জিম্বাবুয়ের কাছে ইনিংস ব্যবধানে হেরেছে বাংলাদেশ। অথচ কিছুদিন আগেই ঘরের মাঠে পাকিস্তানের বিপক্ষে টানা দ্বিতীয়বারের মতো টেস্ট সিরিজ জিতেছিলো অনায়াসে। সেই দলটাই এখন নাকানিচুবানি খেলো হারারেতে। মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে যে, আকস্মিক পারফরম্যান্সের এমন বেহাল দশার কারণ কী?
Advertisement
উত্তর খুঁজতে খুব বেশি কষ্ট করার দরকার নেই। উত্তরটা সহজ — বিশ্বকাপ ফুটবলের মৌসুমে বাংলাদেশ ভালো করবেই বা কেন?
শুনে অবাক হতে পারেন। তবে এটাই সত্যি যে, বাংলাদেশ মাঠে নামার আগেই নিশ্চিত হয়ে গেছে ফলাফল অনুকূলে আসছে না। নিয়মিত বাংলাদেশ ক্রিকেটের দর্শক হয়ে থাকলে আপনার জানা উচিত, বিশ্বকাপ ফুটবলের মৌসুমে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সফলতার হারটা খুবই নিম্নমুখী। তাই এবারও ভালো কিছু আশা করার সুযোগ ছিলো না। যদিও বিষয়টা কাকতালীয়ই বলা চলে।
এরপরও ২০১০ থেকে এখন পর্যন্ত ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপ মৌসুমে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের ব্যর্থতার ফলাফল তুলে ধরছি ধারাবাহিকভাবে। ২০১০ এশিয়া কাপ, ২০১৪ সালে ভারতের কাছে ঘরের মাঠে ধবলধোলাই, ২০১৮ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে টেস্টে ভরাডুবি আর জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে গতকাল টেস্টে ইনিংস ব্যবধানে হার তো সবারই জানা।
Advertisement
সে বছর ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপ শুরু হয়েছিল জুনের ১১ তারিখ। এর ঠিক চারদিন পর শ্রীলঙ্কায় মাঠে গড়ায় এশিয়া কাপ ক্রিকেট। সেই আসরে ভারত, পাকিস্তান ও স্বাগতিক শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে খেলে কোনো ম্যাচেই জয় পায়নি বাংলাদেশ।
শুরুটা করেছিল ভারতের বিপক্ষে। মাত্র ১৬৭ রানে অলআউট হয়ে ম্যাচটি হেরেছিল সাকিব আল হাসানের দল ৬ উইকেটে। পরের ম্যাচে স্বাগতিক শ্রীলঙ্কার দেওয়া ৩১৩ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে মাত্র ১৮৬ রানে গুটিয়ে যায় বাংলাদেশ। ফলে হারতে হয় ১২৬ রানে। আর শেষ ম্যাচে পাকিস্তানের ৩৮৬ রানের পাহাড়সম লক্ষ্য টপকাতে গিয়ে ২৪৬ রানের বেশি করতে না পারায় পরাজিত হতে হয় ১৩৯ রানের বিশাল ব্যবধানে।
নিজেদের তিন ম্যাচের সবকটিতে হেরেই দেশে ফিরে আসে বাংলাদেশ দল ব্যর্থ এশিয়া কাপ মিশন শেষে।
খর্বশক্তির ভারতের কাছে সিরিজ হার (ওয়ানডে সিরিজ, মিরপুর, ২০১৪)সে বছর ফিফা বিশ্বকাপ শুরু হওয় ১২ জুন। সেসময় সুরেশ রায়নার নেতৃত্বে খর্বশক্তির ভারত বাংলাদেশের বিপক্ষে ৩ ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ খেলতে ঢাকায় আসে। সিরিজ শুরু হয় ১৫ জুন। মুশফিকুর রহিমের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ সেই সিরিজে একটি ম্যাচও জিততে পারেনি। অথচ ভারত ‘বি’ টিম পাঠানোয় সমর্থকদের আশা ছিলো, প্রথমবারের মতো ভারতের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ জিতবে মুশফিকুর রহিমরা।
Advertisement
কিন্তু ঘটেছে পুরো তার উল্টো। প্রথম ম্যাচে বাংলাদেশ ২৭২ রানের সংগ্রহ দাঁড় করায়। ২৪.৫ ওভারে ৩ উইকেটে ১৫৩ রান করার পর নামে বৃষ্টি। ডিএলএস পদ্ধতিতে ৭ উইকেটে জিতে সিরিজে এগিয়ে যায় ভারত। দ্বিতীয় ম্যাচে অভিষেক হয় তাসকিন আহমেদের। ২৮ রান খরচায় ৫ উইকেট নিয়ে তিনি ভারতকে আটকে দেন মাত্র ১০৫ রানে।
ক্ষুদ্র লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ৪৪ রানে ৩ উইকেট হারায় স্বাগতিকরা। পরে সেখান থেকে ১৪ রান যোগ হতেই বাকি ৬ উইকেট হারিয়ে মাত্র ৫৮ রানে অলআউট হয়ে ৪৭ রানে হারে বাংলাদেশ। ৪ রানে ৬ উইকেট শিকার করে অভিষিক্ত তাসকিনকে ম্লান করে দেন ভারতের পেসার রজার বিনি। টানা দুই ম্যাচ জিতে নিশ্চিত হয় সিরিজ জয়।
ফিফা বিশ্বকাপের সময় সেভাবে ক্রিকেট নিয়ে নজর না থাকলেও ভারতের মতো বড় দলের বিপক্ষে সিরিজ হওয়ায় আগ্রহের কমতি ছিলো না সমর্থকদের। তাই অপ্রত্যাশিত এই পরাজয় এখনও কাঁদায় বাংলাদেশের ক্রিকেট ভক্তদের। শেষ ম্যাচ বৃষ্টিতে পরিত্যক্ত হয়। ২-০ ব্যবধানে সিরিজ জিতে নেয় ভারত।
ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে টেস্টে লজ্জাজনক হার (টেস্ট সিরিজ, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ২০১৮)রাশিয়া অনুষ্ঠিত ফিফা বিশ্বকাপের মাঝপথে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে যায় বাংলাদেশ দল। সিরিজ শুরু হয় ৪ জুলাই টেস্ট দিয়ে। এর আগে, ১৮ জুন শুরু হয় ফিফা বিশ্বকাপ। উইন্ডিজ সফরে প্রথম ম্যাচে নিজেদের টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসের সর্বনিম্ন ৪৩ রানে অলআউটের লজ্জায় ডুবে কেমার রোচের তোপে। অন্যদিকে স্বাগতিক উইন্ডিজ করে ৪০৬ রান। দ্বিতীয় ইনিংসে ১৪৪ রানে অলআউট হয় সাকিব আল হাসানের দল। ফলে তৃতীয় দিনেই হারতে হয় ইনিংস ও ২১৯ রানের বিশাল ব্যবধানের।
প্রথম টেস্টের মতো সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টও হারতে হয় তিন দিনেই। এবার হারতে হয় ১৬৬ রানে। টেস্ট সিরিজ ২-০ ব্যবধানে ধবলধোলাই হয় বাংলাদেশ। টেস্ট সিরিজ শেষ হওয়ার পরদিন ফাইনাল অনুষ্ঠিত হয় ফিফা বিশ্বকাপের। এরপর অনুষ্ঠিত সাদা বলের দুই সিরিজেই জয় পায় বাংলাদেশ।
জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ইনিংস হারের লজ্জা (একমাত্র টেস্ট, হারারে, ২০২৬)একেবারেই আলোচনা নেই। ১১ জুন থেকে শুরু হওয়া ফুটবল বিশ্বকাপের কারণে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল উন্মাদনার মাঝে স্বাভাবিকভাবেই জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে বাংলাদেশের একমাত্র টেস্ট গুরুত্ব পাবে না। সেই হিসাবে ইনিংস ও ৮৫ রানে পরাজিত হওয়ায় নেই কোনো আলোচনা বা সমালোচন কিছুই। প্রথম ইনিংসে ১৪০ রানে অলআউট হওয়ার পর জিম্বাবুয়ে প্রথম ইনিংসে ৪১০ রান করে দাঁড় করায় ২৭০ রানের লিড। দ্বিতীয় ইনিংসে ১৮৫ রানের বেশি করতে না পারায় ডুবতে হয়েছে ইনিংস ও ৮৫ রানের লজ্জায়।
সুখের স্মৃতিও আছে ভারতের বিপক্ষে (ওয়ানডে সিরিজ, মিরপুর ও চট্টগ্রাম, ২০২২)ফিফা বিশ্বকাপের মৌসুমে হারের পাল্লাটা বেশি। তবে এত এত ব্যর্থতার মাঝেও আছে এক স্মরণীয় সিরিজ জয়ও। সবশেষ ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ চলাকালীন ঘরের মাঠে ভারতের বিপক্ষে ৩ ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ ২-১ ব্যবধানে জিতেছিলো বাংলাদেশ মেহেদী হাসান মিরাজের অলরাউন্ড নৈপুণ্যে। ওয়ানডে সিরিজটি ৪ ডিসেম্বর শুরু হয়ে ১০ ডিসেম্বর শেষ হয়। আর ফিফা বিশ্বকাপ নভেম্বরের ২০ তারিখ শুরু হয়েছিল।
সিরিজের প্রথম ম্যাচে মাত্র ১৮৭ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ১৩৬ রানে ৯ উইকেট হারিয়ে নিশ্চিত পরাজয়ের দ্বারপ্রান্তে থাকা বাংলাদেশকে অপরাজিত ৩৮ রানের ইনিংস খেলে খাদের কিনারা থেকে তোলেন মিরাজ।
দ্বিতীয় ওয়ানডেতে ৬৯ রানে ৬ উইকেট হারানো বাংলাদেশের আরেকবার হাল ধরেন মিরাজ। এবার মাহমুদউল্লাহ রিয়াদকে নিয়ে গড়েন ১৪৮ রানের জুটি। রিয়াদ ৭৭ রানে সাজঘরে ফিরলেও ৮৩ বলে অপরাজিত ১০০ রান করেন মিরাজ। এটি ছিলো তার ওয়ানডে ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরি। রুদ্ধশ্বাস ম্যাচটি ৫ রানে জিতে দ্বিতীয়বারের মতো ভারতের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ জিতে নেয় বাংলাদেশ। সিরিজসেরা হন মেহেদী হাসান মিরাজ।
চলমান জিম্বাবুয়ে সিরিজটি বিশ্বকাপ ফাইনালের আগেরদিন শেষ হবে। টেস্টে লজ্জাজনক পরজায় হলেও সাদা বলের বাকি ৬ ম্যাচে বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়াবে এমনটাই আশা সমর্থকদের। সমান ৩টি করে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি ম্যাচ বাকি। ফুটবল বিশ্বকাপের মৌসুমে এই দুটি সিরিজ লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা জিতবে, এটাই আশা ভক্তদের।
আইএন