তাজরীন, জার্মানি
Advertisement
স্পোর্টস ডেস্কের শিরোনামে হয়তো কাল লেখা হয়েছিল এক পরাশক্তির বিদায়ের গল্প। হ্যাঁ, মাঠের লড়াইয়ে জার্মানি গতকাল হেরে গেছে। কিন্তু এই হারের পরও আমাদের দেশের হাজারো মেধাবী শিক্ষার্থীর মনে জার্মানিকে নিয়ে যে স্বপ্ন বুনে আছে, তা কিন্তু একটুও ম্লান হয়নি।
প্রতি বছর এই জুলাই মাস এলেই মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারের হাজারো শিক্ষার্থীর চোখে নতুন এক আশার আলো জ্বলে ওঠে। কারণ, এই সময়টাতেই শুরু হয় বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ সরকারি বৃত্তির আবেদন প্রক্রিয়া।
সাধারণভাবে, এই বৃত্তির সিংহভাগ প্রোগ্রামের আবেদন প্রক্রিয়া জুলাই মাস থেকে শুরু হয়ে অক্টোবর বা নভেম্বরের মধ্যে শেষ হয়। তবে এটি কোনো নির্দিষ্ট নিয়মে বাঁধা নয়।
Advertisement
আপনি কোন বিষয়ে বা কোন উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আবেদন করছেন, তার ওপর ভিত্তি করে সময়সীমা পরিবর্তিত হতে পারে। তাই আবেদনের পূর্বে তাদের নিজস্ব দাপ্তরিক ওয়েবসাইটে গিয়ে সময়সূচিটি আরেকবার যাচাই করে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
এই সরকারি বৃত্তিটি আসলে কী?এটি হলো জার্মান সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিত একটি বিশ্ববিখ্যাত শিক্ষা বিনিময় কার্যক্রম। প্রতি বছর বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে হাজার হাজার আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে স্নাতকোত্তর, পিএইচডি এবং উচ্চতর গবেষণার জন্য এই কর্মসূচির আওতায় আনা হয়।
স্নাতক পর্যায়ে কি এই বৃত্তি পাওয়া সম্ভব?আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই বিষয়টি নিয়ে একটি বড় ধরনের ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। বাংলাদেশ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ করেই এই বৃত্তির সুবিধা নিয়ে জার্মানিতে স্নাতক করতে আসা সাধারণত সম্ভব নয়। এই কর্মসূচির প্রায় নিরঙ্কুশ অংশই বরাদ্দ থাকে স্নাতকোত্তর এবং পিএইচডি পর্যায়ের জন্য। তাই আপনার লক্ষ্য যদি হয় স্নাতক ডিগ্রি অর্জন, তবে এই বৃত্তির ওপর ভরসা না করে জার্মানির অবৈতনিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সরাসরি চেষ্টা করাই শ্রেয়।
এই বৃত্তির আওতায় কী কী সুবিধা পাওয়া যায়?শিক্ষার ধরন অনুযায়ী সুযোগ-সুবিধার কিছুটা তারতম্য হতে পারে, তবে একজন নির্বাচিত শিক্ষার্থী সাধারণত যে সুবিধাগুলো পান, তা এক কথায় অবিশ্বাস্য।
Advertisement
জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহের জন্য প্রতি মাসে একটি নির্দিষ্ট অংকের ভাতা বা উপবৃত্তি, সম্পূর্ণ চিকিৎসাসেবা বা স্বাস্থ্য বিমার সুবিধা, নিজ দেশ থেকে যাওয়া-আসার বিমান ভাড়া, গবেষণা পরিচালনার জন্য বিশেষ আর্থিক অনুদান, অনেক ক্ষেত্রে বিনামূল্যে জার্মানির স্থানীয় ভাষা শেখার কোর্স, আবেদনের যোগ্যতা ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র।
যারা স্নাতক শেষ করে স্নাতকোত্তরে আসতে চান কিংবা স্নাতকোত্তর শেষ করে পিএইচডি করতে ইচ্ছুক, তারা এতে আবেদন করতে পারবেন। কিছু কিছু বিশেষায়িত বিষয়ের ক্ষেত্রে ন্যূনতম দুই বছরের পেশাগত কাজের অভিজ্ঞতা থাকা বাধ্যতামূলক।
আবেদনের জন্য মূলত আপনার আন্তর্জাতিক পরিচয়পত্র (পাসপোর্ট), পূর্ববর্তী সকল শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ ও নম্বরপত্র, একটি সুবিন্যস্ত জীবনবৃত্তান্ত এবং অধ্যাপক বা কর্মক্ষেত্রের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সুপারিশপত্র প্রয়োজন হবে।
তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে যে বিষয়টি আপনার ভাগ্য নির্ধারণ করবে, সেটি হলো একটি শক্তিশালী ও যৌক্তিক ‘উদ্দেশ্যপত্র’। আপনি কেন এই বিষয়ে পড়তে চান এবং ভবিষ্যতে আপনার লক্ষ্য কী তা এই পত্রে পরিষ্কারভাবে ফুটিয়ে তুলতে হবে।
এছাড়া, ইংরেজি মাধ্যমে পড়ার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইংরেজি ভাষা দক্ষতার সনদ (যেমন আইইএলটিএস) প্রয়োজন হবে। সাধারণত সাড়ে ৬ বা তার বেশি স্কোর থাকলে বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করা যায়, তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটি ৬ কিংবা ৭ ওঠানামা করতে পারে।
সফলতার সম্ভাবনা বাড়াবেন কীভাবে?অনেকে মনে করেন শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালো ফলাফল (সিজিপিএ) থাকলেই বুঝি এই বৃত্তি নিশ্চিত। ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল। এখানে একজন প্রার্থীর সামগ্রিক প্রোফাইল মূল্যায়ন করা হয়। আপনার প্রাতিষ্ঠানিক ফলাফলের পাশাপাশি যদি কোনো গবেষণার অভিজ্ঞতা, সামাজিক বা নেতৃত্বমূলক কাজের ইতিহাস এবং একটি স্পষ্ট ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা থাকে, তবে আপনার সফলতার সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায়।
মাঠের খেলায় হার-জিত থাকবেই, কিন্তু শিক্ষার বৈশ্বিক মঞ্চে জার্মানি বরাবরই অপরাজেয়। তাই শুধু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মন খারাপ না করে, নিজের যোগ্যতা প্রমাণের এই লড়াইয়ে নেমে পড়ার এখনই উপযুক্ত সময়।
এমআরএম