আন্তর্জাতিক

দামে ১৩ বছরের সবচেয়ে বড় পতন, সোনা কেনার এখনই কি সেরা সময়?

আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দামে বড় ধরনের ধস নেমেছে। ২০১৩ সালের এপ্রিলের পর এবারই প্রথম এক প্রান্তিকে (তিন মাস) সবচেয়ে বড় পতনের মুখে পড়েছে মূল্যবান এই ধাতু। মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা কমতে শুরু করায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার বৃদ্ধির পূর্বাভাস সোনার বাজারে মন্দাভাব এনেছে।

Advertisement

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের তথ্যমতে, মঙ্গলবার (৩০ জুন) স্পট মার্কেটে সোনার দাম ০ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে। এতে প্রতি আউন্স সোনা ৪ হাজার ২৬ দশমিক ১৭ ডলারে বেচাকেনা হচ্ছে। তবে চলতি জুন মাসেই সোনার দাম প্রায় ১১ দশমিক ২ শতাংশ কমেছে। এটি হতে যাচ্ছে টানা চতুর্থ মাসের মতো সোনার দামের পতন।

আরও পড়ুন ১৩ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় পতনের মুখে সোনার দাম

অন্যদিকে, আগামী আগস্টে সরবরাহের চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সোনার ফিউচার বাজার ৪ হাজার ৪০ দশমিক ৬০ ডলারে স্থিতিশীল রয়েছে। ২০২৪ সালের পর এই প্রথম সোনা এক প্রান্তিকে এত বড় পতনের মুখোমুখি হলো।

সোনার দাম কেন কমছে?

রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্পট মার্কেটে সোনার দাম মঙ্গলবার এক শতাংশের বেশি কমেছে। জুন মাস শেষে এই ধাতুর দাম প্রায় ১৩ শতাংশ কমতে পারে। বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে সোনা বাদে অন্য খাতে ঝুঁকছেন। তারা এখন যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার বৃদ্ধির সম্ভাবনার দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন।

Advertisement

বাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান মারেক্সের বিশ্লেষক এডওয়ার্ড মেইর রয়টার্সকে বলেন, বর্তমানে বাজারে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সুদের হার বৃদ্ধির সম্ভাবনা এবং শক্তিশালী ডলারের আধিপত্য রয়েছে। সাধারণত যেসব কারণে সোনার দাম বাড়ে, এই তিনটি বিষয় এখন সেইসব ইতিবাচক প্রভাবকে ঢেকে দিয়েছে।

আরও পড়ুন এখন সোনা কিনে রাখলে কি ভুল হবে?

সাধারণত অনিশ্চয়তা এবং মূল্যস্ফীতির সময়ে সোনার বাজার ভালো থাকে। তবে সুদের হার বাড়লে সোনা তার আকর্ষণ কিছুটা হারায়। কারণ বন্ড বা স্থায়ী আমানতের মতো সোনা থেকে কোনো নিয়মিত আয় আসে না। সিএমই ফেডওয়াচ টুলের তথ্য অনুযায়ী, ব্যবসায়ীরা ধারণা করছেন মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ এ বছর আরও তিনবার সুদের হার বাড়াতে পারে। আগামী সেপ্টেম্বরেই সুদের হার বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে প্রায় ৬৪ শতাংশ।

বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?

অগমন্টের গবেষণা প্রধান ড. রেনিশা চেইনানি বলেন, টানা চার সপ্তাহ ধরে সোনার দাম কমছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারির রেকর্ড দাম থেকে এটি প্রায় ৩০ শতাংশ নিচে নেমে এসেছে। বিনিয়োগকারীরা এখনো যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নীতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং শক্তিশালী ডলারের সাথে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।

তিনি উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের কারণে নিরাপদ সম্পদ হিসেবে সোনার চাহিদা সাময়িকভাবে বেড়েছিল। তবে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ায় সেই তেজ বেশিদিন টেকেনি। বাজার আবার মূল্যস্ফীতি এবং সুদের হার বৃদ্ধির আশঙ্কায় ফিরে গেছে।

Advertisement

আরও পড়ুন বিশ্ববাজারে ফের পতন, আরও কমবে সোনার দাম?

ড. চেইনানির মতে, বাজার এখন চলতি সপ্তাহের যুক্তরাষ্ট্রের নন-ফার্ম পেরোল প্রতিবেদন এবং আইএসএম ম্যানুফ্যাকচারিং পিএমআই তথ্যের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। এটি ফেডের পরবর্তী নীতি নির্ধারণ করতে পারে।

সোনা কেনার এখনই কি সেরা সময়?

দাম এত বড় পতনের পর অনেক বিনিয়োগকারী ভাবছেন সোনা কেনার এখনই সঠিক সময় কি না। ড. চেইনানি মনে করেন, এর উত্তর অনেকটাই নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্রের আগামী অর্থনৈতিক তথ্যের ওপর।

তার মতে, শ্রমবাজারের তথ্য দুর্বল হলে বা মূল্যস্ফীতি কমলে সোনার দাম ৪ হাজার ১০০ থেকে ৪ হাজার ১৫০ ডলারের দিকে যেতে পারে। তবে কর্মসংস্থানের প্রতিবেদন শক্তিশালী হলে দাম আবার চার হাজার ডলারের গুরুত্বপূর্ণ সাপোর্ট লেভেলে নেমে যেতে পারে। কমেক্স গোল্ডের বর্তমান শক্তিশালী সাপোর্ট ৩ হাজার ৯৫০ থেকে চার হাজার ডলারের মধ্যে। এটি ভেঙে গেলে দাম আরও কমে ৩ হাজার ৬০০ ডলারে নামতে পারে। আর দাম বাড়লে ৪ হাজার ২৫০ ডলারে পৌঁছাতে পারে।

বিনিয়োগকারীদের এখন কী করা উচিত?

রেকর্ড দাম থেকে সোনার বড় পতন একে আগের চেয়ে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বিনিয়োগকারীদের একবারে সব টাকা খাটাতে নিষেধ করেছেন।

আরও পড়ুন সোনাসহ বিরল ধাতুর বিশাল খনি পেয়েছে নাইজেরিয়া, বদলে যাবে ভাগ্য

তাদের মতে, ধাপে ধাপে সোনা কেনাই এখন বুদ্ধিমানের কাজ হবে। গোল্ড ইটিএফ, ডিজিটাল গোল্ড বা অন্যান্য মাধ্যমে নিয়মিত বিনিয়োগের (এসআইপি) পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। এতে বাজারের ওঠানামার ঝুঁকি কমে আসবে।

সোনার মধ্যমেয়াদি ভবিষ্যৎ তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করবে। এগুলো হলো—ফেডের সুদের হার সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত, ডলারের শক্তি এবং পশ্চিম এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি। আপাতত সোনা আগের চেয়ে সস্তা হয়েছে। তবে এটিই বছরের সেরা সুযোগ কি না, তা ফেডের ভবিষ্যৎ নীতির ওপর নির্ভর করছে।

সূত্র: রয়টার্স, দ্য ইকোনমিক টাইমসকেএএ/