বর্ষা এলেই বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে শুরু করে। প্রতিদিন আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, আত্মীয়-স্বজন কিংবা প্রতিবেশীদের কাছ থেকেও নানা ধরনের পরামর্শ ভেসে আসে।
Advertisement
কেউ বলেন, ‘প্লাটিলেট ১ লাখের নিচে নামলেই রক্ত দিতে হবে’, কেউ বলেন, ‘পেঁপে পাতার রস খেলেই প্লাটিলেট বেড়ে যায়’, আবার কেউ মনে করেন, ‘জ্বর কমে গেলেই ডেঙ্গু সেরে গেছে।’
এসব কথার কিছু হয়তো অভিজ্ঞতা থেকে এসেছে, কিন্তু অনেকগুলোরই বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বরং ভুল ধারণার কারণে অনেক রোগী সময়মতো চিকিৎসা নেন না, আবার কেউ অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিয়ে ঝুঁকিতে পড়েন। চলুন, ডেঙ্গু নিয়ে প্রচলিত ১০টি ভুল ধারণা এবং সঠিক তথ্য জেনে নেওয়া যাক।
আরও পড়ুন প্রতিদিন ১০ মিনিটের অভ্যাসেই কমতে পারে ডেঙ্গুর ঝুঁকি প্লাটিলেট কমলেই রোগী মারাত্মক ঝুঁকিতেএটি সবচেয়ে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলোর একটি। বাস্তবে ডেঙ্গু রোগীর অবস্থা মূল্যায়নে শুধু প্লাটিলেটের সংখ্যা নয়, রোগীর সামগ্রিক শারীরিক অবস্থা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অনেক রোগীর প্লাটিলেট ৫০ হাজারের নিচে নেমে গেলেও তিনি স্থিতিশীল থাকতে পারেন। আবার কারও প্লাটিলেট তুলনামূলক বেশি থাকলেও গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে।
Advertisement
চিকিৎসকেরা তাই শুধু প্লাটিলেট নয়, রক্তচাপ, পালস, রক্তক্ষরণের লক্ষণ, প্রস্রাবের পরিমাণ, শ্বাসকষ্ট এবং অন্যান্য ক্লিনিক্যাল লক্ষণও বিবেচনা করেন।
প্লাটিলেট কমলেই রক্ত বা প্লাটিলেট দিতে হবেএটিও সম্পূর্ণ সঠিক নয়। ডেঙ্গুতে প্লাটিলেট কমে যাওয়া স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া। কিন্তু কেবল প্লাটিলেটের সংখ্যা কমেছে বলেই প্লাটিলেট দিতে হবে-এমন কোনো নিয়ম নেই। সাধারণত চিকিৎসক রোগীর রক্তক্ষরণ, শারীরিক অবস্থা এবং অন্যান্য পরীক্ষার ফল দেখে সিদ্ধান্ত নেন প্লাটিলেট বা রক্তের প্রয়োজন আছে কি না। অপ্রয়োজনীয় প্লাটিলেট দেওয়া কখনও কখনও উল্টো ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।
পেঁপে পাতার রস ডেঙ্গুর নিশ্চিত চিকিৎসাডেঙ্গু হলে অনেকেই প্রথমে পেঁপে পাতার রস খোঁজেন। কিছু ছোট গবেষণায় সম্ভাব্য উপকারের ইঙ্গিত মিললেও এখন পর্যন্ত এমন শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই যে এটি ডেঙ্গুর কার্যকর বা নিশ্চিত চিকিৎসা। তাই পেঁপে পাতার রস খাওয়ার ওপর নির্ভর করে চিকিৎসা বিলম্ব করা বিপজ্জনক হতে পারে।
জ্বর কমে গেলেই রোগী পুরোপুরি সুস্থডেঙ্গুর ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটি ভুল ধারণা। অনেক সময় জ্বর কমার পরের ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টাই রোগীর জন্য সবচেয়ে সংকটময় সময় হতে পারে। এই সময় শরীর থেকে তরল বেরিয়ে যাওয়া, রক্তচাপ কমে যাওয়া বা রক্তক্ষরণের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাই জ্বর কমে গেলেও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পর্যবেক্ষণে থাকতে হবে।
Advertisement
ডেঙ্গু যে কোনো বয়সের মানুষের হতে পারে। শিশু, তরুণ, মধ্যবয়স্ক কিংবা প্রবীণ-সবাই আক্রান্ত হতে পারেন। তবে বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী, দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি এবং শিশুদের ক্ষেত্রে জটিলতার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
একবার ডেঙ্গু হলে আর হবে নাঅনেকেই মনে করেন, একবার ডেঙ্গু হলে শরীরে আজীবন প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয়। আসলে ডেঙ্গুর চারটি ভিন্ন ধরন (সেরোটাইপ) রয়েছে। এক ধরনের ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে সেই ধরনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হলেও অন্য ধরনের ভাইরাসে আবারও আক্রান্ত হওয়া সম্ভব। এমনকি দ্বিতীয়বার ডেঙ্গু হলে গুরুতর জটিলতার ঝুঁকিও কিছু ক্ষেত্রে বেড়ে যেতে পারে।
শুধু নোংরা পানিতেই এডিস মশা জন্মায়এডিস মশা সাধারণত পরিষ্কার ও স্থির পানিতে ডিম পাড়ে। ফুলের টব, এসির ট্রে, ফ্রিজের নিচের ট্রে, ছাদের ড্রাম, বালতি, বোতল কিংবা নারকেলের খোসায় জমে থাকা পরিষ্কার পানিও এডিস মশার প্রজননের জন্য যথেষ্ট। তাই শুধু নোংরা ড্রেন পরিষ্কার করলেই হবে না, ঘরের ভেতর ও আশপাশে জমে থাকা পরিষ্কার পানিও নিয়মিত ফেলে দিতে হবে।
মশা শুধু রাতে কামড়ায়অনেকেই রাতে মশারি টাঙিয়ে নিশ্চিন্ত থাকেন। কিন্তু ডেঙ্গু ছড়ানো এডিস মশা সাধারণত দিনের বেলায়, বিশেষ করে সকাল ও বিকেলের দিকে বেশি সক্রিয় থাকে। তাই দিনের বেলাতেও পূর্ণহাতা পোশাক পরা, মশা প্রতিরোধক ব্যবহার এবং ঘরে মশা প্রবেশ রোধ করা জরুরি।
আরও পড়ুন বিশ্বজুড়ে বাড়ছে ডেঙ্গু, সতর্ক থাকার আহ্বান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অ্যান্টিবায়োটিক খেলেই ডেঙ্গু ভালো হবেডেঙ্গু একটি ভাইরাসজনিত রোগ। অ্যান্টিবায়োটিক ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের জন্য ব্যবহৃত হয়। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার কোনো উপকার নেই। বরং অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার ভবিষ্যতে ওষুধ-প্রতিরোধী জীবাণুর সমস্যা বাড়াতে পারে।
ডেঙ্গু মানেই হাসপাতালে ভর্তি হতে হবেসব ডেঙ্গু রোগীর হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন হয় না। যাদের অবস্থা স্থিতিশীল, পর্যাপ্ত পানি পান করতে পারেন এবং বিপজ্জনক লক্ষণ নেই, তারা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী বাড়িতেই চিকিৎসা নিতে পারেন। তবে তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, শ্বাসকষ্ট, রক্তক্ষরণ, অতিরিক্ত দুর্বলতা, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া বা অস্বাভাবিক ঝিমুনি দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।
ডেঙ্গু হলে কী করবেন? পর্যাপ্ত পানি, ওরস্যালাইন, স্যুপ ও অন্যান্য তরল খাবার পান করুন। পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষা করান। জ্বর কমানোর জন্য সাধারণত প্যারাসিটামল ব্যবহার করা হয়। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া আইবুপ্রোফেন, ডাইক্লোফেনাক বা অ্যাসপিরিনজাতীয় ব্যথানাশক ওষুধ এড়িয়ে চলুন, কারণ এগুলো রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। সতর্কতামূলক লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে হাসপাতালে যান। আরও পড়ুন বাংলাদেশে ডেঙ্গু: ২৭ বছরের এক ‘অবহেলিত’ জনস্বাস্থ্য সংকট ডেঙ্গু প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়ডেঙ্গুর কোনো নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই। তাই প্রতিরোধই সবচেয়ে বড় অস্ত্র। প্রতিদিন মাত্র ১০ মিনিট সময় নিয়ে বাসা, বারান্দা, ছাদ, বাগান ও আশপাশে কোথাও পানি জমে আছে কি না তা পরীক্ষা করুন। ফুলের টব, এসির ট্রে, ফ্রিজের ট্রে, পুরোনো টায়ার বা বোতলে পানি জমতে দেবেন না।একই সঙ্গে দিনের বেলায়ও মশার কামড় থেকে নিজেকে রক্ষা করুন এবং পরিবারের সবাইকে সচেতন করুন।
ডেঙ্গু নিয়ে ভয় নয়, প্রয়োজন সঠিক তথ্য। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নানা পরামর্শ বা গুজবের ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসকের পরামর্শ এবং নির্ভরযোগ্য স্বাস্থ্য তথ্য অনুসরণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
তথ্যসূত্র: ইউনিসেফ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা
জেএস/