স্বপ্ন ছিল উচ্চশিক্ষা অর্জন করে একদিন পরিবারের দারিদ্র্যের চক্র ভাঙবেন। কিন্তু জীবনের নির্মম বাস্তবতা সেই স্বপ্নের পথকে আরও কঠিন করে তুলেছে। রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের ২৩-২৪ সেশনের শিক্ষার্থী কপিল আহমেদ আজ নিজের শিক্ষাজীবন টিকিয়ে রাখার পাশাপাশি বাবার জীবন বাঁচানোর জন্য লড়ছেন এক অসম যুদ্ধ।
Advertisement
কপিলের বাবা একজন সাধারণ কৃষক ও রিকশাচালক। ভোরের আলো ফোটার আগেই জীবিকার সন্ধানে বের হওয়া আর গভীর রাতে ক্লান্ত শরীরে ঘরে ফেরা; এটাই ছিল তার জীবনের প্রতিদিনের বাস্তবতা। রোদ, বৃষ্টি, শীত কিংবা ঝড়, কোনো কিছুই তাকে থামাতে পারেনি।
প্রত্যন্ত গ্রামের দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে এসে অদম্য মেধাবী কপিল আহমেদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া ছিল শুধু একটি ব্যক্তিগত অর্জন নয় বরং পুরো পরিবারের বহুদিনের স্বপ্ন পূরণের মতো। সীমাহীন অভাবের মধ্যেও থেমে থাকেননি তিনি। ছোটবেলা থেকেই টিউশনি করে নিজের বই, খাতা, যাতায়াত ও অন্যান্য শিক্ষাব্যয় চালিয়ে আসছেন।
কিন্তু গত এক বছরে তার পরিবারে নেমে এসেছে এক ভয়াবহ বিপর্যয়। কপিলের বাবা মরণব্যাধি ক্যানসারে আক্রান্ত। বায়োপসি রিপোর্টে ধরা পড়েছে Grade-2 Adenocarcinoma। চিকিৎসকদের ভাষ্যমতে, তার শরীরে Periampullary/Pancreatic head-এ প্রায় ৬.৬×৬.৪×৪.৬ সেমি আকারের টিউমার রয়েছে। এর ফলে পিত্তনালী বন্ধ হয়ে গেছে, পিত্তথলি ফুলে গেছে এবং ক্যানসার লিভারেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
Advertisement
চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী জরুরি ভিত্তিতে অপারেশন করে ERCP স্টেন্ট বসানো এবং পরবর্তীতে কেমোথেরাপি কিংবা প্রয়োজন হলে টার্গেটেড চিকিৎসা দিতে হবে। কিন্তু এই চিকিৎসার প্রাথমিক ব্যয়ই প্রায় তিন লাখ টাকা, যা একটি দরিদ্র পরিবারের জন্য প্রায় অসম্ভব।
বাবার অসুস্থতার পর পরিবারের একমাত্র উপার্জনের পথ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। সংসারের খরচ, চিকিৎসা ব্যয় এবং কপিলের শিক্ষাজীবনের ব্যয় বহন করতে গিয়ে পরিবারটি এরইমধ্যে ঋণে জর্জরিত।
পরিবারের একমাত্র ছেলে হওয়ায় বাবার চিকিৎসা ও সংসারের দায়ভার এখন কপিলের কাঁধে। একদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা অন্যদিকে অসুস্থ বাবার চিকিৎসা, সব মিলিয়ে প্রতিটি দিন তার জন্য হয়ে উঠেছে সংগ্রামের আরেকটি অধ্যায়।
কপিল আহমেদ বলেন, আমার বাবার ত্যাগের কারণেই আজ আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছি। তিনি নিজের শরীরের কথা না ভেবে সারাজীবন রিকশা চালিয়েছেন। আজ যখন তিনি ক্যানসারে আক্রান্ত, তখন তাকে বাঁচানো আমার দায়িত্ব। কিন্তু সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতায় আমি অসহায় হয়ে পড়েছি।
Advertisement
তবুও স্বপ্ন দেখেন কপিল। বিশ্বাস করেন, শিক্ষা একদিন তাকে দারিদ্র্য থেকে মুক্তি দেবে এবং বাবার সব ত্যাগের প্রতিদান দিতে পারবেন। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা সেই স্বপ্নকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এমন কঠিন সময়ে সমাজের বিত্তবান, সহৃদয় ব্যক্তি ও মানবিক সংগঠনগুলোর সহযোগিতা কপিলের বাবার জীবন বাঁচাতে পারে। একটি পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার আগে, একজন সংগ্রামী শিক্ষার্থীর পাশে দাঁড়ানো হতে পারে সবচেয়ে বড় মানবিক দায়িত্ব।
আজিজুর রহমান/এফএ/জেআইএম