গত কয়েক বছরে দেশে বেড়েছে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে রোগীর মৃত্যুঝুঁকি। এজন্য ডেঙ্গুর চিকিৎসায় জাতীয় গাইডলাইন না মানার প্রবণতা ও অপ্রয়োজনীয় ওষুধের ব্যবহারকে দায়ী করছেন গবেষকরা।
Advertisement
২০২৩ সালে ‘বাংলাদেশ জার্নাল অব মেডিসিন’-এ ‘বাংলাদেশে ডেঙ্গুজনিত মৃত্যুর পর্যালোচনা: ২০২৩ সালের প্রাদুর্ভাবের অন্তর্বর্তীকালীন বিশ্লেষণ’ শীর্ষক একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। ওই বছর ১৫টি হাসপাতালের ৯৪টি মৃত্যুর কেস বিশ্লেষণ করা হয় গবেষণায়।
গবেষণায় দেখা যায়, মৃত রোগীদের মধ্যে মাত্র ৩৫ দশমিক ১ শতাংশ রোগী জাতীয় গাইডলাইন অনুযায়ী আইভি ফ্লুইড বা স্যালাইন পেয়েছেন। গাইডলাইন অনুসরণ না করার শিকার হয়েছেন প্রায় ৪৭ দশমিক ৯ শতাংশ রোগী।
আরও পড়ুন ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে এখনই যে কয়েকটি কাজ করা জরুরিএছাড়া চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই ২৮ শতাংশ ক্ষেত্রে স্টেরয়েড এবং ৩৯ দশমিক ৮ শতাংশ ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার দেখা গেছে, যা ডেঙ্গু চিকিৎসায় মোটেও কাম্য নয়।
Advertisement
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোম (৩৬ শতাংশ মৃত্যু) ও এক্সপ্যান্ডেড ডেঙ্গু সিন্ড্রোমের (২৩ শতাংশ মৃত্যু) মতো জটিল অবস্থায় সঠিক পর্যবেক্ষণের অভাবই প্রাণহানি ঘটাচ্ছে।
চিকিৎসাসেবার এটি একটি বড় ঘাটতি। আমাদের প্রশিক্ষিত চিকিৎসকদের সংশ্লিষ্ট জায়গায় রাখা যায় না। ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের অন্যত্র বদলি করে নতুন ও অপ্রশিক্ষিত জনবলকে ডেঙ্গু রোগী সামলানোর দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে।-সোসাইটি অব মেডিসিনের আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. মনির-উজ-জামান
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একজন জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাগো নিউজকে বলেন, ‘অনেক সময় ডেঙ্গু ম্যানেজমেন্টের প্রশিক্ষণ পাওয়া দক্ষ জনবলকে অন্যত্র বদলি করা হয়। ফলে নতুন ও অপ্রশিক্ষিত জনবল যখন রোগীর দায়িত্ব পায়, তখন গাইডলাইন মেনে চিকিৎসা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।’
বিষয়টি স্বীকার করেন সোসাইটি অব মেডিসিনের আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. মনির-উজ-জামান। তিনি বলেন, ‘চিকিৎসাসেবার এটি একটি বড় ঘাটতি। আমাদের প্রশিক্ষিত চিকিৎসকদের সংশ্লিষ্ট জায়গায় রাখা যায় না। ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের অন্যত্র বদলি করে নতুন ও অপ্রশিক্ষিত জনবলকে ডেঙ্গু রোগী সামলানোর দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে।’
Advertisement
চিকিৎসা খাতের এ সংকট কাটাতে অবিলম্বে প্রতিটি হাসপাতালে ‘ফিভার ক্লিনিক’ স্থাপন এবং চিকিৎসকদের জন্য কঠোর তদারকির দাবি তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা।
ডেঙ্গুতে মৃত্যুর যে বিষয়টি সামনে আসছে, তা চিকিৎসা গাইডলাইন না মানার কারণে। ডেথ রিভিউতে আমরা দেখেছি, রোগীরা ঠিকমতো ফ্লুইড পায়নি। ২৮ শতাংশ ক্ষেত্রে স্টেরয়েড ও ৩৯ দশমিক ৮ শতাংশ ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার দেখা গেছে। এগুলো ডেঙ্গু চিকিৎসায় মোটেও কাম্য নয়।-মেডিসিন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক শাহাবুল হুদা
মেডিসিন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক শাহাবুল হুদা ডেঙ্গু চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট জাতীয় গাইডলাইন তৈরি, প্রতিটি হাসপাতালে ‘ফিভার ক্লিনিক’ স্থাপন এবং ২০২৩ সালের ডেথ রিভিউতে উঠে আসা অব্যবস্থাপনাগুলো সমাধান করে দ্রুত প্রস্তুতি নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘ডেঙ্গুতে মৃত্যুর যে বিষয়টি সামনে আসছে, তা চিকিৎসা গাইডলাইন না মানার কারণে। ডেথ রিভিউতে আমরা দেখেছি, রোগীরা ঠিকমতো ফ্লুইড পায়নি। ২৮ শতাংশ ক্ষেত্রে স্টেরয়েড ও ৩৯ দশমিক ৮ শতাংশ ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার দেখা গেছে। এগুলো ডেঙ্গু চিকিৎসায় মোটেও কাম্য নয়। সেজন্য গাইডলাইন ফলো করা জরুরি।’
আরও পড়ুন ডেঙ্গু জ্বর থেকে দ্রুত সেরে উঠতে যা করা জরুরিএই ব্যত্যয়গুলো হওয়ার পেছনে মূল কারণ প্রশিক্ষিত জনবলের ঘাটতি বলে মনে করেন তিনি।
শাহাবুল হুদা বলেন, ‘আমরা যাকে এবার ডেঙ্গুর জন্য প্রশিক্ষণ দিলাম, দেখা যাবে আগামীবার ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর ম্যানেজমেন্টে তিনি থাকবেন না। নতুন কেউ ম্যানেজ করবে। তাতে একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি হবে। এজন্য অপরিকল্পিত পদায়ন বন্ধ করতে হবে।’
কী আছে ডেঙ্গু মোকাবিলায় নতুন গাইডলাইনে?ডেঙ্গু রোগের চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনায় বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ‘ন্যাশনাল গাইডলাইন ফর ক্লিনিক্যাল ম্যানেজমেন্ট অব ডেঙ্গু (পঞ্চম সংস্করণ, ২০২৫)’ প্রকাশ করেছে। ১৩৩ পাতার এই বিস্তৃত নির্দেশিকায় ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যুহার কমিয়ে আনার লক্ষ্যে রোগ নির্ণয় থেকে শুরু করে হাসপাতাল পর্যন্ত প্রতিটি স্তরের চিকিৎসাসেবার মানদণ্ড নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।
নির্দেশিকা অনুযায়ী, ডেঙ্গুর গতি-প্রকৃতি তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা হয়েছে- ফেব্রাইল (জ্বর), ক্রিটিক্যাল (লিক হওয়ার পর্যায়) এবং কনভালসেন্ট (সুস্থ হওয়ার পর্যায়)। এর মধ্যে ‘ক্রিটিক্যাল ফেজ’ বা জ্বরের তৃতীয় থেকে চতুর্থ দিনে প্লাজমা লিকেজের ফলে শক হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে।
এ সময় রোগীকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সঠিক মাত্রার চেয়ে অতিরিক্ত তরল (ফ্লুইড) শরীরে প্রবেশ করালে ফুসফুসে পানি জমে বা ‘ফ্লুইড ওভারলোড’ হতে পারে, যা রোগীর জন্য মারাত্মক হতে পারে। তাই গাইডলাইনে তরল ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের প্রস্তুতি নিতে হবেনতুন গাইডলাইনে প্যারাসিটামল ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে (দৈনিক সর্বোচ্চ ৩ গ্রাম)। তবে অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ডেঙ্গু রোগীর ক্ষেত্রে কোনোভাবেই এনএসএআইডি (NSAIDs) জাতীয় ব্যথানাশক বা স্টেরয়েড ব্যবহার করা যাবে না। ভুল ওষুধ প্রয়োগ ডেঙ্গু রোগীদের রক্তপাত ও মৃত্যুর ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
রোগ শনাক্তের ক্ষেত্রে সংক্রমণের প্রথম পাঁচদিনের মধ্যে সিবিসি (CBC), হেমাটোক্রিট (Hct) এবং এনএস১ (NS1) অ্যান্টিজেন পরীক্ষার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাঁচদিন পার হওয়ার পর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে আইজিএম/আইজিজি (IgM/IgG) অ্যান্টিবডি পরীক্ষার ওপর। ল্যাবে লিউকোপেনিয়া, প্লাটিলেট কমে যাওয়া এবং হেমাটোক্রিটের মাত্রা ২০ শতাংশ বাড়ার মতো লক্ষণগুলোকে ডেঙ্গু জটিলতার গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
গাইডলাইনটিতে কেবল হাসপাতাল নয়, বরং জোর দেওয়া হয়েছে কমিউনিটি পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধির ওপরও। মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা, বাড়ির চারপাশ পরিষ্কার রাখা এবং ব্যক্তিগত সুরক্ষার জন্য নিয়মিত মশারির ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া শিশু ও গর্ভবতী রোগীদের ক্ষেত্রে পৃথক ও বিশেষায়িত ব্যবস্থাপনার নির্দেশনা রয়েছে গাইডলাইনে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্টরা জানান, এই নতুন গাইডলাইন সারাদেশে ডেঙ্গু চিকিৎসায় একটি সমন্বিত ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে। চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট সবাইকে এই নির্দেশিকা অনুসরণ করে রোগীদের সেবা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এসইউজে/এএসএ/এমএফএ