মেসির গোলে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকেই বিরতিতে গেলো বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। মিয়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের রাউন্ড অব ৩২-এর ম্যাচে প্রথমার্ধজুড়ে বলের দখল ও খেলার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কাছে রাখলেও শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলা কেপ ভার্দের রক্ষণ ভাঙতে আর্জেন্টিনাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে ২৯ মিনিট পর্যন্ত। শেষ পর্যন্ত সেই অচলাবস্থা ভাঙেন অধিনায়ক লিওনেল মেসি, আর তাতেই গড়ে ওঠে একাধিক নতুন রেকর্ড।
Advertisement
ম্যাচের শুরু থেকেই কেপ ভার্দে রক্ষণে অসাধারণ শৃঙ্খলা দেখায়। নিজেদের বিশ্বকাপ অভিষেকেই নকআউট পর্বে জায়গা করে নেওয়া আফ্রিকার দলটি প্রথম ১৫ মিনিটে আর্জেন্টিনার আক্রমণকে কার্যত নিষ্ক্রিয় করে রাখে। এমনকি ম্যাচের প্রথম উল্লেখযোগ্য সুযোগটিও আসে কেপ ভার্দের পক্ষে। সপ্তম মিনিটে রায়ান মেন্ডেসের কাট-ইন থেকে নেওয়া শট নাহুয়েল মোলিনার গায়ে লেগে এমিলিয়ানো মার্তিনেজের হাতে চলে যায়।
আর্জেন্টিনা প্রথমদিকে নিজেদের ছন্দ খুঁজে পাচ্ছিল না। চলতি বিশ্বকাপে প্রথম ১০ মিনিটে আলবিসেলেস্তেদের এটি ছিল মাত্র দ্বিতীয় শটের ম্যাচ। প্রথমদিকে মেসিকেও খেলায় খুব বেশি সম্পৃক্ত করতে পারেনি লিওনেল স্কালোনির দল। ১৫ মিনিটে অবশ্য রদ্রিগো ডি পলের পাস থেকে থিয়াগো আলমাদার চমৎকার কাটব্যাক পেয়ে সুযোগ তৈরি করেন মেসি। দুই ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে নেওয়ার পর তার শট অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।
১৭ মিনিটে জোভানে কাবরালের ফাউলে বক্সের ঠিক বাইরে ফ্রি-কিক পায় আর্জেন্টিনা। স্বাভাবিকভাবেই দায়িত্ব নেন মেসি। তবে তার বাঁকানো শট নিরাপদেই ধরে ফেলেন ৪০ বছর বয়সী অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ভোজিনহা।
Advertisement
এই ম্যাচ দিয়ে তিনি চলতি বিশ্বকাপে নকআউট পর্বে খেলা ৪০ বছরের বেশি বয়সী পঞ্চম ফুটবলার হিসেবে নাম লেখান। এর আগে এই তালিকায় ছিলেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, লুকা মদরিচ, এদিন জেকো ও মানুয়েল নয়্যার। ২০২৬ সালের আগে বিশ্বকাপ ইতিহাসে মাত্র দুইজন ৪০ ঊর্ধ্ব খেলোয়াড় নকআউটে খেলেছিলেন- দিনো জফ (১৯৮২) ও পিটার শিলটন (১৯৯০)।
প্রথমার্ধের মাঝামাঝি সময়ে আর্জেন্টিনা ক্রমশ ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ আরও দৃঢ়ভাবে নিজেদের হাতে নেয়। ২৬ মিনিটে ডি পলের ক্রসে লওতারো মার্তিনেজকে খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা ব্যর্থ হলেও আক্রমণের চাপ অব্যাহত রাখে তারা।
অবশেষে ২৯ মিনিটে আসে কাঙ্ক্ষিত গোল। লিসান্দ্রো মার্তিনেজের নিখুঁত লম্বা পাস ধরে কেপ ভার্দের রক্ষণভাগ ভেঙে দৌড়ে যান মেসি। অসাধারণ প্রথম টাচে বল নিয়ন্ত্রণে এনে দ্বিতীয় স্পর্শ ছাড়াই গোলরক্ষক ভোজিনহার পাশ কাটিয়ে বল জড়িয়ে দেন জালে। এই গোলে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা।
এই গোলের মাধ্যমে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে নতুন ইতিহাসও গড়েন মেসি। এটি ছিল নকআউটে তার ১২তম সরাসরি গোল-অবদান (৬ গোল ও ৬ অ্যাসিস্ট), যা ১৯৬৬ সালের পর থেকে সর্বোচ্চ। তিনি এই কীর্তিতে পেছনে ফেলেছেন ব্রাজিল কিংবদন্তি পেলে এবং ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপেকে।
Advertisement
শুধু তাই নয়, বিশ্বকাপে এটি মেসির ২০তম গোল এবং টানা অষ্টম বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল করার বিরল কৃতিত্বও অর্জন করেন তিনি। চলতি আসরে এটি তার সপ্তম গোল।
গোল হজমের পর কেপ ভার্দে ম্যাচে ফেরার চেষ্টা চালায়। ৩২ মিনিটে সিডনি কাবরালের দূরপাল্লার শট অনেক বাইরে দিয়ে চলে যায়। এরপর ৪২ মিনিটে জোভানে কাবরাল দারুণ টার্নে মোলিনাকে কাটিয়ে উঠলেও আর্জেন্টিনার রক্ষণ দ্রুত গুছিয়ে গিয়ে সেই আক্রমণ নস্যাৎ করে দেয়।
প্রথমার্ধের শেষ দিকে আরও কয়েকটি সুযোগ তৈরি করে আর্জেন্টিনা। ৪৫ মিনিটে এনজো ফার্নান্দেজের প্রথম স্পর্শের জোরালো শট দারুণ দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন ভোজিনহা। যোগ করা সময়েও আর্জেন্টিনা বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করে, তবে ব্যবধান আর বাড়াতে পারেনি।
প্রথমার্ধের পরিসংখ্যানও আর্জেন্টিনার আধিপত্যেরই প্রতিফলন। চলতি বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার মোট ৩৬টি শটের মধ্যে ১৭টিই এসেছে মেসির পা থেকে, অর্থাৎ দলের মোট শটের ৪৭ শতাংশই নিয়েছেন অধিনায়ক। অন্যদিকে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ৬৩ নম্বরে থাকা কেপ ভার্দে নিজেদের বিশ্বকাপ অভিষেকেই নকআউটে ওঠা সর্বনিম্ন র্যাঙ্কিংধারী দল হিসেবে ইতিহাস গড়েছে এবং প্রথমার্ধেও তারা দেখিয়েছে কেন এই পর্যায়ে পৌঁছেছে।
বিরতিতে তাই ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থাকলেও ম্যাচ এখনো পুরোপুরি নিজেদের করে নিতে পারেনি আর্জেন্টিনা। তবে মেসির রেকর্ডগড়া গোল এবং পুরো প্রথমার্ধে বলের ওপর নিয়ন্ত্রণ স্কালোনির দলকে দ্বিতীয়ার্ধের আগে আত্মবিশ্বাসী অবস্থানেই রেখেছে।
আইএইচএস/