দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যেভাবে উন্নত হয়েছে, সেটা ডাটাসহ, ক্রাইম রিপোর্টসহ গত পরশু খাতওয়ারি বর্ণনা সংসদে দিয়েছিলাম। তার মধ্যে বিগত ১০-১৫ বছর এবং বিশেষভাবে ২০২৫-এর রেফারেন্সসহ আমি ডাটাগুলো উল্লেখ করেছিলাম। সেখানে খুন, ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতন, ডাকাতির সংখ্যা মাসভিত্তিক দিয়েছিলাম। তাতে করে ঐতিহাসিকভাবে এই বর্তমান সরকার দায়িত্বে আসার পর থেকে এই পর্যন্ত সব ডাটায় আমরা ঐতিহাসিকভাবে এগিয়ে আছি, মানে উন্নতি হয়েছে। তবে জনগণের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ছাড়া কোনো দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়ন হয় না।
Advertisement
তিনি বলেন, তবে আমরা একটু পিছিয়ে আছি, সেটা হলো ধর্ষণের কেস রেকর্ডের ক্ষেত্রে। আমরা একটু বেশি ধর্ষণের চিত্রটা পেয়েছি। তার একটা কারণ আছে। আগে ধর্ষিতারা রেকর্ড করতে যেতেন না বা থানায় যেতে পারতেন না। সামাজিক বা রাজনৈতিক বিভিন্ন হস্তক্ষেপের কারণে। এখন থানায় গেলেই অথবা অনলাইনে তারা জিডিসহ অন্যান্য কিছু দায়ের করতে পারেন, এফআইআর দাখিল করতে পারেন। এখানে কোনো ইন্টারফেয়ার নেই। যে কারণে সংখ্যাটা একটু বেড়েছে। তবে সুখের কথা হলো ধর্ষণ যেখানেই হোক, শিশু হোক, নারী হোক, যে অবস্থাতেই হোক, তাৎক্ষণিক সেটা পুলিশ ডিপার্টমেন্ট থেকে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আগামী অর্থবছরের পরিচালন ও উন্নয়ন ব্যয় ছাটাই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনাকালে তিনি এসব কথা বলেন।
আরও পড়ুন তথ্য উপদেষ্টা / রিফাইন্ড হোক বা তৃণমূল, কোনো নামেই কর্মসূচি চালাতে পারবে না আওয়ামী লীগএর আগে ছাটাই প্রস্তাবের পক্ষে কথা বলতে গিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পরিচালন ও উন্নয়ন ব্যয় চেয়েছে ৩১ হাজার ৯৮ কোটি ৮৮ লাখ ১৫ হাজার টাকা। আমি একটু বিনীতভাবে কয়েকটা পরিসংখ্যানের দিকে আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করি। মার্চ এবং এপ্রিল মাসে সারা দেশে হত্যাকাণ্ড রেকর্ড হয়েছে ৬০৫টি। অন্যান্য অপরাধের মধ্যে ২৯৪টি ছিনতাই, ৯০টি ডাকাতি, ১৯৬টি অপহরণ, ২ হাজার ২১৪টি চুরির ঘটনা, ১২৯টি পুলিশের আক্রান্ত হবার ঘটনা ঘটেছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দুই মাসে ৩ হাজার ৪৯৬টি নথিভুক্ত করা হয়েছে। সারা দেশে প্রতিদিনে গড়ে ১০টির বেশি খুনের ঘটনা ঘটছে। এই যখন আমাদের সিকিউরিটির অবস্থা, এই যখন আমাদের আইনশৃঙ্খলার অবস্থা, তখন আমরা এই মন্ত্রণালয়ের জন্য দাবি তুলছি ৩১ হাজার ৯৮ কোটি! মাননীয় স্পিকার, পাশের থেকে আমার একজন সহকর্মী বলছেন, এটা আরও বেশি হওয়া উচিত। পুরো বাজেটের সবটাই যদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে দেওয়া হয় বা এই মন্ত্রণালয়ে বরাদ্দ দেওয়া হয় তাহলে ভালো হয়। তারপরেও কতটুকু উন্নয়ন হবে এই মন্ত্রণালয়ের, আমরা জানি না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যখন বক্তব্য দেন, সারা দেশ মুগ্ধ হয়ে শোনে। মাননীয় স্পিকার, আমি একজন আইনের শিক্ষার্থী, আমিও ওনার ডিবেট মুগ্ধ হয়ে শুনি। কিন্তু ওনার এই মুগ্ধতা যদি উনি ওনার মন্ত্রণালয়ে ছড়িয়ে দিতে পারতেন তাহলে আর এটি ছাঁটাই করে এক টাকা করার প্রস্তাব আমি রাখতাম না।
Advertisement
এর আগে ছাঁটাই প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে সাতক্ষীরা-২ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আব্দুল খালেক বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়। দুইজন মন্ত্রী আমাদের সামনে বলেছেন, একটা ফুঁ দিয়ে দেন। এই ফুঁ-টা আমরা তো দিতে চাই, কিন্তু ফুঁ অর্থমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রী দিলেই বেশি বরকতপূর্ণ হবে। আমরা তো আমাদের যুক্তি উত্থাপন করছি, কিন্তু আমাদের যুক্তির পক্ষে আমরা এটাকে পাস করাতে পারছি না। আমি এই দাবি থেকে বের হয়ে যে একটা দাবি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে উত্থাপন করতে চাই যে আজকে মাদকের সয়লাব। আপনি এখানে বিল উত্থাপন করেছেন। আমি দাবি করবো যে ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে গ্রামে এবং বড় গ্রাম হলে মহল্লাভিত্তিক গ্রাম পুলিশ নিয়োগ দেওয়া আছে, এই খাতে অর্থ বৃদ্ধি করে, মাদকসহ দুর্নীতি বন্ধ করার জন্য এই গ্রাম পুলিশকে ব্যবহার করে এখানে ভূমিকা রাখা হোক।
পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ বিষয়ে বলেন, সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আব্দুল খালেক প্রস্তাব দিয়েছেন গ্রাম পুলিশ দিয়ে মাদকসহ দুর্নীতি বন্ধ করা যায় কি না, এটা দেখা। মাদকদ্রব্য ও অপব্যবহার সংক্রান্ত যে আইনটা, সংশোধনী গত কয়েকদিন আগে পার্লামেন্টে উত্থাপন করেছি, তার ওপরে স্থায়ী কমিটিতে আলাপ-আলোচনা হয়েছে। আজ সেটার ওপরে কমিটির রিপোর্ট হয়তো উত্থাপন হতে পারে যতটুকু আমরা আলোচনা করেছি। যেহেতু ৩০ তারিখের (জুন) পরে পার্লামেন্ট সেশন কয়েকদিনের জন্য বন্ধ হবে, সেজন্য মনে হয় না সেটা আজ আমরা বিবেচনাতে গ্রহণ করার জন্য উত্থাপন করতে পারব কি না। তবে জুয়া প্রতিরোধ আইনটা বিবেচনাতে গ্রহণ করার জন্য আজকে অর্ডার অব দ্য ডে-তে আপনি রেখেছেন। আশা করি সেটা আজকে আমরা বিরোধী দলের সহযোগিতায় পাস করতেও পারবো, হয়তোবা।
আরও পড়ুন সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বহাল, শিল্প-উৎপাদন চাঙা করতে বড় উদ্যোগসালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নের জন্য যেহেতু দেশের শান্তি, শৃঙ্খলা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যদি উন্নত থাকে, তাহলে উন্নয়ন, অগ্রগতি, স্থিতিশীলতা, শান্তি সবকিছুই বজায় থাকে। বেজড অন দ্যাট, সেজন্য আমাদের প্রধানমন্ত্রী এই বাজেট যখন আমরা ক্যাবিনেটে এপ্রুভাল দেই, প্রথাগতভাবে যেদিন বাজেট উপস্থাপন করা হয়, সেদিন তিনি নিজে জিজ্ঞেস করেছেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বাজেট বরাদ্দ একটু বলেন আবার কত। বৃদ্ধি হলো না কেন? আমি বলেছি, পাঁচ-সাতশ কোটি টাকা গত বছরের চেয়ে বৃদ্ধি হয়েছে, তবে যতগুলো প্রকল্প এবং যতগুলো আইন আমরা উত্থাপন করছি তার পরিপ্রেক্ষিতে অর্থবিল হিসেবে, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনটা অর্থবিল, এগুলোর জন্য যথেষ্ট ব্যয় নির্বাহ করতে হবে। সেটা এই প্রকল্পগুলো এবং আইনগুলো পাস হওয়ার পরে আমরা সেই খাতে বরাদ্দ চাইবো। অর্থমন্ত্রী হয়তো দয়া করে যেগুলো থোক বরাদ্দ রেখেছেন ওখান থেকে প্রকল্পওয়াইজ বরাদ্দ দেবেন।
তিনি বলেন, আব্দুল খালেকের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে আমি তাকে ধন্যবাদ দিতে চাই যে তিনি সেই গুরুত্বটা অনুধাবন করেছেন। গ্রাম পুলিশ থেকে শুরু করে সর্বস্তরের মানুষ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সবাই মাদকসহ দুর্নীতি এবং জুয়া ইত্যাদি সামাজিক অপরাধগুলো দমনে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন, সহযোগিতা করবেন।
Advertisement
সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার আইনজীবীদের পরিহিত গাউন পরে সংসদে আসার বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমি সংসদ সদস্য সিনিয়র অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীনের সঙ্গে একটু ডিফার করতে চাই, পার্লামেন্টের এই হাউজে বাইরের কোনো বিধি-বিধান চলে না। এটা রুলস অব প্রসিডিউর অনুসারে চলে। এটা সংবিধানে হাউজকে সেই ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে রুলস অব প্রসিডিউর প্রণয়নের জন্য। এখানে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া নাই যে কোনো পোশাক পরিহিত অবস্থায় এখানে ঢোকা যাবে না বা ঢোকা যাবে। সুতরাং, তার এভরি লিবার্টি আছে সেই ড্রেসটা বা ইয়াটা পরার জন্য। হ্যাঁ, সুপ্রিম কোর্ট জুডিশিয়ারিতে তার নিজের মতো করে রুলস প্রণয়নের অধিকার আছে, সেটা ওখানে থাকবে। বাট দিস সেপারেশন অব পাওয়ার থিওরি অনুসারে লেজিসলেচার এবং জুডিশিয়ারি একটা আরেকটাকে ওভারল্যাপিং বা কোনো ডিক্টেট করতে পারে না।
এমওএস/কেএসআর