ফিচার

কাঁঠাল নিয়ে পৃথিবীর যত মজার তথ্য, যা অনেকেই জানেন না

গ্রীষ্মের দুপুর, উঠোনজুড়ে ছায়া ফেলে দাঁড়িয়ে থাকা কাঁঠালগাছ, আর তার গা ভরা সবুজ কাঁটাওয়ালা বিশাল ফল-এই দৃশ্য বাঙালির কাছে খুবই পরিচিত। বাংলাদেশের জাতীয় ফল কাঁঠালকে আমরা প্রতিদিনের জীবনের অংশ হিসেবে দেখি। কিন্তু এই ফলকে ঘিরে রয়েছে এমন অনেক বিস্ময়কর তথ্য, যা অনেকেরই অজানা।

Advertisement

কেউ কাঁঠালকে ভালোবাসেন তার মিষ্টি স্বাদের জন্য, কেউ আবার দূরে থাকেন এর তীব্র গন্ধের কারণে। অথচ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই কাঁঠালই এখন স্বাস্থ্যকর খাদ্য, পরিবেশবান্ধব বিকল্প এবং আন্তর্জাতিক রান্নার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। কাঁঠাল দিবস উপলক্ষে চলুন জেনে নেওয়া যাক পৃথিবীর অন্যতম বিস্ময়কর এই ফল সম্পর্কে কিছু চমকপ্রদ তথ্য।

আরও পড়ুন ডেঙ্গু চিকিৎসায় পেঁপে পাতার রস, বিশ্বাস না বিজ্ঞান? বিশ্বের সবচেয়ে বড় গাছে জন্মানো ফল

কাঁঠালের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় ভোজ্য ফল, যা সরাসরি গাছের গায়ে জন্মায়। একটি পূর্ণবয়স্ক কাঁঠালের ওজন সাধারণত ৫ থেকে ২০ কেজি হলেও অনুকূল পরিবেশে ৩০ থেকে ৫০ কেজি পর্যন্ত হতে পারে। বিরল ক্ষেত্রে এর চেয়েও বড় কাঁঠালের খবর পাওয়া গেছে।

মজার বিষয় হলো, এত ভারী হওয়া সত্ত্বেও কাঁঠাল ডালের আগায় নয়, বরং গাছের মোটা কাণ্ড কিংবা প্রধান শাখায় ধরে। এতে ফলের ওজন সহজে বহন করতে পারে গাছ।

Advertisement

কাঁঠালের জন্ম দক্ষিণ এশিয়ায়, কিন্তু এখন বিশ্বজুড়ে

অনেকেই ভাবেন কাঁঠাল শুধু বাংলাদেশ, ভারত বা দক্ষিণ এশিয়াতেই জন্মায়। বাস্তবে এখন এটি বিশ্বের বহু উষ্ণমণ্ডলীয় দেশে চাষ হয়। বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, ব্রাজিল, কেনিয়া, উগান্ডা, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা ও হাওয়াইয়েও কাঁঠাল চাষ করা হয়। আবহাওয়া অনুকূল হলে একটি কাঁঠালগাছ কয়েক দশক ধরে ফল দিতে পারে।

আরও পড়ুন গরমে কাঁঠাল খাওয়ার আগে যা জানা জরুরি একটি ফলেই শত শত কোয়া

একটি কাঁঠাল কাটলে অনেক সময় ১০০ থেকে ৫০০টিরও বেশি কোয়া পাওয়া যায়। প্রতিটি কোয়ার ভেতরে থাকে একটি করে বিচি। অর্থাৎ একটি মাত্র ফল থেকেই শত শত নতুন গাছ জন্মানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়।

শুধু কোয়াই নয়, পুরো ফলই কাজে লাগে পাকা কোয়া খাওয়া হয় ফল হিসেবে। কাঁচা কাঁঠাল দিয়ে রান্না হয় তরকারি। বিচি ভর্তা, ভাজি, ডাল কিংবা ভুনায় ব্যবহৃত হয়। খোসা পশুখাদ্য কিংবা জৈব সারের উপাদান হতে পারে। কাঁঠালগাছের কাঠ দিয়ে আসবাবপত্র, দরজা-জানালা ও বাদ্যযন্ত্র তৈরি করা হয়। গাছের আঠা অতীতে বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হতো। আরও পড়ুন গরমে শরীর ঠান্ডা রাখে যেসব খাবার নিরামিষভোজীদের কাছে ‘সবজি মাংস’

বিশ্বজুড়ে কাঁচা কাঁঠালের জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ছে। এর আঁশযুক্ত গঠন রান্নার পর অনেকটা মাংসের মতো অনুভূতি দেয়। এই কারণে ইউরোপ ও আমেরিকার বহু রেস্তোরাঁয় কাঁচা কাঁঠাল দিয়ে তৈরি হয়- বার্গার, টাকো, স্যান্ডউইচ, কারি, পিৎজা ও বারবিকিউ। এ কারণেই কাঁচা কাঁঠালকে অনেকেই ‘প্ল্যান্ট-বেসড মিট’ বা উদ্ভিদভিত্তিক মাংসের বিকল্প হিসেবে চেনেন।

গন্ধই কাঁঠালের সবচেয়ে বড় রহস্য

কাঁঠালের গন্ধ নিয়ে মানুষের মতভেদ চিরকালীন। কারও কাছে এটি অসাধারণ মিষ্টি ও আকর্ষণীয়, আবার কারও কাছে বেশ তীব্র।

Advertisement

বিজ্ঞানীরা মনে করেন, কাঁঠালের সুবাস তৈরি হয় বিভিন্ন প্রাকৃতিক উদ্বায়ী রাসায়নিক যৌগের মিশ্রণে। মানুষের ঘ্রাণ-অনুভূতি ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার পার্থক্যের কারণেই একই গন্ধ কারও কাছে সুখকর, কারও কাছে বিরক্তিকর মনে হতে পারে।

আরও পড়ুন খালি পেটে খাওয়া যাবে না যেসব ফল পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ

কাঁঠালে রয়েছে- খাদ্যআঁশ, ভিটামিন সি, পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, ভিটামিন বি-৬ ও বিভিন্ন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। এগুলো রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে, হজমে সহায়তা করতে এবং শরীরের নানা স্বাভাবিক কার্যক্রমে ভূমিকা রাখে। তবে এতে প্রাকৃতিক শর্করার পরিমাণও তুলনামূলক বেশি, তাই পরিমিত পরিমাণে খাওয়াই ভালো।

একটি গাছ, বহু বছরের সঙ্গী

সঠিক পরিচর্যা পেলে একটি কাঁঠালগাছ ৫০ থেকে ১০০ বছর বা তারও বেশি সময় বেঁচে থাকতে পারে।অনেক গ্রামীণ পরিবারে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একই কাঁঠালগাছ ফল দিয়ে আসছে। তাই অনেকের কাছে এটি শুধু ফলের গাছ নয়, পারিবারিক ঐতিহ্যের অংশ।

কাঁঠালের কাঠেরও আছে কদর

কাঁঠালগাছের কাঠ টেকসই, সহজে পোকা ধরে না এবং সোনালি-হলুদ রঙের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত।এ কাঠ দিয়ে তৈরি হয়- আসবাবপত্র, আলমারি, দরজা, জানালা, বাদ্যযন্ত্র ও খোদাইয়ের কাজ। দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ধর্মীয় স্থাপনা ও ঐতিহ্যবাহী শিল্পকর্মেও কাঁঠালের কাঠ ব্যবহারের ইতিহাস রয়েছে।

আরও পড়ুন লটকনের পুষ্টিগুণ অক্ষুণ্ণ রেখে সংরক্ষণ করবেন যেভাবে শুধু মানুষ নয়, বন্য প্রাণীরও প্রিয়

বানর, কাঠবিড়ালি, শিয়াল, বাদুড় এবং বিভিন্ন প্রজাতির পাখি কাঁঠাল খেতে পছন্দ করে। পাকা ফলের সুগন্ধ দূর থেকেও প্রাণীদের আকৃষ্ট করে। ফলে কাঁঠালগাছ স্থানীয় জীববৈচিত্র্য রক্ষায়ও ভূমিকা রাখে।

কাঁঠাল রপ্তানির বাজারও বাড়ছে

বাংলাদেশ, ভারত, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ড থেকে প্রতিবছর তাজা কাঁঠাল, হিমায়িত কোয়া, কাঁঠালের চিপস, বিচি এবং প্রক্রিয়াজাত বিভিন্ন পণ্য বিশ্বের নানা দেশে রপ্তানি করা হয়।

বিশেষ করে স্বাস্থ্যসচেতন ভোক্তাদের মধ্যে উদ্ভিদভিত্তিক খাদ্যের চাহিদা বাড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁঠালের সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

আরও পড়ুন কাঁচা কাঁঠাল দিয়ে বার্গারের পেটি বানাবেন যেভাবে কাঁঠাল নিয়ে কিছু ঝটপট তথ্য বাংলাদেশের জাতীয় ফল কাঁঠাল। এটি তুঁত (মালবেরি) পরিবারের সদস্য। কাঁঠাল গাছের বৈজ্ঞানিক নাম আর্টোকার্পাস হেটেরোফিলাস। একটি পূর্ণবয়স্ক গাছে বছরে কয়েক ডজন থেকে শতাধিক ফল ধরতে পারে। কাঁচা ও পাকা-দুই অবস্থাতেই কাঁঠাল খাওয়া যায়। কাঁঠালের বিচিও অত্যন্ত পুষ্টিকর এবং রান্নায় বহুল ব্যবহৃত।

কাঁঠালকে আমরা প্রায়ই শুধু একটি মৌসুমি ফল হিসেবে দেখি। অথচ এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কৃষি, অর্থনীতি, পরিবেশ, পুষ্টি, সংস্কৃতি এবং বিশ্বজুড়ে বদলে যাওয়া খাদ্যাভ্যাসের গল্প। বিশ্বের সবচেয়ে বড় গাছে জন্মানো ফল হওয়া থেকে শুরু করে নিরামিষভোজীদের পাতে মাংসের বিকল্প হিসেবে জায়গা করে নেওয়া-কাঁঠালের যাত্রা সত্যিই বিস্ময়কর।

আরও পড়ুন কাঁঠালের পিঠার রেসিপি

জাতীয় ফল হিসেবে কাঁঠাল শুধু আমাদের গর্বের প্রতীক নয়; এটি এমন একটি প্রাকৃতিক সম্পদ, যার সঠিক ব্যবহার, সংরক্ষণ এবং মূল্যায়ন বাংলাদেশের কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

জেএস/