আন্তর্জাতিক

সংকটের মধ্যেও কৃষিতে ভরসা আফগান নারীরা

আফগানিস্তানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের দুর্গম নুরিস্তান প্রদেশের একটি প্রত্যন্ত গ্রামে কৃষিকাজের মাধ্যমে পুরো জনপদের জীবনধারা টিকিয়ে রাখছেন নারী কৃষকরা। বরফে ঢাকা পাহাড়ঘেরা এই অঞ্চলে বছরের বেশিরভাগ সময় বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকতে হয় বাসিন্দাদের। এখানে খাদ্য উৎপাদনের মূল দায়িত্ব বহন করেন গ্রামের নারীরা।

Advertisement

জুন মাসে এস্তিওই গ্রামের মাঠে নতুন সবুজ চারা গজাতে শুরু করেছে। সেখানেই আগাছা পরিষ্কার করতে করতে ৪৬ বছর বয়সী হাবিবা জানান, আট বছর বয়স থেকেই তিনি মায়ের সঙ্গে মাঠে কাজ করছেন।

হাবিবা বলেন, শরৎকালে যখন গম, শিম, আলু ও ভুট্টা ঘরে তুলতে পারি, তখন খুব আনন্দ লাগে।

তালেবান সরকারের অধীনে নারীদের অধিকাংশ চাকরিতে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও কৃষিকাজে তারা এখনও অংশ নিতে পারেন।

Advertisement

কৃষিবিদ ও স্থানীয় কৃষক মোহাম্মদ ইয়াহইয়া ফাইজির মতে, গ্রামের নারীরা মাঠে কাজ না করলে শীতকালে মানুষের খাবারের সংকট দেখা দিত।

তিনি জানান, বহু প্রজন্ম ধরে পারুন উপত্যকায় কাজের দায়িত্ব ভাগ করা রয়েছে। নারীরা চাষাবাদ, বীজ রোপণ, সেচ ও রান্নার দায়িত্ব পালন করেন। অন্যদিকে পুরুষরা লাঙল চালানো, গবাদিপশুর দেখভাল এবং শীতের জন্য জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করেন।

প্রতিদিন ভোর চারটায় ঘুম থেকে ওঠেন হাবিবা। নামাজ শেষে মেয়েদের নিয়ে কাঠের চুলায় নাশতা তৈরি করেন। নিজের উৎপাদিত গমের আটা দিয়ে রুটি, লাল শিম, মাখন ও শুকনো দই পরিবারের খাবারের প্রধান উপকরণ।

হাবিবার ১১ বছর বয়সী মেয়ে নাহিদা স্থানীয় স্কুলে পড়ে এবং ইংরেজি শেখার চেষ্টা করছে। তবে আফগানিস্তানে ১২ বছরের বেশি বয়সী মেয়েদের স্কুলে যাওয়ার সুযোগ না থাকায় শিগগিরই তার পড়াশোনাও বন্ধ হয়ে যাবে।

Advertisement

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা ২০২৬ সালকে ‘আন্তর্জাতিক নারী কৃষক বর্ষ’ ঘোষণা করেছে। সংস্থাটি বলছে, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নারী কৃষকদের অবদান এখনও যথাযথ স্বীকৃতি পায় না।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে আফগানিস্তানের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ জরুরি খাদ্য সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।

৭০ বছর বয়সী কৃষক বিবি জান বলেন, কৃষিকাজ খুব কষ্টের। হাতে চামড়া উঠে যায়, তবু সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে কাজ করতেই হয়।

হাবিবার স্বপ্ন একটি ট্র্যাক্টর কেনার। কিন্তু উচ্চমূল্যের কারণে সেটি সম্ভব হচ্ছে না। পুরো গ্রামে মাত্র একটি ট্র্যাক্টর রয়েছে, যা ভাড়া নিতে হয়।

২৮ বছর বয়সী নজিয়া বলেন, কৃষিকাজ শুধু পুরুষদের পেশা নয়। তবে কৃষকদের প্রয়োজন আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং উৎপাদিত পণ্য বিক্রির সুযোগ।

তিনি বলেন, আমরা অনেক ফসল উৎপাদন করি, কিন্তু বিক্রির জন্য কোনো সংগঠিত বাজার নেই।

জাতিসংঘের সহায়তায় গ্রামে ফসল সংরক্ষণের জন্য গুদাম নির্মাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি উন্নত বীজ এবং কৃষি-বনায়ন (অ্যাগ্রোফরেস্ট্রি) পদ্ধতি চালু করা হয়েছে, যাতে কৃষকদের আয় বাড়ে।

তবে জলবায়ু পরিবর্তন নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। অনিয়মিত তুষারপাত, বৃষ্টিপাত এবং আকস্মিক বন্যায় প্রায়ই ফসলের ক্ষতি হচ্ছে।

নজিয়া বলেন, আবহাওয়া এখন আর আগের মতো নেই। কখন কী হবে, তা বোঝা যায় না।

সব প্রতিকূলতার মধ্যেও নারী কৃষকদের উৎসাহ কমেনি। নজিয়ার ভাষায়, আমরা একে অন্যকে সাহায্য করি। নিজেদের হাতে উৎপাদিত খাবারই সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর।

সূত্র: এএফপি

এমএসএম