যেমন রঙিন প্রবাল প্রাচীর; তেমন রঙিন মাছ। মনে হয় এইমাত্র উভয়ের গায়ে কেউ একজন রঙের তুলি দিয়ে ছোপ ছোপ দাগ কেটে দিয়ে গেছে। রঙিন মাছগুলো লালচে গোলাপি রঙের প্রবাল প্রাচীরের চারপাশে ঘুরছে আর লুকোচুরি খেলছে। এটা-ওটা খেতে খেতে শত্রু আসছে দেখলেই প্রবাল প্রাচীরের ভেতর নিজেদের লুকিয়ে ফেলছে ওরা। দুজনের গায়ের রং একই রকম হওয়ায় শত্রুরা আর ওদের খুঁজে পায় না। সাগরের এই পরিবেশে রঙিন মাছ ও প্রবাল প্রাচীর বাস করে আসছে।
Advertisement
বনের সবচেয়ে লম্বা যে গাছটি, তাকে জড়িয়ে ধরে ওপরে উঠে গেছে একদল রঙিন ক্যাকটাস। বেঁচে থাকার জন্য ওরা সব সময় বনের এমন বড় গাছগুলোকেই বেছে নেয়। যতদিন বাঁচে এভাবেই জড়াজড়ি করে থাকে ওরা। এইমাত্র একটা খরগোশ ঘাস খেতে এসেছে। সবুজ ঘাসের বুকে বোকা খরগোশটিকে দেখামাত্রই চোখ দুটো চকচক করে উঠলো বাজপাখিটার। বাতাসে ডানা ভাসিয়েই নিচের দিকে নামতে লাগলো সে। বোকা খরগোশ কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাজপাখিটার দু’পায়ের মাঝখানে ঝুলতে লাগলো। একটু পরে লম্বা একটা গাছের ডালে বসে ধারালো নখের আঁচড়ে শরীরটা ফালাফালা করে ফেললো খরগোশের।
বেঁচে থাকার গল্প তিনটি কিন্তু ইকোসিস্টেম বা বাস্তুসংস্থানের গল্প। রঙিন মাছ, প্রবাল প্রাচীর, ক্যাকটাস, বড় গাছ, বাজপাখি, খরগোশ ও ঘাস হলো এই ইকোসিস্টেমের একেকটি উপাদান।
ইকোসিস্টেম কীযত জৈব (জীবিত) বা অজৈব (মৃত) বস্তু থাকে, তারা সবাই ইকোসিস্টেম। যত গাছপালা, প্রাণী এমনকি মাটিতে বাস করা অণুজীব আছে, সবই ইকোসিস্টেমের জীবিত উপাদান। বাতাস, পানি ও পাথর হলো ইকোসিস্টেমের মৃত উপাদান। পৃথিবীতে যত জীবন্ত সমাজব্যবস্থা আছে ইকোসিস্টেম হলো তার একটি ছোট্ট অংশ। পৃথিবীর সব জীবন্ত সমাজব্যবস্থাকে একসাথে বলা হয় প্রাণিমণ্ডল। একেকটা প্রাণিমণ্ডল তৈরি হয় বিশাল এলাকা নিয়ে। জীববিজ্ঞানের ভাষায় এ এলাকাকে বলা হয় বায়োমস।
Advertisement
কোনো কিছুই একা একা বাস করতে পারে না। পারে না বলেই পৃথিবীতে সমাজব্যবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। বলতে পারেন ইকোসিস্টেম হলো ওই ধরনের একটা সমাজব্যবস্থা। যেখানে একজন আরেকজনের ওপর নির্ভর করে বেঁচে আছে। যে যার ওপরই নির্ভর করুক, সেটা বড় কথা নয়; বড় কথা হলো এখানে সবাই সমানভাবে কাজ করে যায়। যে কোনো ইকোসিস্টেমে জীবিত উপাদানগুলো উৎপাদকও (যে খাদ্য উৎপাদন করে) হতে পারে আবার খাদকও হতে পারে। তবে যারা উৎপাদক; তারা অন্য কোনো জীবিত উপাদানকে খাবার হিসেবে গ্রহণ করতে পারে না। এরা শুধুই খাবার উৎপাদন করে।
খাবার তৈরির জন্য গাছ তার শরীরে থাকা ক্লোরোফিল তো ব্যবহার করেই। পাশাপাশি মাটি থেকে নেয় পানি, সূর্য থেকে নেয় আলো এবং বাতাস থেকে নেয় কার্বন-ডাই-অক্সাইড। গাছপালা খাবার তৈরি করে নিজেদের জন্যই। এ খাবার খেয়েই তারা বড় হয়, ফুলে ফলে সুশোভিত হয়। সবুজ উদ্ভিদের মধ্যে সবাই খুব বেশিদিন বেঁচে থাকতে পারে না। অচিরেই তারা প্রাণীদের খাদ্য হয়ে যায়। যেসব প্রাণী শুধু গাছপালার লতাপাতা বা ঘাস খেয়ে জীবন ধারণ করে তাদের বলা হয় তৃণভোজী। এরা হলো প্রাথমিক খাদক। প্রাথমিক খাদকদের তালিকায় পড়ে খরগোশ, ইঁদুর ও বিভিন্ন ধরনের পোকামাকড়। লতাপাতা আর ঘাস খেয়ে বেঁচে থাকা এই প্রাণীদের আবার অন্য প্রাণীরা খেয়ে ফেলে। যেহেতু এরা অন্য প্রাণীর মাংস খায়, তাই এদের বলা হয় মাংসাশী প্রাণী। ইকোসিস্টেমে এরা হলো গৌণ বা মাধ্যমিক খাদক। এই তালিকার প্রাণীদের মধ্যে আছে ভল্লুক, বাঘ, সিংহ, হায়েনা, বাজ, শকুন, ঈগল ইত্যাদি।
ইকোসিস্টেমে আরেক ধরনের উপাদান থাকে, যাদের বলা হয় ডিকম্পোজর বা পচনকারী। মাটির সাথে মিশে যাওয়া এই উপাদানগুলো একসময় রাসায়নিক পুষ্টি উপাদানে পরিণত হয়। গাছপালা যখন খাবার তৈরি করে, তখন তাদের শেকড়ের সাহায্যে মাটি থেকে এই পুষ্টি উপাদানগুলো গ্রহণ করে থাকে। মৃত উদ্ভিদ, প্রাণী এবং তাদের আবর্জনাগুলোকে পচিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়ার কাজগুলো করে থাকে ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক।
ইকোসিস্টেম কত বড় হতে পারেইকোসিস্টেম হতে পারে ছোট-বড় দুই ধরনেরই। যেমন ট্রোপিক্যাল রেইন ফরেস্ট ইকোসিস্টেম হয় প্রায় কয়েকশ বর্গমাইল এলাকা নিয়ে। আবার ম্যানগ্রোভ ইকোসিস্টেম হয় মাত্র কয়েক মাইল এলাকা নিয়ে। একই জায়গায় একাধিক ইকোসিস্টেমও হতে পারে। একই দ্বীপে রেইন ফরেস্ট ইকোসিস্টেম যেমন থাকতে পারে; তেমনি ম্যানগ্রোভ ইকোসিস্টেমও থাকতে পারে।
Advertisement
ইকোসিস্টেমে যত উপাদান থাকে, তারা সবাই একে অন্যের সাথে নিবিড় বন্ধনে জড়িয়ে থাকে। এ বন্ধনটা আসে খাবার এবং শক্তির মাধ্যমে। যখন এই খাদ্য শৃঙ্খল আরও বিস্তার লাভ করে; তখন এটাকে বলা হয় খাদ্যজাল। ব্যাপারটাকে এভাবে দেখা যেতে পারে। নদীতে যখন পানি প্রবহমান থাকে; তখন তার দুই তীর ভেজা ভেজা থাকে। যেসব উদ্ভিদের বেঁচে থাকার জন্য সব সময় পানির দরকার হয়, তারা এই নদী তীরেই জন্মায়। পানিতে পোকামাকড় থাকাটা খুবই স্বাভাবিক। এদের মধ্যে যারা ছোট ছোট উদ্ভিদ ও ঘাসের পাতা খেয়ে বাঁচে; তারা খুব সহজেই নদীতীরে জন্মানো ঘাস বা উদ্ভিদের পাতা খেতে পারে। এ পোকামাকড়গুলো আবার প্রায়ই স্যামন মাছের খাবার হয়ে যায়। নদীর কাছাকাছি বনে বাস করা ভল্লুকের খাবার হয়ে যায় স্যামনরা। একটা ভল্লুক সব সময় স্যামন মাছের পুরোটা খেতে পারে না। কাঁটা এবং মাছের মাংস প্রায়ই থেকে যায়। এগুলো নিয়ে কাজে নেমে পড়ে ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়ারা। কিছু দিনের মধ্যেই এগুলো পচে মাটিতে মিশে যায়। তৈরি হয় রাসায়নিক পুষ্টি উপাদান। মাটিতে থাকা এ পুষ্টি উপাদান পরে শেকড়ের মাধ্যমে টেনে নিয়ে খাবার তৈরির কাজে লাগায় নদীতীরে জন্মানো ঘাস বা ছোট ছোট উদ্ভিদ। বিষয়টা এভাবে চক্রাকারে চলতেই থাকে।
কিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ইকোসিস্টেমইকোসিস্টেমের একপাশের জৈব বা অজৈব উপাদান বদলে গেলে অন্যপাশেরটাও বদলে যায়। সাধারণত খরা বা বৃষ্টিহীনতা, প্রচণ্ড ঝড় কিংবা হঠাৎ আগুন লাগার ঘটনা ঘটলে ইকোসিস্টেমে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। কখনো কখনো এসব পরিবর্তন ইকোসিস্টেমের জন্য বিপদ বয়ে আনে। এগুলো যাতে নষ্ট না হয়, ইকোসিস্টেম যাতে টিকে থাকে, ভালো থাকে ইকোসিস্টেমের বাসিন্দারা, সে জন্য আমাদের সবারই সচেতন হতে হবে। কারণ ইকোসিস্টেম নষ্ট হলে বিপদের মুখে পড়ে মানুষও।
এসইউ