১. ডেঙ্গুর উৎপত্তি ও বিবর্তিত রূপঃ
Advertisement
গত ২৭ বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ডেঙ্গু এখন আর কেবল একটি নির্দিষ্ট মৌসুমের সাধারণ ভাইরাল ফিভার নেই। এর উৎপত্তি এবং ক্লিনিক্যাল ম্যানিফেস্টেশনে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। পূর্বে ডেঙ্গুর প্রধান লক্ষণ ছিল ক্লাসিক্যাল ফিভার (তীব্র জ্বর, শরীর ব্যথা)। কিন্তু বর্তমানে আমরা পালস রেট ও ব্লাড প্রেসার কমে যাওয়া, প্লাজমা লিকেজ, ডেঙ্গু শক সিনড্রোম (DSS) এবং বিভিন্ন অর্গান ফেইলিওরের মতো মারাত্মক ও জটিল রূপ দেখতে পাচ্ছি। ভাইরাসের সেরোটাইপ পরিবর্তন এবং সেকেন্ডারি ইনফেকশনের কারণে রোগীর অবস্থার খুব দ্রুত অবনতি হচ্ছে, যা ক্লিনিক্যাল ম্যানেজমেন্টকে আগের চেয়ে অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং করে তুলেছে।
২. বরগুনার অভিজ্ঞতা: ফাইন্ডিংস ও আমাদের পদক্ষেপঃ
গত বছর বরগুনায় ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের সময় একটি ইন-ডেপথ এপিডেমিওলজিক্যাল ও এন্টোমোলজিক্যাল তদন্ত পরিচালনা করা হয়। সেখানকার মূল ফাইন্ডিংসগুলো ছিল:
Advertisement
কী কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল?
২৫০ শয্যা বিশিষ্ট বরগুনা সদর হাসপাতালে তাৎক্ষণিকভাবে ৮ জন চিকিৎসক ও ২ জন কনসালট্যান্ট কে সংযুক্ত করা হয়। কেস ইনভেস্টিগেশন, ভার্বাল অটোপসি এবং কমিউনিটি লেভেলে রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট করা হয়। মাইকিং ও লিফলেট বিতরণের পাশাপাশি লোকাল পৌরসভার সাথে যুক্ত হয়ে ফগিং, লার্ভিসাইড প্রয়োগ এবং মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়।
বর্তমান অবস্থা:
সচেতনতা বৃদ্ধি এবং লোকাল অ্যাডভোকেসির কারণে সেখানকার মানুষ এখন পানি সংরক্ষণের ক্ষেত্রে পূর্বের চেয়ে সতর্ক। স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণের ফলে স্থানীয় পর্যায়ে কেস ম্যানেজমেন্ট সক্ষমতা বেড়েছে এবং পরিস্থিতি বর্তমানে নজরদারির আওতায় রয়েছে।
Advertisement
৩. বরগুনা মডেলে সারাদেশের জন্য প্রস্তাবনাঃ
বরগুনার এই অভিজ্ঞতা থেকে সারা দেশের জন্য নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা জরুরি:
রিয়েল-টাইম সার্ভিল্যান্স: নিয়মিত এন্টোমোলজিক্যাল সার্ভিল্যান্স (BI, CI, HI, PI ইনডেক্স) চালিয়ে মশার ঘনত্বের ডেটা আপডেট করা এবং সে অনুযায়ী জোনভিত্তিক ব্যবস্থা নেওয়া। প্রাইভেট সেক্টরকে যুক্ত করা: আন্ডার-রিপোর্টিং রোধে দেশের সকল প্রাইভেট হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে সিভিল সার্জনের সাথে সমন্বয় করে ডেঙ্গু পজিটিভ কেস রিপোর্ট করা বাধ্যতামূলক করা। উপজেলা পর্যায়ে সক্ষমতা বৃদ্ধি: রেফারেল সিস্টেম উন্নত করা এবং উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্সগুলোকে ডেঙ্গু কেস ম্যানেজমেন্টের জন্য প্রস্তুত করা।৪. ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সরকারের সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা সাফল্য:
সরকার ডেঙ্গু মোকাবিলায় ন্যাশনাল ক্লিনিক্যাল গাইডলাইন প্রণয়ন করেছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ দেশের টারশিয়ারি হাসপাতালগুলোতে ডেডিকেটেড ডেঙ্গু ওয়ার্ড স্থাপন এবং সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষার ব্যবস্থা করা জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় বড় অবদান রেখেছে।
সীমাবদ্ধতা: বড় সীমাবদ্ধতা হলো 'ইন্টারসেক্টরাল কোলাবোরেশন' বা আন্তঃবিভাগীয় সমন্বয়ের অভাব। সিটি কর্পোরেশন, স্থানীয় সরকার এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মধ্যে বছরব্যাপী সমন্বিত কাজের ঘাটতি রয়েছে। আমাদের ভেক্টর কন্ট্রোল ব্যবস্থা এখনো মূলত ফগিং বা উড়ন্ত মশা মারার উপর নির্ভরশীল, যা একটি রিঅ্যাকটিভ অ্যাপ্রোচ, প্রিভেনটিভ নয়।
৫. গত ২৭ বছরে আমরা কেন সফল হতে পারলাম না?
গত ২৭ বছরে আমাদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো আমরা ডেঙ্গুকে সারা বছরের একটি পরিবেশগত ও আচরণগত সমস্যা হিসেবে না দেখে, কেবল বর্ষাকালের 'মৌসুমি দুর্যোগ' হিসেবে বিবেচনা করেছি। আমরা এডিস মশার প্রজনন উৎস ধ্বংস করার (Source Reduction) চেয়ে অ্যাডাল্টিসাইড (পূর্ণাঙ্গ মশা নিধন) স্প্রে করার পেছনে বেশি অর্থ ও সময় ব্যয় করেছি। অপরিকল্পিত নগরায়ন, দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থা, সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাব এবং সবচেয়ে বড় কথা নিরবচ্ছিন্ন 'কমিউনিটি এনগেজমেন্ট'-এর অভাবে সাধারণ মানুষকে মশা নিধন কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা যায়নি। ডেঙ্গু প্রতিরোধ কোনো একক সংস্থার কাজ নয়; বছরব্যাপী বিজ্ঞানভিত্তিক নজরদারি এবং সমন্বিত সামাজিক আন্দোলন ছাড়া এই যুদ্ধে জয়ী হওয়া সম্ভব নয়।
এইচআর/জেআইএম