দেশের বর্তমান স্বাস্থ্যখাতের যে বাস্তব চিত্র, তা এই ঐতিহাসিক সম্ভাবনাকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। একদিকে হাসপাতালগুলোতে সেবার জন্য হাহাকার, অন্যদিকে সরকারি স্বাস্থ্য প্রশাসনে জমে উঠেছে শূন্যপদের বিশাল পাহাড়।
Advertisement
এ অবস্থায় দেশের স্বাস্থ্যখাতের সেবার মান বৃদ্ধি এবং নবসৃষ্ট ও শয্যা-উন্নত হাসপাতালগুলোর কার্যক্রম পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করতে বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এরই অংশ হিসেবে বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের জন্য রাজস্বখাতে প্রায় ৫ হাজার ৩৬৯টি নতুন পদ সৃষ্টির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ সভায় এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সভায় বিস্তারিত পর্যালোচনা শেষে এসব পদ সৃষ্টির প্রস্তাব দ্রুত জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে প্রেরণের বিষয়ে সম্মতি দেওয়া হয়েছে।
বৈঠকে অংশ নেওয়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ও পরিচালকদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। তারা জাগো নিউজকে নিশ্চিত করেন, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব হেলথ ম্যানেজমেন্ট (বিআইএইচএম) সাভারের ৮৩টি, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের ২০৪৮টি, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের ১২টি, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ১ হাজার ৪৮৭টি এবং যশোরের ২৩৮টিসহ নির্দিষ্টকৃত পদ এবং ৩৭টি মেডিকেল কলেজের সংশোধিত প্রস্তাব মিলিয়ে প্রায় ৫ হাজার ৩৬৯টি পদ সৃষ্টির প্রশাসনিক প্রক্রিয়া চলমান।
Advertisement
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব হেলথ ম্যানেজমেন্ট (বিআইএইচএম) সাভারের পরিচালক সভায় উপস্থাপন করেন, বিআইএইচএম সাভার একটি নবসৃষ্ট প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির ভবন নির্মাণ কার্যক্রম শেষ হয়েছে। দক্ষ ও সচেতন স্বাস্থ্য সেবাদানকারী চিকিৎসক এবং নার্সসহ অন্যান্য জনবল তৈরির লক্ষ্যে উক্ত প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানটির জন্য ১৪৬টি পদের বাইরে আরও ৮৩টি পদ সৃষ্টির প্রস্তাব করেছি। বিস্তারিত আলোচনা শেষে সভায় সিদ্ধান্ত হয়, বিআইএইচএম সাভারের জন্য রাজস্বখাতে ৮৩টি পদ সৃষ্টির প্রস্তাব স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে হবে।
ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক সভায় জানান, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ থেকে ২০২২ সালে ৮৫০ শয্যা থেকে ১ হাজার ৩৫০ শয্যায় উন্নীতকরণ ও বর্ধিত শয্যায় সেবা কার্যক্রম চালুর প্রশাসনিক অনুমোদন দেওয়া হয়। ৮৫০ শয্যার জন্য ২১টি বিভাগে সেবা চলমান রাখার জন্য রাজস্বখাতে ১ হাজার ৩০৩ পদ সৃষ্টি করা হয়েছিল। বর্তমানে ১ হাজার ৩৫০ শয্যার জন্য ২১টি বিভাগ চালু করা হয়েছে।
আরও পড়ুন পাথরঘাটা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স / ৩ লাখ মানুষের সেবায় চিকিৎসক মাত্র দুজন!তিনি জানান, শয্যা সংখ্যার তুলনায় শয্যা ব্যবহারের হার প্রতিনিয়ত ১৫০ থেকে ১৬০ শতাংশ; এছাড়া হাসপাতালটিতে আউটডোরে প্রতিদিন ৪-৫ হাজার এবং জরুরি বিভাগে ৩০০-৪০০ জন রোগী চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করে। এ প্রেক্ষিতে বর্ণিত শয্যার প্রস্তাবিত ২ হাজার ৭১১টি পদ সৃজন করা প্রয়োজন। সভায় সার্বিক বিবেচনায় সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জন্য প্রস্তাবিত ২ হাজার ৭১১টি পদের মধ্যে প্রয়োজনীয়তার নিরিখে ২ হাজার ৪৮টি পদ সৃষ্টির প্রস্তাব জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করতে হবে।
স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বৈঠকে জানানো হয়, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের কাজ গতিশীল করার লক্ষ্যে প্রথম সেক্টর কর্মসূচি থেকে চতুর্থ সেক্টর কর্মসূচি পর্যন্ত হেলথ ইকোনমিক্স অ্যান্ড ফিন্যান্সিং অপারেশন প্ল্যান (এইচইএফওপি) শিরোনামে ৪৩টি পদ নিয়ে ৫টি কম্পোনেন্ট যথাক্রমে-
Advertisement
১. হেলথ ইকোনমিক্স অ্যান্ড ক্যাপাসিটি বিল্ডিং; ২. স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচি (এসএসকে); ৩. কোয়ালিটি ইমপ্রুভমেন্ট সেক্রেটারিয়েট (কিউআইএস); ৪. বাংলাদেশ ন্যাশনাল হেলথ অ্যাকাউন্টস (বিএনএইচএ) এবং ৫. জেন্ডার এনজিও অ্যান্ড স্টেকহোল্ডার পার্টিসিপেশনের (জিএনএসপি) কার্যক্রম রাজস্ব খাতের পাশাপাশি উন্নয়ন খাতের মাধ্যমে, যা ৩০ জুন ২০২৪ পর্যন্ত চলমান ছিল।
আরও পড়ুন অটোমেশন হচ্ছে স্বাস্থ্যখাত, আসছে জাতীয় ই-প্রেসক্রিপশন২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে উন্নয়ন কর্মসূচি না থাকায় স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের সব কার্যক্রম চলমান রাখার জন্য হেলথ ইকোনমিক্স অ্যান্ড ফিন্যান্সিং অপারেশন প্ল্যান (এইচইএফওপি) অনুমোদিত ৪৩টি পদের মধ্যে ৩৯টি পদ রাজস্বখাতে সৃজন করা প্রয়োজন। বিস্তারিত পর্যালোচনা শেষে সভায় সিদ্ধান্ত হয়, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের জন্য প্রোগ্রামার, সহকারী প্রোগ্রামার, আউটসোর্সিং ক্যাটাগরিভুক্ত পদসমূহ ব্যতীত এবং ঊর্ধ্বতন গবেষণা সহযোগীর পরিবর্তে ঊর্ধ্বতন গবেষণা কর্মকর্তা নামকরণসহ প্রয়োজনীয়তার নিরিখে ১২টি পদ সৃষ্টির সংশোধিত প্রস্তাব জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করতে হবে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (চমেক) পরিচালক জানান, এ হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার ৯০০ থেকে ৩ হাজার রোগী আউটডোরে এবং ৩ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ জন রোগী ইনডোরে চিকিৎসা গ্রহণ করেন। হাসপাতালে আগত রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ থেকে হাসপাতালটি ২০২৩ সালে ২ হাজার ২০০ শয্যায় উন্নীতকরণ ও বর্ধিত শয্যায় সেবা কার্যক্রম চালুর প্রশাসনিক অনুমোদন প্রদান করা হয়েছে। এর আগে এই প্রতিষ্ঠানে ২ হাজার ৯৩টি পদ রাজস্বখাতে সৃজন করা হয়েছে এবং বর্তমানে আরও ১ হাজার ৪৪৭টিসহ মোট ৩ হাজার ৫৪০টি পদের প্রস্তাব করা হয়েছে। আলোচনা শেষে সভায় সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জন্য প্রস্তাবিত ১ হাজার ৪৪৭টি পদ সৃষ্টির লক্ষ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করতে হবে।
আরও পড়ুন প্রতিবেদন / ঋণ করে চিকিৎসা নেন দেশের ২৬ শতাংশ মানুষএর বাইরে ৩৭টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ‘ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন বিভাগ’ পদ সৃষ্টির বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) সভায় দেশের মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ছাড়াও বিশেষায়িত হাসপাতালসহ অনগ্রসর এলাকায় স্থাপিত হাসপাতালকে এর আওতায় আনার বিষয়ে অভিমত দেন। পাশাপাশি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে প্রস্তাবিত ১ হাজার ৫০১টি পদ সৃষ্টির বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
উল্লিখিত বিভাগের জন্য জুনিয়র কনসালটেন্ট এবং সিনিয়র কনসালটেন্ট পদ রাখার বিষয়ে সভায় বিস্তারিত আলোচনা হয়। আলোচনা শেষে সভায় সিদ্ধান্ত হয়, ৩৭টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন বিভাগের জন্য জুনিয়র কনসালটেন্ট এবং সিনিয়র কনসালটেন্ট পদসমূহ অন্তর্ভুক্ত রেখে প্রয়োজনীয় যৌক্তিকতাসহ পুনরায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর প্রস্তাব প্রেরণ করবে। এই সংশোধিত প্রস্তাব স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে হবে।
আরও পড়ুন লাইসেন্স ফিরে পেতে পারে আদ্-দ্বীন হাসপাতাল২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল, যশোরের তত্ত্বাবধায়ক সভায় জানান, করোনারি কেয়ার ইউনিটের জন্য এর আগে ২৭টি পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। কম সংখ্যক জনবল দ্বারা ইউনিটটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা সম্ভব হয়নি। পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করতে প্রস্তাবিত ২৩৮টি পদ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। প্রস্তাবিত পদসমূহ নিয়ে সভায় বিস্তারিত আলোচনা হয়। আলোচনায় আউটসোর্সিং ক্যাটাগরিভুক্ত পদসমূহ ব্যতীত চিকিৎসক ও অন্যান্য ক্যাটাগরির পদ সৃষ্টির লক্ষ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা প্রয়োজন বলে সবাই মত দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে সভায় সিদ্ধান্ত হয়, ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল, যশোরের করোনারি কেয়ার ইউনিটের জন্য প্রস্তাবিত ২৩৮টি পদের মধ্যে আউটসোর্সিং ক্যাটাগরিভুক্ত পদসমূহ ব্যতীত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান সংশোধিত প্রস্তাব পাঠাবে।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জাগো নিউজকে বলেন, ‘রাজস্বখাতে ৪ হাজার ৩১৯টি পদ সৃষ্টির বিষয়ে সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে। সেখানে আরও বেশি পদ সৃষ্টির প্রস্তাব ছিল। আমরা পর্যালোচনা করে রাজস্বখাতে ৪ হাজার ৩১৯টি পদ সৃষ্টির প্রস্তাব জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
আরও পড়ুন পদোন্নতিবঞ্চিত ২৫০০ / ঈদ আসে-যায়, শেষ হয় না চিকিৎসকদের অপেক্ষাএদিকে ২০২৬ সালের সর্বশেষ সরকারি হিসাব ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ‘হেলথ ওয়ার্কফোর্স স্ট্র্যাটেজি ২০২৪’ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দেশের স্বাস্থ্যখাতের বিভিন্ন অধিদপ্তরে মোট অনুমোদিত পদের ২৮ দশমিক ৬ শতাংশই বর্তমানে সম্পূর্ণ শূন্য! এর মধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ৪৮ হাজার ৫২টি পদ শূন্য (যার মধ্যে চিকিৎসকদের পদই খালি ২২.৫%)। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের ১৬ হাজার ৯২১টি পদ শূন্য (যার ফলে মা ও শিশু স্বাস্থ্য সেবা ব্যাহত)। নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের ৫ হাজার ৩৩৩টি পদ শূন্য। মোট শূন্যপদ ৭১ হাজার ৭৬৫টি। এই বিশাল শূন্যপদ দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা দেশের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও নিয়োগ প্রক্রিয়ার ধীরগতির প্রমাণ দেয়।
এ অবস্থায় বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের জন্য রাজস্বখাতে ৫ হাজার ৩৬৯টি নতুন পদ সৃষ্টির যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে তাকে সাধুবাদ জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এসইউজে/ইএ/এমএফএ