ সালে সেখান থেকে ফাইন আর্টসে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।
কর্মজীবন শুরু করেন পূর্ব পাকিস্তান চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ের প্রভাষক হিসেবে। এরপর বাংলাদেশ টেলিভিশনের উপমহাপরিচালক, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক, জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক, বাংলাদেশ টেলিভিশন ঢাকার জেনারেল ম্যানেজার এবং এফডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। প্রতিটি পর্যায়ে তিনি আলো ছড়িয়েছেন। একইভাবে জনবিভাগ উন্নয়ন কেন্দ্রের চেয়ারম্যান এবং এডুকেশনাল পাপেট ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের প্রকল্প পরিচালক হিসেবেও তিনি স্বাক্ষর রেখেছেন। প্রতিটি কর্মক্ষেত্র তিনি আলোকিত করেছেন ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে, নতুন রঙ ছড়িয়ে। এভাবেই তাঁর খ্যাতির পরিসর ক্রমাগত বিস্তৃত হয়েছে।
আপনার অনবদ্য সৃষ্টি পাপেট চরিত্র ‘পারুল’ দেখে ইউনিসেফের রাচেল কার্নেগি অনুপ্রাণিত হন এবং তৈরি হয় ‘মীনা’ চরিত্রটি। টেলিভিশনের ‘আজব দেশে’ অনুষ্ঠানে নিয়মিত প্রদর্শিত হতো আপনার সৃষ্টি পাপেট চরিত্র ‘বাঘা’ ও ‘মেনি’। স্যার, এসবই আমাদের গৌরবের উজ্জ্বল অধ্যায়। চিত্রকলা দিয়ে শুরু করে আপনি শেষ পর্যন্ত কত অধ্যায়ের নায়ক, মহানায়ক হয়ে উঠেছিলেন, তা আমাদের ভাবনা ও কর্মের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে থাকবে।
Advertisement
ইতিহাস সাক্ষী, ১৯৭১ সালের মার্চে অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে টেলিভিশনে ফজল-এ-খোদা রচিত ও আজাদ রহমানের সুরারোপিত ‘সংগ্রাম সংগ্রাম সংগ্রাম, চলবে দিনরাত অবিরাম’ গণসংগীতের পরিচালনায় ছিলেন আপনি। গানটি দশজন শিল্পী গেয়েছিলেন, কিন্তু প্রচারের সময় দর্শকদের মনে হয়েছিল যেন কয়েকশ শিল্পী একসঙ্গে গানটি গাইছেন। এটি সম্ভব হয়েছিল আপনার অসাধারণ নির্দেশনার কারণে। কোনো গানকে অনন্য শৈল্পিক রূপ দেওয়ার এটি এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ইতিহাস এও সাক্ষ্য দেয়, গানটির প্রচারের অভিনবত্ব স্বাধীনতাকামী বাঙালি দর্শকদের মনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। ১৯৭২ সালে বিটিভি থেকে প্রচারিত শিশুদের প্রতিভা বিকাশের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘নতুন কুঁড়ি’র রূপকারও ছিলেন আপনিই।
আমাদের পাপেট শোর অন্যতম কারিগর আপনি। পাপেট নিয়ে বহু দেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতাও ছিল আপনার। একুশে পদকসহ দেশ-বিদেশের বহু পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেও আপনি নিজেকে ভারাক্রান্ত করে তোলেননি। এখানেই আপনার মহত্ত্বের প্রকৃত পরিচয়। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে আপনি পরাধীন দেশে যেমন জাগরণ সৃষ্টি করেছেন, তেমনি স্বাধীন বাংলাদেশেও সেই জাগরণের ধারা অব্যাহত রেখেছেন। আপনি আমাদের অন্যতম সব্যসাচী শিল্পী—চিত্রশিল্পী, নাট্যনির্দেশক, শিল্পগবেষক এবং বাংলাদেশে পাপেটচর্চার অন্যতম প্রাণপুরুষ।
আপনার অনবদ্য সৃষ্টি পাপেট চরিত্র ‘পারুল’ দেখে ইউনিসেফের রাচেল কার্নেগি অনুপ্রাণিত হন এবং তৈরি হয় ‘মীনা’ চরিত্রটি। টেলিভিশনের ‘আজব দেশে’ অনুষ্ঠানে নিয়মিত প্রদর্শিত হতো আপনার সৃষ্টি পাপেট চরিত্র ‘বাঘা’ ও ‘মেনি’। স্যার, এসবই আমাদের গৌরবের উজ্জ্বল অধ্যায়। চিত্রকলা দিয়ে শুরু করে আপনি শেষ পর্যন্ত কত অধ্যায়ের নায়ক, মহানায়ক হয়ে উঠেছিলেন, তা আমাদের ভাবনা ও কর্মের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে থাকবে।
স্যার, বিনম্র শ্রদ্ধা। বাতিঘর কখনো নিভে না।
লেখক : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, কবি ও বিশ্লেষক।
এইচআর/জেআইএম