ফুটবল শুধু ২২ জনের একটি খেলা নয়, এটি চিন্তা কিংবা ধারণারও লড়াই। কখনও একটি নতুন ফরমেশন, কখনও রক্ষণভাগ সাজানোর অভিনব কৌশল, আবার কখনও প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলার ভিন্ন দর্শন- এমন কিছু ট্যাকটিক্যাল বিপ্লব যুগে যুগে বদলে দিয়েছে ফুটবলের চেহারা।
Advertisement
একসময় যে কৌশলকে অসম্ভব মনে হতো, সেটিই পরে হয়ে উঠেছে বিশ্বজয়ী দলের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। বিশ্বকাপের মঞ্চে এসব ধারণা পেয়েছে সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি, আর সেখান থেকেই ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে। ফুটবলের ইতিহাসে খেলার ধরন পাল্টে দেওয়া এমনই কিছু ট্যাকটিক্যাল বিপ্লবের গল্প থাকছে এই প্রতিবেদনে।
বর্তমান আধুনিক ফুটবলে সবচেয়ে জনপ্রিয় ফর্মেশন খুব সম্ভবত ৪-৩-৩, কারণ এতে পুরো মাঠে ভারসাম্য বজায় রেখে খেলা যায়। নিজেদের রক্ষণভাগ সামলানোর পাশাপাশি প্রতিপক্ষের রক্ষণেও পুরো শক্তি নিয়ে আক্রমণ করা যায়।
তবে শুনতে অবাক লাগলেও এটা সত্য যে একটা সময় ফুটবলে সেন্টার ব্যাকের ধারণাই ছিল না। রক্ষণে থাকতেন মাত্র ২ জন খেলোয়াড় যারা আবার খেলতেন ফুলব্যাক হিসেবে। অন্যদিকে আক্রমণে থাকতেন ৫ জন। অনেকটা যেন আধুনিক বাস পার্কিং ফর্মেশনের পুরো উল্টো একটা ফর্মেশন!
Advertisement
আঠারো শতকের শেষভাগ থেকে উনিশ শতকের শুরুর সময়টায় সবচেয়ে জনপ্রিয় এই ২-৩-৫’ই ছিল ফুটবলের প্রথম সংগঠিত ফর্মেশন। একে পিরামিড ট্যাক্টিক্স বা পিরামিড ফর্মেশনও বলা হয়। পরবর্তীতে আধুনিক ফুটবলে যত ফর্মেশন এসেছে তার সবগুলোর ভিত্তি ছিল এটাই।
দু’জন ফুলব্যাকের উপরে খেলতেন তিনজন মিডফিল্ডার অন্যদিকে আক্রমণে ২ জন উইঙ্গারের পাশাপাশি দু’জন সেকেন্ড স্ট্রাইকার এবং একজন সেন্টার ফরোয়ার্ড খেলতেন। এই ফর্মেশনে আক্রমণ মারাত্মক হলেও ডিফেন্স ছিল অত্যাধিক দুর্বল। কারণ প্রতিপক্ষ তিনজন মিডফিল্ডারকে কাটিয়ে বল বের করে ফেললে ৫ জন ফরোয়ার্ডের সামনে ২ জন ফুলব্যাক ডিফেন্ডার খুব একটা সুবিধা করতে পারত না।
এরপর ১৯২৫ সালে অফসাইড নিয়মে বড় পরিবর্তন আনা হয়। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, একজন আক্রমণভাগের খেলোয়াড়কে অনসাইড রাখতে আগের মতো তিনজন নয়, মাত্র দুইজন ডিফেন্ডারই যথেষ্ট ছিল।
এমন অবস্থায় ইংল্যান্ডের ক্লাব আর্সেনালের ম্যানেজার হার্বার্ট চ্যাপম্যান ফুটবলে আগের পিরামিড ফর্মেশনের বিপক্ষে অধিক কার্যকরী এক ফর্মেশন নিয়ে আসেন। ৩-২-২-৩ ফর্মেশনের এই ট্যাক্টিক্সকে ডব্লিউ-এম ফর্মেশন নাম দেওয়া হয়।
Advertisement
অফসাইড নিয়ম পরিবর্তনের ফলে আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের জন্য অনসাইড থাকা সহজ হয়ে যায় এবং দলগুলো আরও বেশি খেলোয়াড় নিয়ে আক্রমণে উঠতে শুরু করে। এই বাড়তি আক্রমণাত্মক চাপ সামলাতে কোচরা রক্ষণভাগে একজন অতিরিক্ত ডিফেন্ডার যোগ করেন। সেখান থেকেই ডব্লিউ-এম ফর্মেশনের বিকাশ।‘ডব্লিউ-এম’ নামটি এসেছে মাঠে খেলোয়াড়দের অবস্থান থেকে। রক্ষণভাগের পাঁচজন খেলোয়াড়কে রেখা দিয়ে যুক্ত করলে সেটি ইংরেজি এম (M) অক্ষরের মতো দেখায়। অন্যদিকে, আক্রমণভাগের পাঁচজনকে যুক্ত করলে তৈরি হয় ডাব্লিউ (W) অক্ষরের মতো আকৃতি। এই দুই আকৃতির সমন্বয় থেকেই ফরমেশনটির নাম ডাব্লিউ-এম।
আধুনিক ফুটবলে হুবহু ডব্লিউ-এম ফরমেশন খুব কমই দেখা যায়। তবে এর মূল নীতিগুলো এখনও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
বর্তমান সময়ের অনেক শীর্ষ কোচ-যেমন পেপ গার্দিওলা আক্রমণের সময় অনেকটা একই ধরনের কাঠামো ব্যবহার করেন। উদাহরণ হিসেবে, তার দল আক্রমণে গেলে প্রায়ই ৩-২-৫ ‘বক্স’ আক্রমণাত্মক বিন্যাসে রূপ নেয়, যা মূলত ডাব্লিউ-এম ফরমেশনের আধুনিক রূপ বলেই ধরা হয়।
এরপর ১৯৩০ এর দশকে ফুটবল বিশ্ব আক্রমণাত্মক ফুটবল থেকে সরে এসে তার বিপরীত একটি কৌশলের দিকে এগোতে থাকে। মূল আধুনিক ফুটবলের কাউন্টার অ্যাটাক ধাঁচের খেলা এটি, যা ‘কাতেনাচ্চিও’ নামে অধিক পরিচিত।
‘কাতেনাচ্চিও’ শব্দটি ইতালীয় ভাষা থেকে এসেছে, যার আক্ষরিক অর্থ ‘দরজার খিল’ বা ‘তালা’। অর্থাৎ এমন একটি রক্ষণ, যা ভাঙা খুব কঠিন। কাতেনাচ্চিও হলো এমন একটি ফুটবল কৌশল, যেখানে দল প্রথমে নিজেদের রক্ষণকে দুর্ভেদ্য করে তোলে। এরপর প্রতিপক্ষ ভুল করলে বা সুযোগ তৈরি হলে দ্রুত আক্রমণে উঠে গোল করার চেষ্টা করে।
কাতেনাচ্চিওর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল লিবেরো বা সুইপার। এই সুইপার অন্য ডিফেন্ডারদের পেছনে থেকে প্রতিপক্ষের আক্রমণ পরিষ্কার করতেন। তাই অনেক সময় কাতেনাচ্চিওকে ‘১ + ৪’ বা ‘১ + ৩’ রক্ষণ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। অর্থাৎ ৩ জন বা ৪ জন ডিফেন্ডারের পেছনে একজন সুইপার থাকতেন।
বর্তমানে ক্লাসিক সুইপার প্রায় বিলুপ্ত। তাই আধুনিক দলগুলো কাতেনাচ্চিও-ধাঁচের ফুটবল খেললেও সাধারণত ৫-৩-২, ৫-৪-১, ৩-৫-২ বা ৪-৪-২ ফরমেশন ব্যবহার করে। কাতেনাচ্চিওর ভিত্তি গড়ে ওঠে ১৯৩০-এর দশকে, তবে এটি ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে ইতালি ফুটবলে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।
এর ভিত্তি স্থাপন করেন কার্ল রাপান তার ‘ভেরু’ কৌশলের মাধ্যমে। পরে নেরেও রোকো এটি ইতালিতে বিকশিত করেন এবং হেলেনিও হ্যারেরা ইন্টার মিলানে সফলভাবে প্রয়োগ করে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় করে তোলেন।
এরপর ফুটবলে উত্থান ঘটে পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের। ১৯৫৮ বিশ্বকাপজয়ী ব্রাজিল দলের ৪-২-৪ ফর্মেশন ছিল ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বিপ্লবী কৌশলগত ফরমেশন। এটি রক্ষণ ও আক্রমণের মধ্যে অসাধারণ ভারসাম্য তৈরি করে এবং আধুনিক ফুটবলের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে মনে করা হয়।
এই ফরমেশনে দলকে তিনটি স্পষ্ট ভাগে ভাগ করা হয়েছিল- চারজন ডিফেন্ডার, দুইজন মিডফিল্ডার এবং চারজন ফরোয়ার্ড। এমন বিন্যাসের কারণে রক্ষণ থেকে আক্রমণে খুব দ্রুত ট্রানজিশন সম্ভব হতো। একই সঙ্গে ফুল-ব্যাকরা সুযোগ পেলেই সামনে উঠে এসে আক্রমণে যোগ দিতেন, যা প্রতিপক্ষের রক্ষণে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করত।
৪-২-৪ ফরমেশন ব্রাজিলকে একদিকে যেমন শক্তিশালী রক্ষণ গড়তে সাহায্য করেছিল, অন্যদিকে চারজন ফরোয়ার্ডের উপস্থিতি আক্রমণকে করে তুলেছিল আরও গতিময় ও প্রাণঘাতি। ১৯৫৮ বিশ্বকাপে এই কৌশলের সফল প্রয়োগই ব্রাজিলকে তাদের প্রথম বিশ্বকাপ শিরোপা এনে দেয় এবং পরবর্তীতে বিশ্বের অনেক দল এই ফর্মেশন অনুসরণ করতে শুরু করে।
এরপর ১৯৭০-এর দশকে কিংবদন্তি কোচ রিনুস মিখেলস ‘টোটাল ফুটবল’ কৌশলের প্রবর্তন করেন। তিনি ডাচ ক্লাব আয়াক্স এবং নেদারল্যান্ডস জাতীয় দলকে কোচিং করানোর সময় এই কৌশলকে পরিপূর্ণতা দেন। তার হাত ধরেই টোটাল ফুটবল বিশ্ব ফুটবলে এক নতুন যুগের সূচনা করে।
টোটাল ফুটবল এমন একটি গতিশীল ফুটবল কৌশল, যেখানে গোলরক্ষক ছাড়া অন্য কোনো খেলোয়াড়ের নির্দিষ্ট অবস্থান স্থায়ী থাকে না। মাঠে কোনো খেলোয়াড় নিজের অবস্থান ছেড়ে আক্রমণ বা অন্য কোনো ভূমিকায় চলে গেলে, সঙ্গে সঙ্গে তার সতীর্থ সেই শূন্যস্থান পূরণ করেন। ফলে দলের গঠন সব সময় অক্ষুণ্ন থাকে।
খেলোয়াড়দের এই অবিরাম অবস্থান পরিবর্তন, চলাচল এবং পারস্পরিক সমন্বয় প্রতিপক্ষের জন্য দলটিকে অত্যন্ত অনিশ্চিত ও কঠিন প্রতিপক্ষ করে তোলে। টোটাল ফুটবলে প্রতিটি খেলোয়াড়কে একাধিক পজিশনে খেলার সক্ষমতা এবং উচ্চমানের টেকনিক্যাল দক্ষতা থাকতে হয়। এই টোটাল ফুটবলের ছাপ আধুনিক ফুটবলে এখনও অনেক সময় দেখা যায়।
টোটাল ফুটবলের ছত্রছায়ায়ই আস্তে আস্তে বেড়ে ওঠে আধুনিক ফুটবলের আরেকটি কৌশল-সেটি হলো তিকি-তাকা। তিকি-তাকা এমন একটি ফুটবল কৌশল, যার মূল ভিত্তি হলো ছোট ছোট ও দ্রুত পাস, খেলোয়াড়দের অবিরাম অবস্থান পরিবর্তন এবং বলের দখল ধরে রেখে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করা।
এই কৌশলে শারীরিক শক্তি বা দীর্ঘ পাসনির্ভর সরাসরি আক্রমণের বদলে খেলোয়াড়রা ছোট ছোট পাসের ত্রিভুজ বা পাসিং ট্রায়াঙ্গেল তৈরি করে একে অপরের সঙ্গে সমন্বয় রেখে খেলে।
একই সঙ্গে তারা ফাঁকা জায়গা কাজে লাগিয়ে ধৈর্য্যের সঙ্গে প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভাঙার চেষ্টা করে এবং পুরো ম্যাচের গতি ও ছন্দ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখে। তিকি-তাকা সফলভাবে খেলতে হলে খেলোয়াড়দের উচ্চমানের পাসিং দক্ষতা, বল নিয়ন্ত্রণ, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং অসাধারণ দলীয় সমন্বয় থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বলা হয়ে থাকে আধুনিক ফুটবলের তিকি-তাকা কৌশলের ভিত্তি গড়ে দেন ডাচ কিংবদন্তি ইয়োহান ক্রুয়েফ। আর স্প্যানিশ কোচ পেপ গার্দিওলা বার্সেলোনার দায়িত্বে থাকাকালীন এই কৌশলকে পরিপূর্ণতা দেন এবং বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় করে তোলেন।
১৯৯০-এর দশকে বার্সেলোনার কোচ থাকাকালে ইয়োহান ক্রুয়েফ ডাচ ‘টোটাল ফুটবল’ দর্শনের মূল ধারণাগুলো দলটিতে প্রয়োগ করেন। এই কৌশলে খেলোয়াড়দের প্রয়োজন অনুযায়ী একে অপরের অবস্থান বদল করতে হতো এবং ছোট ছোট পাসের মাধ্যমে বলের দখল ধরে রেখে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখতে হতো। এই দর্শনের ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তীতে তিকি-তাকা কৌশলের বিকাশ ঘটে।
ক্রুইফের সাবেক শিষ্য পেপ গার্দিওলা ২০০৮ সালে বার্সেলোনার কোচের দায়িত্ব নেন। তিনি ছোট পাসভিত্তিক এই খেলার ধরনকে আরও সুসংগঠিত ও নিখুঁত কৌশলে রূপ দেন। গার্দিওলার অধীনে তিকি-তাকা খেলেই বার্সেলোনা অসংখ্য শিরোপা জয় করে এবং আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সেরা দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
এমনকি ২০১০ বিশ্বকাপে স্পেনের বিশ্বকাপজয়ী দলের কোচ ভিসেন্তে দেল বস্কও এই তিকি-তাকা ফুটবল খেলিয়েই স্পেনকে বিশ্বকাপ জিতিয়েছিলেন। অবশ্য স্পেনের সেই বিশ্বকাপ দলের সিংহভাগ খেলোয়াড়ই ছিলেন বার্সেলোনার। তাই ক্লাবের ফুটবলের প্রভাব সেই বিশ্বকাপে স্পেনের জাতীয় দলে খুবই স্পষ্ট ছিল।
তিকি-তাকা ছাড়া আরও একটি ট্যাক্টিক্স আছে, যেটা ক্রুয়েফের আবিষ্কার হলেও জনপ্রিয় করে তোলেন গার্দিওলা। সেটা হচ্ছে ইনভার্টেড ফুল-ব্যাক। ১৯৯০ এর দশকের শুরুতে ক্রুয়েফ বার্সেলোনায় থাকাকালীন এই ধারণা প্রথম ফুটবলে নিয়ে আসেন, যেটি পরে গার্দিওলার হাত ধরে পূর্ণতা পায়।
ইনভার্টেড ফুল-ব্যাক এমন একজন ডিফেন্ডার, যিনি সাধারণত মাঠের দুই প্রান্তে ফুল-ব্যাক হিসেবে খেলেন। তবে দল বলের দখল পেলে তিনি উইং ধরে সামনে না উঠে মাঠের মাঝখানে চলে আসেন এবং অতিরিক্ত একজন মিডফিল্ডারের মতো ভূমিকা পালন করেন।
এর ফলে মাঝমাঠে সংখ্যাগত সুবিধা তৈরি হয়, বলের দখল ধরে রাখা সহজ হয় এবং আক্রমণ গড়ে তোলার জন্য আরও বেশি পাসের বিকল্প তৈরি হয়। একই সঙ্গে বল হারালে এই খেলোয়াড় দ্রুত রক্ষণেও ফিরতে পারেন। আধুনিক ফুটবলে ইনভার্টেড ফুল-ব্যাক কৌশল পজেশন-নির্ভর ফুটবলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।
গার্দিওলা বায়ার্ন মিউনিখের কোচ থাকাকালীন ফিলিপ লাম এবং জশুয়া কিমিখ এবং ম্যানচেস্টার সিটিতে থাকাকালীন ওলেক্সান্দর জিংচেঙ্কো এবং হোয়াও ক্যান্সেলোকে ইনভার্টেড ফুল-ব্যাক হিসেবে খেলিয়েছেন।
তবে গার্দিওলা এতেও থেমে থাকেননি। ফলস নাইনের ধারণাও তিনিই জনপ্রিয় করে তোলেন। ফলস নাইন মূলত এমন একজন খেলোয়াড়, যিনি নামমাত্র স্ট্রাইকার হিসেবে খেলেন, কিন্তু প্রচলিত স্ট্রাইকারদের মতো সব সময় প্রতিপক্ষের বক্সের কাছাকাছি অবস্থান করেন না। বরং তিনি মাঝেমধ্যেই নিচে নেমে মিডফিল্ডে চলে আসেন এবং সেখান থেকে খেলা তৈরি করেন।
স্ট্রাইকারের এই নিচে নেমে আসায় প্রতিপক্ষের সেন্টার-ব্যাকরা তাকে অনুসরণ করতে বাধ্য হয়। ফলে রক্ষণভাগে ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়, যা উইঙ্গার বা অন্য আক্রমণভাগের খেলোয়াড়রা কাজে লাগিয়ে গোলের সুযোগ তৈরি করতে পারেন।
অবশ্য স্ট্রাইকারকে নিচে নেমে খেলার ধারণা প্রথম দেখা যায় ১৯৩০-এর দশকে অস্ট্রিয়া ও উরুগুয়ের জাতীয় দলে। তবে আধুনিক ফুটবলে ফলস নাইন কৌশলকে জনপ্রিয় ও সফল করে তোলার মূল কারিগর পেপ গার্দিওলাই।
২০০৮ সালে বার্সেলোনার কোচ হওয়ার পর গার্দিওলা লিওনেল মেসিকে এই ভূমিকায় খেলান। মেসির বারবার নিচে নেমে এসে বল গ্রহণ, খেলা তৈরি এবং প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের অবস্থান ভেঙে দেওয়ার কৌশল আধুনিক ফুটবলে নতুন মাত্রা যোগ করে। এরপর ফলস নাইন বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম প্রভাবশালী আক্রমণাত্মক কৌশলে পরিণত হয়।
প্রায় একই সময়ে গেগেনপ্রেসিং ফুটবলে জনপ্রিয়তা পেতে থাকে। গেগেনপ্রেসিং বা কাউন্টার-প্রেসিং হলো এমন একটি ফুটবল কৌশল, যেখানে একজন খেলোয়াড় বল হারানোর সঙ্গে সঙ্গেই রক্ষণে ফিরে না গিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করে ৬ সেকেন্ডের মধ্যে বল পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করে।
কোনো দল বল হারানোর পর প্রতিপক্ষ সাধারণত তখনও পুরোপুরি আক্রমণ সাজিয়ে উঠতে পারে না। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বলের সবচেয়ে কাছের খেলোয়াড়রা সঙ্গে সঙ্গে প্রতিপক্ষকে চেপে ধরেন। তাদের লক্ষ্য থাকে দ্রুত বল কেড়ে নেওয়া অথবা প্রতিপক্ষকে ভুল পাস বা ভুল সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করা। এতে প্রতিপক্ষের আক্রমণ শুরুর আগেই বল পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়।
গেগেনপ্রেসিংয়ের ধারণা জার্মান কোচ রালফ রাংনিক-এর হাত ধরে আধুনিক ফুটবলে সুসংগঠিত রূপ পায়। এজন্য তাকে প্রায়ই ‘গেগেনপ্রেসিংয়ের জনক’ বলা হয়। রালফ রাংনিক এবারের বিশ্বকাপে অস্ট্রিয়ার কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
তবে এই কৌশলকে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় করে তোলেন ইয়ুর্গেন ক্লপ। যদিও তিনি এর উদ্ভাবক নন, কিন্তু প্রথমে বরুসিয়া ডর্টমুন্ড এবং পরে লিভারপুলের কোচ হিসেবে তিনিই গেগেনপ্রেসিংকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যান। ক্লপের দর্শন ছিল, প্রতিপক্ষের গোলপোস্টের কাছাকাছি বল পুনরুদ্ধার করাই সবচেয়ে কার্যকর প্লে-মেকিং। এই কৌশল ব্যবহার করেই তার দলগুলো দ্রুত আক্রমণ গড়ে তুলে অসংখ্য গোল ও শিরোপা অর্জন করেছে।
ফুটবল প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে। আজ যে কৌশল প্রতিপক্ষকে অবাক করে দিচ্ছে, কয়েক বছর পর সেটিই হয়ে উঠছে স্বাভাবিক। আবার নতুন কোনো কোচ, নতুন কোনো ধারণা কিংবা নতুন প্রজন্মের ফুটবলার জন্ম দিচ্ছেন আরেকটি ট্যাকটিক্যাল বিপ্লবের।
তাই ফুটবলের ইতিহাস শুধু ট্রফি জয়ের ইতিহাস নয়, এটি নতুন চিন্তা আর সাহসী উদ্ভাবনেরও ইতিহাস। সময়ের সঙ্গে বদলে যাওয়া এই খেলায় পরবর্তী বিপ্লব কোথা থেকে আসবে, সেটাই এখন দেখার অপেক্ষা।
আরএএইচইউএল/আইএইচএস/