প্রবাস

প্রতিদিনের অভ্যাসে শিখুন জার্মান ভাষা

মিজানুর রহমান, জার্মানি

Advertisement

আমাদের দেশের অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যেই একটা প্রবণতা দেখা যায়- উচ্ছ্বাস নিয়ে জার্মান ভাষা শেখা শুরু করলেও কিছুদিন পর তারা খেই হারিয়ে ফেলেন। মনে হয় যেন চাকা আর সামনে ঘুরছে না, স্থবিরতা চলে এসেছে।

অভিজ্ঞতার আলোয় আমি স্পষ্ট বলতে পারি, এই সমস্যার মূল কারণ কঠোর পরিশ্রমের অভাব নয়, বরং সঠিক পদ্ধতির অনুপস্থিতি। ভাষা শেখা কোনো মুখস্থ বিদ্যার বিষয় নয়, এটি আসলে মস্তিষ্কের একটি দীর্ঘমেয়াদি অভ্যাস গঠনের প্রক্রিয়া।

অনেকে ভাবেন সপ্তাহে একদিন টানা পাঁচ ঘণ্টা বই নিয়ে বসে থাকলেই বুঝি ভাষা আয়ত্ত করা সম্ভব। এটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। সপ্তাহে একদিন দীর্ঘ সময় পড়ার চেয়ে প্রতিদিন মাত্র ত্রিশ মিনিট করে মনোযোগ দেওয়া দশ গুণ বেশি কার্যকর।

Advertisement

আপনি সকালের চা পানের সময়ই হোক কিংবা রাতে ঘুমানোর আগে, কোনো বিরতি ছাড়া প্রতিদিনের এই আধ ঘণ্টার নিয়মটি ধরে রাখতেই হবে। শুরুর দিকে ভিত্তি মজবুত করার জন্য বিভিন্ন মোবাইল অ্যাপ বেশ সাহায্য করতে পারে।

এগুলো খেলার ছলে শেখায় বলে একঘেয়েমি কাটে, তবে মনে রাখতে হবে—এটি কেবল প্রাথমিক ভিত গড়ার জন্য, এর ওপর পুরোপুরি নির্ভর করে বসে থাকা যাবে না।

ভাষা দ্রুত শেখার সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো কান দিয়ে তা মস্তিস্কে প্রবেশ করানো। ইন্টারনেট ভিডিও মাধ্যমে বিভিন্ন শিক্ষণীয় চ্যানেল নিয়মিত দেখা যেতে পারে। প্রথম দিকে জার্মান ভাষার চলচ্চিত্র বা নাটকগুলো বাংলা উপশিরোনামসহ এবং পরবর্তীতে উপশিরোনাম ছাড়াই দেখার অভ্যাস করতে হবে।

যাতায়াত বা হাঁটার সময়েও কানে শুনতে হবে জার্মান আলোচনা বা অডিও রেকর্ড। এর পাশাপাশি আরেকটি শক্তিশালী কৌশল হলো—অনুকরণ পদ্ধতি। কোনো খাঁটি জার্মান অডিও শুনে ঠিক তার সাথে সাথে হুবহু উচ্চারণ, সুর ও গতি নকল করে মুখে বলার চেষ্টা করতে হবে। দিনে মাত্র পনেরো মিনিট এই অনুকরণ পদ্ধতি চর্চা করলে মুখের জড়তা কেটে কথা বলার গতি অনেক বেড়ে যায়।

Advertisement

ভাষা শেখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় শত্রু হলো ভুল করার ভয়। অনেকেই ভুল করার ভয়ে মুখ খোলেন না, যা তাদের আত্মবিশ্বাসকে তলানিতে নিয়ে যায়। এই জড়তা কাটাতে ইন্টারনেটভিত্তিক বিভিন্ন ভাষা বিনিময় মাধ্যমের সাহায্যে এমন পার্টনার খুঁজে নিতে হবে যাদের মাতৃভাষা জার্মান।

আপনি তাকে নিজের ভাষা শেখানোর বিনিময়ে তার কাছ থেকে বিনামূল্যে জার্মান ভাষা রপ্ত করে নিতে পারেন। এছাড়া নতুন কোনো শব্দ শেখা মাত্রই তা একটি ছোট খাতায় অর্থ এবং বাস্তব উদাহরণ বাক্যসহ লিখে রাখতে হবে। ডিজিটাল ফ্ল্যাশকার্ড বা স্মারক খাতা ব্যবহার করে সপ্তাহে অন্তত একবার সেই শব্দগুলো পুনরাবৃত্তি করা জরুরি।

নিজের পরিচিত পরিবেশকে পুরোপুরি এই ভাষার রঙে রাঙিয়ে তোলা আরেকটি দারুণ কৌশল। হাতের মুঠোফোনের ভেতরের ভাষা পরিবর্তন করে জার্মান করে নেওয়া, প্রতিদিনের বাজারের তালিকা জার্মানে লেখা কিংবা প্রতিদিন সকালে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের সাথে অন্তত পাঁচটি বাক্য জার্মানে বলার অভ্যাস করা—এই ছোট ছোট পরিবর্তনগুলো মনের অজান্তেই আপনাকে ভাষার কাছাকাছি নিয়ে যাবে। এর বাইরেও নিজেকে একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে রাখতে ভালো কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কোর্সে যুক্ত হওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

নিয়মিত এবং সুশৃঙ্খলভাবে সময় দিলে মাত্র দুই থেকে তিন মাসে প্রাথমিক স্তর পার হওয়া সম্ভব। এরপরের প্রতিটি ধাপ বা স্তর পার হতে গড়ে তিন থেকে ছয় মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। তবে এটি সম্পূর্ণ নির্ভর করে ব্যক্তির নিজস্ব মেধা ও শৃঙ্খলার ওপর।

যারা ফাঁকিবাজি না করে প্রতিদিন নিয়ম মেনে নিজেকে প্রস্তুত করবেন, জার্মানির মাটিতে তাদের সাফল্য নিশ্চিত। আর যারা অলসতায় সময় পার করবেন, তাদের জন্য এই কঠিন ভাষার দরজা চিরতরে বন্ধই থেকে যাবে।

এমআরএম