আন্তর্জাতিক

ডেঙ্গু থেকে শিশুদের সুরক্ষায় ইউনিসেফের পরামর্শ

এশিয়াজুড়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে এবং এটি শিশুদের জন্য মারাত্মক হতে পারে। কিন্তু আশার কথা হচ্ছে, কিছু সহজ পদক্ষেপ গ্রহণ করে এর ঝুঁকি কমানো সম্ভব। মশার কামড় প্রতিরোধ করে, ডেঙ্গুর লক্ষণগুলো চিনে এবং কখন চিকিৎসকের সাহায্য নিতে হবে তা জেনে আপনি আপনার পরিবারকে আরও সুরক্ষিত রাখতে পারেন।

Advertisement

কিছু দেশে ৬ থেকে ১৬ বছর বয়সী শিশুদের জন্য ডেঙ্গুর টিকাও পাওয়া যাচ্ছে। সাধারণত বেসরকারি ক্লিনিকের মাধ্যমে এই টিকা দেওয়া হয়। শিশুদের সুরক্ষায় অভিভাবকদের সবচেয়ে সাধারণ প্রশ্নগুলোর উত্তর ও পরামর্শ দিয়েছেন ইউনিসেফের বিশেষজ্ঞরা।

ডেঙ্গু কী?ডেঙ্গু হলো ফ্লুয়ের মতো একটি রোগ যা এডিস মশার মাধ্যমে ছড়ায়। এই রোগে আক্রান্ত অনেকেই কোনো অসুস্থতা অনুভব করেন না, তবে কারও কারও জ্বর হয় এবং তারা অসুস্থ বোধ করেন। অল্প কিছু ক্ষেত্রে ডেঙ্গু খুব গুরুতর হতে পারে এবং দ্রুত চিকিৎসা না পেলে তা মৃত্যুর কারণও হতে পারে। ডেঙ্গু বিশ্বের উষ্ণ অঞ্চলগুলোতেই বেশি দেখা যায়।

কীভাবে ডেঙ্গু হয়?ডেঙ্গু ভাইরাস বহনকারী কোনো এডিস মশা কামড়ালে ডেঙ্গু হয়। বছরের নির্দিষ্ট কিছু সময় ডেঙ্গু বেশি ছড়ানোর প্রবণতা দেখা যায়। বিশেষ করে বর্ষাকালে এবং বর্ষার পরে এর প্রকোপ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়, কারণ তখন মশার বংশবৃদ্ধির জন্য বেশি জায়গা পাওয়া যায়।

Advertisement

ডেঙ্গু ছড়ানো মশা দিনের কোন সময়ে কামড়ায়?এডিস মশা সাধারণত দিনের বেলায়, বিশেষ করে সূর্যোদয়ের ২ ঘণ্টা পর এবং সূর্যাস্তের আগে শেষ বিকেলে কামড়ায়। এই সময়গুলোতেই ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে।

এছাড়াও আপনার বাড়ি, স্কুল, কর্মক্ষেত্র বা দৈনন্দিন চলার পথে এমন কোনো বস্তু থাকলে যেখানে পানি জমতে পারে সেক্ষেত্রেও মশার কামড় খাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। এর কারণ হলো- এডিস মশা স্থির পানিতে বংশবৃদ্ধি করে এবং খুব অল্প পরিমাণে ডিম পাড়তে পারে যেমন- বালতি, পুরোনো গাড়ির টায়ার, ডোবা এবং এমনকি বোতলের ছিপিতেও।

ডেঙ্গু কি সংক্রামক?ডেঙ্গু সরাসরি এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তিতে ছড়ায় না। স্পর্শ করা, খাবার ভাগাভাগি করা বা অসুস্থ ব্যক্তির কাছাকাছি থাকার মাধ্যমে এটি ছড়ায় না।

তবে অসুস্থতার প্রথম সপ্তাহে ডেঙ্গু ভাইরাস একজন আক্রান্ত ব্যক্তির রক্তে উপস্থিত থাকে। এই সময়ে যদি কোনো মশা তাকে কামড়ায় তাহলে মশাটি সংক্রমিত হতে পারে এবং তারপর ভাইরাসটি অন্য কারো শরীরে ছড়িয়ে দিতে পারে।

Advertisement

গর্ভবতী নারীরা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে, কখনো কখনো জন্মের আগে বা জন্মের সময় তাদের শিশুর মধ্যেও এটি ছড়িয়ে পড়তে পারে।

শিশুদের জন্য ডেঙ্গু কতটা বিপজ্জনক?সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় ছোট শিশু, বিশেষ করে নবজাতকদের গুরুতর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। কারণ তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বিকাশমান থাকে। ফলে তাদের শরীরের পক্ষে এই সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ কারণে নবজাতক ও ছোট শিশুদের মশার কামড় থেকে রক্ষা করা এবং ডেঙ্গুর লক্ষণগুলো সম্পর্কে জানা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

দ্রুত চিকিৎসার মাধ্যমে, শিশুদের মধ্যে গুরুতর ডেঙ্গুর সবচেয়ে মারাত্মক প্রভাবগুলো প্রায়ই প্রতিরোধ করা সম্ভব। গর্ভবতী নারীদের গুরুতর ডেঙ্গু হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে এবং গর্ভাবস্থায় বা জন্মের সময় তাদের মাধ্যমে শিশুদের মধ্যে ডেঙ্গু ছড়ানোর সম্ভাবনা থাকে। গর্ভবতী অবস্থায় কোনো মা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে শিশুদের অকাল জন্ম, কম ওজন এবং ভ্রূণের সংকট দেখা দিতে পারে।

ডেঙ্গুর লক্ষণগুলো কী কী?ডেঙ্গুতে আক্রান্ত বেশিরভাগ মানুষেরই হালকা বা কোনো লক্ষণই দেখা যায় না এবং তারা এক থেকে সপ্তাহের মধ্যেই সুস্থ হয়ে ওঠেন। আক্রান্ত প্রতি চারজনের মধ্যে প্রায় একজনের মধ্যে লক্ষণ দেখা দেয়।

যদি আপনার লক্ষণ দেখা দেয়, তবে সেগুলো সাধারণত-

১. সংক্রমিত মশার কামড়ের ৪ থেকে ১০ দিন পর শুরু হয়। এবং২. ২ থেকে ৭ দিন স্থায়ী হয়।

প্রাপ্তবয়স্ক এবং শিশু উভয়ের ক্ষেত্রেই সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে-

হঠাৎ করে ৪০° সেলসিয়াস পর্যন্ত উচ্চ জ্বর ও তীব্র মাথাব্যথা।চোখের পেছনে ব্যথা।পেশী ও গাঁটে ব্যথা।বমি বমি ভাব।বমি।গ্রন্থি ফুলে যাওয়া এবংত্বকের ফুসকুড়ি।

আপনার বা আপনার সন্তানের ডেঙ্গুর কোনো উপসর্গ দেখা দিলে, চিকিৎসকের পরামর্শ নিন এবং তার নির্দেশনা মেনে চলুন।

শিশুদের ডেঙ্গুর লক্ষণগুলো কী কী?শিশুদের ডেঙ্গুর লক্ষণগুলো প্রাপ্তবয়স্কদের মতোই। তবে এগুলো দেখতে শিশুদের অন্যান্য সাধারণ সংক্রমণের মতোও হতে পারে। ফলে লক্ষণগুলো সহজে চোখে নাও পড়তে পারে।

উপরের উপসর্গগুলো ছাড়াও শিশু এবং ছোট বাচ্চাদের আচরণে পরিবর্তন দেখা যেতে পারে যেমন- স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি খিটখিটে হওয়া, কম খাওয়া বা ঘুমের ব্যাঘাত ঘটা।

অভিভাবকরা কখন পদক্ষেপ নেবেন এবং কেন এটি জরুরিআপনার সন্তানের ডেঙ্গুর কোনো উপসর্গ দেখা দিলে, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চিকিৎসকের পরামর্শ নিন এবং আপনার স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর দেওয়া পরামর্শ অনুসরণ করুন। ডেঙ্গুর কিছু উপসর্গ ফ্লু বা অন্যান্য সাধারণ সংক্রমণের মতো দেখতে হতে পারে এবং বাড়িতে এর পার্থক্য বোঝা সবসময় সহজ হয় না। যেহেতু গুরুতর ডেঙ্গু একটি জরুরি অবস্থা হয়ে উঠতে পারে, তাই দ্রুত সাহায্য নিলে আপনার সন্তান সঠিক সময়ে সঠিক যত্ন পাবে।

হালকা ডেঙ্গুর চিকিৎসা কী?এমন কোনো ওষুধ নেই যা ডেঙ্গু নিরাময় করে। চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো- লক্ষণগুলো নিয়ন্ত্রণ করা, যেমন জ্বর এবং ব্যথা কমানো। সব সময় একজন ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করুন এবং তার উপদেশ মেনে চলুন।

মৃদু ডেঙ্গু সংক্রমণে আক্রান্ত বেশিরভাগ মানুষ প্যারাসিটামলের মতো ব্যথানাশক ওষুধ দিয়ে বাড়িতেই চিকিৎসা নিতে পারেন এবং তাদের চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না। তারা ধীরে ধীরে অল্প অল্প করে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবেন।

যদি আপনার বা আপনার সন্তানের মৃদু ডেঙ্গু ধরা পড়ে, তবে আপনি নিম্নলিখিত উপায়ে আরোগ্য লাভে সহায়তা করতে পারেন-

যতটা সম্ভব বিশ্রাম নিন।শরীরকে সতেজ রাখতে প্রচুর পরিমাণে পানি পান করুন।পুষ্টিকর খাবার খান।আপনার স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যথা ও জ্বর কমাতে প্যারাসিটামল গ্রহণ করুন।জ্বর কমাতে ঠান্ডা জল দিয়ে ত্বক মুছে নিন এবংআইবুপ্রোফেন, অ্যাসপিরিন এবং অন্যান্য নন-স্টেরয়েডাল অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ড্রাগ (NSAID) এড়িয়ে চলুন, কারণ এগুলো রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

লক্ষণগুলোর উপর কড়া নজর রাখুন। ডেঙ্গু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই গুরুতর হয়ে উঠতে পারে। যদি আপনি গুরুতর ডেঙ্গুর কোনো লক্ষণ দেখতে পান, তবে অবিলম্বে জরুরি চিকিৎসা সহায়তা নিন।

গুরুতর ডেঙ্গুর লক্ষণগুলো কী কী?ডেঙ্গুতে কিছু মানুষ গুরুতরভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। ছোট শিশু, গর্ভবতী মহিলা এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যায় (যেমন কিডনি রোগ ও ডায়াবেটিস) আক্রান্ত বয়স্ক ব্যক্তিদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।

ডেঙ্গু সংক্রমণ যখন গুরুতর ডেঙ্গুতে পরিণত হয়, তখন তা দ্রুত ঘটতে পারে এবং জীবন-হুমকির মতো জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। তাই লক্ষণগুলোর প্রতি মনোযোগ দেওয়া এবং সেগুলো দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের সহায়তা নেওয়া জরুরি। গুরুতর ডেঙ্গুর লক্ষণগুলো প্রায়ই জ্বর চলে যাওয়ার পরে দেখা দেয় এবং এর মধ্যে রয়েছে-

পেটে তীব্র ব্যথা।ক্রমাগত বমি।দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস।মাড়ি বা নাক দিয়ে রক্তপাত।ক্লান্তি।অস্থিরতা।বমি বা মলের সাথে রক্ত।খুব বেশি তৃষ্ণা।ফ্যাকাশে ও শুষ্ক ত্বক।দুর্বল বোধ করা।ঘুমঘুম ভাব, শক্তির অভাব বা খিটখিটে মেজাজ।

আপনার সন্তানের বা সন্দেহভাজন বা নিশ্চিত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত অন্য কোনো ব্যক্তির মধ্যে এই লক্ষণগুলোর কোনোটি দেখা দিলে, জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসা সহায়তা নেওয়া প্রয়োজন।

গুরুতর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীদের প্রায়ই হাসপাতালে ভর্তি করার প্রয়োজন হয়। শিশুদের মধ্যে পানিশূন্যতার লক্ষণগুলোর দিকেও খেয়াল রাখা জরুরি। জ্বর, বমি, ডায়রিয়া বা পর্যাপ্ত পরিমাণে তরল পান না করার কারণে শরীর থেকে অতিরিক্ত তরল বেরিয়ে গেলে ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতা হয়।

শিশুদের মধ্যে ডিহাইড্রেশনের লক্ষণগুলো হলো-অস্বাভাবিক ঘুম ঘুম ভাব, ক্লান্তি, খুব খিটখিটে আচরণ।মুখ, জিহ্বা ও ঠোঁট শুকিয়ে যাওয়া।দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস।চোখ কোটরে ঢুকে যাওয়া।কান্নার সময় চোখে পানি না আসা বা খুব কম আসা।হাত বা পা ঠান্ডা ও বিবর্ণ হয়ে যাওয়া।কম প্রস্রাব হওয়া।প্রস্রাব গাঢ় হলুদ এবং তীব্র গন্ধযুক্ত হওয়া।

আপনার সন্তানের মধ্যে ডিহাইড্রেশনের এই লক্ষণগুলোর কোনোটি দেখা দিলে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

ডেঙ্গু সংক্রমণ গুরুতর হওয়ার সম্ভাবনা কতটা?ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে প্রায় পাঁচ শতাংশের ক্ষেত্রে এটি গুরুতর, জীবন-হুমকির কারণ হতে পারে। একবার মশার কামড়েই গুরুতর ডেঙ্গু হয় না। ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত মশার একাধিক কামড় বা সংক্রমণের পরেই একজন ব্যক্তি ডেঙ্গুতে গুরুতরভাবে অসুস্থ হতে পারেন।

এর মানে হলো, আপনার গুরুতর ডেঙ্গু হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে যদি-

আপনার অতীতে ডেঙ্গু হয়ে থাকে এবং আপনি ভিন্ন ধরনের ডেঙ্গু ভাইরাস দ্বারা পুনরায় সংক্রমিত হন।

আপনি এমন এলাকায় বাস করেন বা যাতায়াত করেন যেখানে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি, ফলে বারবার সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

যেহেতু কোনো লক্ষণ প্রকাশ না পেয়েও ডেঙ্গুতে সংক্রমিত হওয়া সম্ভব, তাই ঝুঁকি কমাতে সতর্ক থাকা এবং নিজেকে ও আপনার পরিবারকে সব ধরনের মশার কামড় থেকে রক্ষা করা জরুরি।

ডেঙ্গু কীভাবে নির্ণয় করা হয়?ডেঙ্গুর লক্ষণগুলো জিকা, চিকুনগুনিয়া এবং ম্যালেরিয়ার মতো অন্যান্য রোগের লক্ষণের সাথে অনেক মিল থাকতে পারে। যেহেতু ডেঙ্গুতে আক্রান্ত অনেকের কোনো লক্ষণ থাকে না বা হালকা লক্ষণ দেখা যায়, তাই প্রায়ই এটিকে অন্য অসুস্থতা বলে ভুল নির্ণয় করা হয়। আপনার ডেঙ্গু হয়েছে কি না তা নিশ্চিতভাবে জানার একমাত্র উপায় হলো ল্যাবরেটরি পরীক্ষা।

ডেঙ্গুর কোনো টিকা আছে কি?হ্যাঁ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি এমন জায়গায় বসবাসকারী ৬ থেকে ১৬ বছর বয়সী শিশুদের জন্য কিউ-ডেঙ্গা (Q-denga) টিকার সুপারিশ করেছে।

কিউ-ডেঙ্গা (Q-denga) টিকা ৩ মাসের ব্যবধানে দুটি ইনজেকশনের মাধ্যমে দেওয়া হয়। দুর্ভাগ্যবশত অনেক দেশে এই টিকা এখনো সরকারি ক্লিনিকে পাওয়া যায় না। এর মানে হলো- আপনাকে হয়তো কোনো বেসরকারি ক্লিনিকে টাকার বিনিময়ে টিকাটি নিতে হতে পারে। স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীর সঙ্গে বিষয়টি যাচাই করে নিন।

সূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ

টিটিএন