সকাল থেকে পরীক্ষাকেন্দ্রের বাইরে একই দৃশ্য-হাতে পানির বোতল, ছাতা কিংবা ব্যাগ নিয়ে অপেক্ষা করছেন অসংখ্য অভিভাবক। ভেতরে সন্তান পরীক্ষা দিচ্ছে, আর বাইরে সময় যেন কাটতেই চায় না। কারও চোখ ঘড়িতে, কেউ আবার বারবার পরীক্ষাকেন্দ্রের ফটকের দিকে তাকিয়ে থাকেন।
Advertisement
এই অপেক্ষা স্বাভাবিক। কারণ সন্তানের ভবিষ্যতের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকবেন-এটাই একজন অভিভাবকের স্বাভাবিক অনুভূতি। তবে অনেক সময় এই উদ্বেগই অজান্তে সন্তানের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে। তাই পরীক্ষা চলাকালে শুধু শিক্ষার্থীর নয়, অভিভাবকের আচরণও গুরুত্বপূর্ণ। পরীক্ষার হলে সন্তান থাকাকালে বাইরে অপেক্ষার সময় যেসব বিষয় মাথায় রাখা উচিত-
আরও পড়ুন পরীক্ষার হলে নার্ভাস লাগলে কী করবেন? উদ্বেগ নয়, নিজেকে শান্ত রাখুনআপনি যত বেশি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত থাকবেন, তার প্রভাব সন্তানের ওপরও পড়তে পারে। পরীক্ষা শুরুর আগে কিংবা শেষে আপনার মুখের উদ্বেগ, অস্থিরতা বা হতাশা সহজেই সে বুঝতে পারে। নিজেকে মনে করিয়ে দিন-এখন আর নতুন করে কিছু করার সময় নয়। সন্তান তার প্রস্তুতি অনুযায়ীই পরীক্ষা দিচ্ছে। আপনার শান্ত উপস্থিতিই তার জন্য সবচেয়ে বড় ভরসা।
অন্য অভিভাবকদের সঙ্গে বিতর্কে জড়াবেন নাপরীক্ষা চলাকালে কেন্দ্রের বাইরে অনেকেই সম্ভাব্য প্রশ্ন, কমন পড়েছে কি না কিংবা কে কত ভালো প্রস্তুতি নিয়েছে-এসব নিয়ে আলোচনা করেন। এসব আলোচনা এড়িয়ে চলাই ভালো। কারণ এগুলো আপনার উদ্বেগ বাড়াতে পারে, আবার পরীক্ষা শেষে সন্তানের সঙ্গেও অপ্রয়োজনীয় চাপের পরিবেশ তৈরি করতে পারে।
Advertisement
পরীক্ষা চলাকালে প্রায়ই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন ফাঁস, উত্তর মিলিয়ে দেখা কিংবা নানা ধরনের গুজব ছড়িয়ে পড়ে। যাচাই না করে এসব তথ্য বিশ্বাস করবেন না। গুজব আপনার উদ্বেগ বাড়ানোর পাশাপাশি সন্তানের মনেও অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
পরীক্ষা শেষে প্রথমেই জিজ্ঞেস করবেন না কেমন পরীক্ষা হলো?'অনেক অভিভাবকের মুখে প্রথম প্রশ্ন থাকে, ‘সব লিখেছ?’, ‘কত নম্বর পাবে?’, ‘কঠিন হয়েছে?’ পরীক্ষা শেষ করেই একজন শিক্ষার্থী মানসিকভাবে ক্লান্ত থাকে। তাই জেরা করার পরিবর্তে বলুন, ‘চলো, আগে একটু পানি খাও’, ‘কেমন লাগছে?’, ‘বিশ্রাম নাও, পরে কথা হবে।’ এই ছোট পরিবর্তন সন্তানের মনে স্বস্তি এনে দিতে পারে।
আরও পড়ুন পরীক্ষার দিন সকালের ১০টি জরুরি কাজ অন্যদের সঙ্গে সন্তানের তুলনা করবেন নাপরীক্ষা শেষ হওয়ার পর প্রায়ই শোনা যায়, ‘অমুক তো সব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে’, ‘তোমার বন্ধু বলছে পরীক্ষা খুব সহজ হয়েছে।’ এ ধরনের তুলনা আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয়। মনে রাখুন, প্রত্যেক শিক্ষার্থীর অভিজ্ঞতা আলাদা। অন্যের পরীক্ষা ভালো হয়েছে মানেই আপনার সন্তানের পরীক্ষা খারাপ হয়েছে-এমন নয়।
প্রয়োজনীয় জিনিস সঙ্গে রাখুন পানির বোতল হালকা শুকনো খাবার ছাতা বা রেইনকোট (মৌসুম অনুযায়ী) প্রয়োজনীয় ওষুধ মোবাইলের পর্যাপ্ত চার্জ পরীক্ষাকেন্দ্রের শৃঙ্খলা মেনে চলুনঅযথা ভিড় করা, প্রবেশপথ আটকে রাখা, উচ্চস্বরে কথা বলা কিংবা যানজট সৃষ্টি করা থেকে বিরত থাকুন। মনে রাখবেন, একই কেন্দ্রে শত শত শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিচ্ছে। আপনার সচেতন আচরণ সবার জন্যই সহায়ক।
Advertisement
‘আজ যদি খারাপ হয়?’, ‘ফলাফল কী হবে?’, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবে তো?’ এ ধরনের দুশ্চিন্তা নিজের মধ্যে রাখাই ভালো। পরীক্ষা চলাকালে ভবিষ্যতের ভয় দেখানো বা ফলাফল নিয়ে আলোচনা শিক্ষার্থীর মনোযোগ নষ্ট করতে পারে।
আরও পড়ুন পরীক্ষাকেন্দ্রে যেসব ভুল বারবার করে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা শেষ মানেই বিশ্লেষণ নয়কেন্দ্র থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রশ্নপত্র মিলিয়ে দেখা, কোথায় ভুল হয়েছে তা বের করা বা সম্ভাব্য নম্বর হিসাব করা অনেক সময় ক্ষতিকর। যদি পরদিনও পরীক্ষা থাকে, তাহলে আগের পরীক্ষা নিয়ে বেশি আলোচনা না করে পরবর্তী বিষয়ের প্রস্তুতিতে মনোযোগ দিতে উৎসাহ দিন।
নিজের যত্নও নিনঅনেক অভিভাবক ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোদে বা বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে থাকেন, ঠিকমতো পানি পান করেন না বা খাবার খান না। আপনি সুস্থ থাকলে সন্তানের জন্যও বেশি কার্যকরভাবে পাশে থাকতে পারবেন। তাই নিজের স্বাস্থ্য ও স্বাচ্ছন্দ্যের দিকেও নজর দিন।
মনে রাখুন, আপনার উপস্থিতিই সবচেয়ে বড় শক্তিএকজন শিক্ষার্থী যখন পরীক্ষার হল থেকে বেরিয়ে পরিচিত একটি মুখ দেখতে পায়, তখন তার মানসিক চাপ অনেকটাই কমে যায়। সেই মুখটি যদি উদ্বেগ নয়, হাসি আর আশ্বাসে ভরা হয়, তাহলে সেটিই হয়ে ওঠে তার দিনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। পরীক্ষা কেবল জ্ঞান যাচাইয়ের বিষয় নয়, এটি মানসিক দৃঢ়তারও পরীক্ষা। আর সেই দৃঢ়তা গড়ে তুলতে পরিবারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
আরও পড়ুন এইচএসসি পরীক্ষার আগের রাতে মানসিক চাপ কমাতে যা করবেনপরীক্ষার হলে সন্তান নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করে। আর পরীক্ষাকেন্দ্রের বাইরে একজন অভিভাবকের দায়িত্ব হলো এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে চাপের বদলে থাকবে ভরসা, উদ্বেগের বদলে থাকবে ধৈর্য এবং প্রশ্নের বদলে থাকবে আন্তরিক সমর্থন।
মনে রাখবেন, পরীক্ষার ফলাফল একটি দিনের গল্প বলতে পারে, কিন্তু আপনার আচরণ সন্তানের মনে থেকে যায় বহু বছর। তাই অপেক্ষার প্রতিটি মুহূর্তকে উদ্বেগে নয়, ভালোবাসা ও ইতিবাচকতায় ভরিয়ে তুলুন।
জেএস/