রাজধানীর মোহাম্মপুরের ১৪ মাস বয়সী মালিহা। সাতদিন আগে প্রথমে জ্বর আসে, ঘন ঘন বমি করতো। দ্বিতীয় দিন থেকে বমির সঙ্গে বের হয় রক্ত। এরপর তাকে দ্রুত নিয়ে আসা হয় রাজধানীর শিশু হাসপাতালে। সেখানে পরীক্ষা করে ধরা পড়ে ডেঙ্গু।
Advertisement
জাগো নিউজকে মালিহার মা বলেন, এখন চিকিৎসা চলছে। বাচ্চার শরীরে পানি চলে আসছে, ফুসফুসে পানি আছে। এটা শুকালে ছেড়ে (রিলিজ) দেবে। আপাতত ভালোর দিকে।
এত ভয়ঙ্কর অবস্থা কীভাবে হলো? প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের বাসার পাশে ড্রেন, সেখানে প্রচুর মশা। এর মাধ্যমেই হয়তো ডেঙ্গু ছড়িয়েছে।
পাশের বেডেই রয়েছে এক বছর বয়সী আদিবা, এসেছে নড়াইল থেকে। তারও সাত দিন আগে থেকেই জ্বর, নেওয়া হয় নড়াইল হাসপাতালে। সেখান থেকে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে এখানে পাঠিয়েছে। এখন চিকিৎসা চলছে। কিছু টেস্ট করা হয়েছে, তবে এখনো রিপোর্ট আসেনি।
Advertisement
কথা হয় আদিবার মায়ের সঙ্গে। জাগো নিউজকে তিনি বলেন, আমাদের ওখানে খাল, বিল, জলাশয় বেশি। ফলে মশাও বেশি। এজন্য এই অবস্থা হয়ে থাকতে পারে।
একই অবস্থা তাদের পাশের বেডের লামিয়ারও। শুধু মালিহা, আদিবা বা লামিয়া নয়, রাজধানীর শ্যামলীর শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের ডেঙ্গু রোগীদের সবার গল্প এমনই। গত বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) সরেজমিনে হাসপাতালটিতে ডেঙ্গু ওয়ার্ডের ৭৫ রোগীর পাশাপাশি আইসিইউ/এনআইসিইউতে ৫ জনের খোঁজ মিলেছে। পৃথক ওয়ার্ডে একজন করোনার এবং প্রায় শখানেক হামের রোগী আছে এই হাসপাতালে। তবে যে রোগী আছে তাতে এখন পর্যন্ত হাসপাতালে সামাল দেওয়া গেলেও চাপ বাড়লে কঠিন হবে।
রোগীর চাপ বাড়লে প্রস্তুতি আছে কি না— জানতে চাইলে হাসপাতালটির পরিচালক অধ্যাপক ডা. মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, শিশু হাসপাতালের প্রস্তুতি লাগে না, আমরা সারা বছর প্রস্তুত থাকি। আমাদের ১নং ওয়ার্ড বিশেষায়িত ডেঙ্গু ওয়ার্ড। এখানে বেডগুলো সারা বছর ডেঙ্গু রোগীদের জন্য বরাদ্দ থাকে। বেশিরভাগ চিকিৎসকই ডেঙ্গুর বিষয়ে প্রশিক্ষিত। সুতরাং যে কোনো সময় আমরা ডেঙ্গু মোকাবিলায় প্রস্তুত।
ডেঙ্গু ভাইরাস চার ধরনের। দ্রুত তাদের গতিপ্রকৃতি পরিবর্তন হয়। কোনো কোনো সময় এমন আগ্রাসী রূপ ধারণ করে যে, দ্রুত রোগীর অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। আমাদের আইইডিসিআর, আইসিডিডিআরবিসহ বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রতি বছর ডেঙ্গুর প্রকোপ হলে জিন অ্যানালাইসিস করে। দেখা হয়, এবার কোনো ভ্যারিয়েন্ট আসছে।— শিশু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম
Advertisement
তিনি বলেন, ডেঙ্গু ভাইরাস চার ধরনের। দ্রুত তাদের গতিপ্রকৃতি পরিবর্তন হয়। কোনো কোনো সময় এমন আগ্রাসী রূপ ধারণ করে যে, দ্রুত রোগীর অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। আমাদের আইইডিসিআর, আইসিডিডিআরবিসহ বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রতি বছর ডেঙ্গুর প্রকোপ হলে জিন অ্যানালাইসিস করে। দেখা হয়, এবার কোনো ভ্যারিয়েন্ট আসছে। এখন পর্যন্ত আমরা সেই তথ্যের অপেক্ষায় আছি, কোন ভ্যারিয়েন্ট এবার বেশি।
আরও পড়ুন দ্বিতীয়বার ডেঙ্গু হওয়ার ঝুঁকি কতটাশিশু হাসপাতালের পাশেই ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট টিবি হাসপাতাল। ডেঙ্গু চিকিৎসায় সরকারি তালিকার ১২ নম্বরে থাকা এই হাসপাতালও ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা দিতে প্রস্তুত। হাসপাতালটির উপ-পরিচালক ও অফিস প্রধান ডা. আয়েশা আক্তার জাগো নিউজকে বলেন, এ সময়টা ডেঙ্গুর মৌসুম। এই হাসপাতালসহ প্রায় সব হাসপাতালে আলাদা করে ডেঙ্গু কর্নার খোলা আছে। পর্যাপ্ত ওষুধ আছে। রোগী যখন আসবে, আমরা চিকিৎসা দেবো।
সচেতনতার বিষয়ে তিনি বলেন, ডেঙ্গু হলে প্রচুর পরিমাণ পানি খেতে হবে। ডাবের পানি, ওরস্যালাইনসহ বিভিন্ন ফলের জুস খেতে হবে। ঠিকমতো খেতে পারলে সমস্যা নেই। যদি খেতে না পারে, বমি হয়, পেটে ব্যথা হয়- অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেবে। ঘুমাতে গেলে অবশ্যই মশারি টাঙাতে হবে। রোগীর চাপ বাড়লে আমাদের হিমশিম খেতে হবে, তাদেরও কষ্ট হবে। তাই একটু সচেতন থাকা দরকার।
বদলেছে মৌসুম, আক্রান্ত বেশি গ্রামেজলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে গতিপ্রকৃতি বদলাচ্ছে ডেঙ্গু। এই সংকট এখন বছরজুড়ে। তবে বর্ষায় এর প্রকোপ বাড়ার আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এবং দেশের চার জেলা অতিঝুঁকিতে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ কীটতাত্ত্বিক জরিপ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী, বর্তমানে ঢাকার বাইরে ডেঙ্গুর সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে ঝিনাইদহ, মাগুরা, পিরোজপুর ও পটুয়াখালী জেলার পৌরসভা এলাকা। ডেঙ্গুর বিস্তারের হার মাপার সূচক ‘ব্রুটো ইনডেক্স’ অনুযায়ী, ২০-এর বেশি হলে ওই এলাকাকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে ধরা হয়। জরিপ অনুযায়ী, ঝিনাইদহ পৌরসভায় এই সূচক ৬০ শতাংশ, মাগুরায় ৫৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ, পিরোজপুরে ২০ শতাংশ এবং পটুয়াখালীতে ১৯ দশমিক ২৬ শতাংশ।
আরও পড়ুন ডেঙ্গুর ধরন কয়টি, কোনটি বেশি মারাত্মক?গত বছরের নভেম্বরে আইইডিসিআরের জরিপেও উপকূলীয় এলাকার পানির পাত্রগুলোতে এডিস মশার লার্ভার ব্যাপক উপস্থিতি পাওয়া গিয়েছিল, যা এখন নতুন করে সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি করেছে। বিশেষ করে বরিশাল ও খুলনা বিভাগে আক্রান্তের হার অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) নিজস্ব জরিপে ৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৬৩টিতেই এডিস মশার ঘনত্ব নির্ধারিত মানের চেয়ে বেশি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ২৭টি ওয়ার্ডকে চিহ্নিত করা হয়েছে ডেঙ্গু সংক্রমণের জন্য ‘চরম ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে। বিপরীতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পুরোনো জরিপের তথ্যকে সামনে রেখে মশক নিধনের কাজ চালাচ্ছে।
ডেঙ্গুতে সব বয়সী মানুষ আক্রান্ত হলেও শিশু-কিশোর ও তরুণদের সংখ্যা বেশি। এমনকি নারীদের চেয়ে পুরুষ আক্রান্ত হচ্ছে দ্বিগুণ। শহুরে এই সংকট এখন গ্রামেও। হাসপাতালে আসা রোগীদের তথ্য সরকারি হিসাবে এলেও হিসাবের বাইরে থেকে যাচ্ছে হাসপাতালে না আসা রোগীরা।
বিগত ১০ বছরে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ঢাকার গড় তাপমাত্রা ও বাতাসের আর্দ্রতা বৃদ্ধি এক ভয়াবহ রূপান্তর এনেছে মশার প্রজনন চক্রে। আবহাওয়ার এই উষ্ণায়ন এডিস মশার ডিম থেকে পূর্ণাঙ্গ মশায় রূপান্তরের সময়কালকে প্রায় অর্ধেক করে দিয়েছে, যার ফলে মশার বংশবৃদ্ধির গতি বেড়েছে বহুগুণ।— স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. কামরুজ্জামান
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছরের জানুয়ারিতে এক হাজার ৮১ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। এছাড়া ফেব্রুয়ারিতে ৪০৯, মার্চে ৩৫৩, এপ্রিলে ৬৪০, মে মাসে ৭১৪, জুনে ২ হাজার ৯০৭ জন এবং জুলাইয়ের দুই দিনে ৩১০ জন ডেঙ্গুরোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এখন পর্যন্ত চলতি বছরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ১৯ জন।
সবশেষ তিন বছরের চিত্রএকই চিত্র ছিল আগের তিন বছরেও। ২০২৩ সালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে- জানুয়ারিতে ৫৬৬, ফেব্রুয়ারিতে ১৬৬, মার্চে ১১, এপ্রিলে ১৪৩, মে মাসে এক হাজার ৩৬, জুনে ৫ হাজার ৯৫৬, জুলাই মাসে ৪৩ হাজার ৮৫৪, আগস্টে ৭১ হাজার ৯৭৬, সেপ্টেম্বরে ৭৯ হাজার ৫৯৮, অক্টোবরে ৬৭ হাজার ৭৬৯, নভেম্বরে ৪০ হাজার ৭১৬ এবং ডিসেম্বরে ৯ হাজার ২৮৮ জন।
আরও পড়ুন ডেঙ্গুর যেসব লক্ষণ বিপজ্জনক ইঙ্গিত দেয়২০২৪ সালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে জানুয়ারিতে এক হাজার ৫৫, ফেব্রুয়ারিতে ৩৩৯, মার্চে ৩১১, এপ্রিলে ৫০৪, মে মাসে ৬৪৪, জুনে ৭৯৮, জুলাই মাসে ২ হাজার ৬৬৯, আগস্টে ৬ হাজার ৫২১, সেপ্টেম্বরে ১৮ হাজার ৯৭, অক্টোবরে ৩০ হাজার ৮৭৯, নভেম্বরে ২৯ হাজার ৬৫২ এবং ডিসেম্বরে ৯ হাজার ৭৪৫ জন।
এছাড়া, ২০২৫ সালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে জানুয়ারিতে এক হাজার ১৬১, ফেব্রুয়ারিতে ৩৭৪, মার্চে ৩৩৬, এপ্রিলে ৭০১, মে মাসে এক হাজার ৭৭৩, জুনে ৫ হাজার ৯৪৯, জুলাই মাসে ১০ হাজার ৬৮৪, আগস্টে ১০ হাজার ৪৯৬, সেপ্টেম্বরে ১৫ হাজার ৮৬২, অক্টোবরে ২২ হাজার ৫২০, নভেম্বরে ২৪ হাজার ৫৩৫ এবং ডিসেম্বরে ৮ হাজার ৪৬৪ জন।
চলতি বছরে (২০২৬ সালে) ডেঙ্গু আক্রান্তদের জেন্ডার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আক্রান্তদের মধ্যে নারী ৩৮ শতাংশ, পুরুষ ৬২ শতাংশ। তবে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মৃতদের মধ্যে নারীদের হার ৪৭ দশমিক ৪ শতাংশ, পুরুষ ৫২ দশমিক ৬ শতাংশ।
আরও পড়ুন ডেঙ্গু জ্বর সারানোর ঘরোয়া উপায় কী?এ বছর ডেঙ্গু আক্রান্তদের মধ্যে বেশিরভাগ কোলের শিশু থেকে চল্লিশ বছরের মধ্যে। এর চেয়ে বেশি বয়সীরাও আক্রান্ত হচ্ছেন, তবে সংখ্যা কম। আক্রান্তদের মধ্যে শহরের চেয়ে প্রায় তিনগুণ বেশি গ্রামের। যেমন- গত ছয় মাসে আক্রান্ত ৬ হাজার ৪১৪ জনের মধ্যে গ্রামের ৪ হাজার ৯৪০ এবং এক হাজার ৪৭৪ জন শহরের।
বছরজুড়ে আক্রান্তের কারণবিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ুর পরিবর্তন, বৃষ্টির অসামঞ্জস্য ও অপেক্ষাকৃত উষ্ণ তাপমাত্রা এই দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণের প্রধান কারণ।
পরিবেশ বিজ্ঞানী ও স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. কামরুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, বিগত ১০ বছরে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ঢাকার গড় তাপমাত্রা ও বাতাসের আর্দ্রতা বৃদ্ধি এক ভয়াবহ রূপান্তর এনেছে মশার প্রজনন চক্রে। আবহাওয়ার এই উষ্ণায়ন এডিস মশার ডিম থেকে পূর্ণাঙ্গ মশায় রূপান্তরের সময়কালকে প্রায় অর্ধেক (১৪ দিন থেকে কমিয়ে মাত্র ৭-৯ দিন) করে দিয়েছে, যার ফলে মশার বংশবৃদ্ধির গতি বেড়েছে বহুগুণ। একই সঙ্গে বাতাসে দীর্ঘ সময় ধরে ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ আপেক্ষিক আর্দ্রতা বজায় থাকায় মশার গড় আয়ু বেড়েছে, যা তাদের দীর্ঘ সময় ধরে ভাইরাস ছড়ানোর সুযোগ করে দিচ্ছে। ফলে আগে যা ছিল কেবল জুন-সেপ্টেম্বরভিত্তিক চার মাসের একটি নির্দিষ্ট মৌসুমি সমস্যা, তা এখন শীতের তীব্রতা হ্রাস এবং অকাল ও দীর্ঘায়িত বৃষ্টির কারণে বছরের প্রায় ৮ থেকে ৯ মাসব্যাপী একটি স্থায়ী সংকটে পরিণত হয়েছে। এটি ঢাকার প্রথাগত মশক নিধন ধারণাকে পুরোপুরি বদলে ফেলার দাবি রাখে।
পরিস্থিতির উত্তরণে কী বলছেন বিশেষজ্ঞরাডেঙ্গু এখন কেবল চিকিৎসা খাতের বিষয় নয়, এটি ‘জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যু’। সমাধান হিসেবে বিশেষজ্ঞরা ‘ইন্টিগ্রেটেড ভেক্টর ম্যানেজমেন্ট’র ওপর জোর দিচ্ছেন। ওয়ার্ডভিত্তিক লার্ভা শনাক্তকরণ, ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরি এবং রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে স্থানীয় ফ্ল্যাট মালিক সমিতি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এই কর্মসূচিতে সম্পৃক্ত করতে হবে। এটা করা না গেলে আগামী মাসের ডেঙ্গু ঢেউ সামলানো আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, এডিস মশা এখন তার আচরণ বদলেছে। আগে এটি শুধু পরিষ্কার পানিতে জন্মাতো, কিন্তু এখন ময়লা ও অপরিষ্কার পানিতেও এর বংশবিস্তার লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অথচ ডেঙ্গু ভাইরাসের স্ট্রেন বা জেনোমিক গঠনে কোনো পরিবর্তন এসেছে কি না, তা নিয়ে আমাদের দেশে বড় ধরনের গবেষণার ঘাটতি রয়েছে।— জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও রোগতত্ত্ববিদ ডা. তারেকুল ইসলাম লিমন
অধ্যাপক ড. কামরুজ্জামান বলেন, তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বৃদ্ধির কারণে দীর্ঘায়িত মশার প্রজনন মৌসুম মোকাবিলায় ঢাকাকে প্রচলিত মশক নিধন পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এজন্য বছরব্যাপী বৈজ্ঞানিক ও টেকসই কৌশল গ্রহণ করতে হবে। আবহাওয়া পূর্বাভাসের ডাটা বিশ্লেষণ করে কোন এলাকায় লার্ভার প্রকোপ বাড়তে পারে তা আগে থেকেই চিহ্নিত করা এবং জলজ মশার লার্ভা দমনে বিটিআই’র মতো পরিবেশবান্ধব জৈব কীটনাশক ও ওলবাকিয়া ব্যাকটেরিয়াযুক্ত বন্ধ্যা মশা অবমুক্ত করার মতো আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে নগরীর ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, ড্রোনের মাধ্যমে বহুতল ভবনের ছাদবাগান নজরদারি এবং প্রতিটি ওয়ার্ডে কীটতত্ত্ববিদদের নেতৃত্বে স্থায়ী তদারকি টিম গঠন করে মশা জন্মানোর উৎসগুলো শুরুতেই ধ্বংস করতে হবে। কারণ, জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে শুধু মৌসুমি ফগিং বা ধোঁয়া দিয়ে মশার এই দীর্ঘায়িত জীবনচক্র নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব।
আরও পড়ুন ছড়িয়ে পড়ছে ডেঙ্গু, বাঁচবেন যেভাবেবিশিষ্ট মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ জাগো নিউজকে বলেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতির ভয়াবহতা থেকে বাঁচতে এবং রোগটি নিয়ন্ত্রণে মশা নিধনই একমাত্র সমাধান। যেহেতু ডেঙ্গুর জন্য সাধারণ মানুষের মধ্যে গণহারে দেওয়ার মতো কোনো কার্যকর টিকা এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি, সেহেতু প্রতিরোধই একমাত্র পথ। তবে, এই সংকট দূর করা একা সরকার বা সিটি করপোরেশনের পক্ষে সম্ভব নয়। এজন্য প্রশাসন ও দেশের সাধারণ জনগণকে একসঙ্গে মাঠে নামতে হবে। উভয়ের সম্মিলিত ও সমন্বিত প্রচেষ্টা ছাড়া ডেঙ্গুর প্রকোপ থেকে মুক্তি পাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
এডিস মশার বংশবৃদ্ধি রোধে ঘরের ভেতরে ও বাইরে সমানভাবে কঠোর নজরদারি বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন এ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, বাড়ির আশপাশে ডাবের খোসা, পরিত্যক্ত টায়ার, প্লাস্টিকের পাত্র বা ফুলের টবে জমে থাকা বৃষ্টির পরিষ্কার পানি যেমন নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে, তেমনই বাসার বাথরুম, বারান্দা, এসি বা ফ্রিজের নিচে জমে থাকা পানিও নিয়মিত ফেলে দিতে হবে। পাশাপাশি ব্যক্তিগত সচেতনতার অংশ হিসেবে দিনের বেলা ঘুমানোর সময়ও মশারি ব্যবহার করতে হবে। শিশুদের সুরক্ষায় ফুল প্যান্ট ও ফুল হাতা জামা-কাপড় পরানোসহ মশা তাড়ানোর লোশন বা স্প্রে ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন এই বিশেষজ্ঞ।
কথা হয় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও রোগতত্ত্ববিদ ডা. তারেকুল ইসলাম লিমনের সঙ্গে। জাগো নিউজকে তিনি বলেন, ডেঙ্গু এখন আর কোনো একক সংস্থার একক দায়িত্বের বিষয় নয়, বরং এটি একটি বহুমাত্রিক সংকটে রূপ নিয়েছে। দীর্ঘ এই সময়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ কমার বদলে জটিল হওয়ার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তন ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের পাশাপাশি আমাদের সনাতন মশা নিধন পদ্ধতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার ঘাটতিই প্রধানত দায়ী।
আরও পড়ুন জ্বর হওয়ার কতদিনের মধ্যে কোন টেস্ট করলে ডেঙ্গু ধরা পড়ে?ডা. তারেকুল ইসলাম লিমন জানান, আগে ডেঙ্গুকে শুধু বর্ষাকালের রোগ মনে করা হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এখন সারা বছরই এর সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘায়িত বর্ষা, ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা— এডিস মশার প্রজননের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করছে। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, এডিস মশা এখন তার আচরণ বদলেছে। আগে এটি শুধু পরিষ্কার পানিতে জন্মাতো, কিন্তু এখন ময়লা ও অপরিষ্কার পানিতেও এর বংশবিস্তার লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অথচ ডেঙ্গু ভাইরাসের স্ট্রেন বা জেনোমিক গঠনে কোনো পরিবর্তন এসেছে কি না, তা নিয়ে আমাদের দেশে বড় ধরনের গবেষণার ঘাটতি রয়েছে। নিয়মিত ‘টাইম সিরিজ অ্যানালিসিস’ এবং প্রজাতির মূল্যায়ন না হওয়ায় সে অনুযায়ী কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা বা ইন্টারভেনশন তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আমাদের ত্রুটিপূর্ণ ও সনাতন ভেক্টর কন্ট্রোল বা মশা নিধন পদ্ধতি। মশা নিধনে যে ওষুধ ব্যবহার করা হচ্ছে, তার সঠিক নিয়ম বা প্রসিডিউর মানা হচ্ছে কি না— তা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে। মশার সুনির্দিষ্ট জোন বা হটস্পটগুলো চিহ্নিত না করে বর্তমানে গণহারে যে কোনো এক জায়গায় স্প্রে করার যে সংস্কৃতি চালু রয়েছে, তা কোনো কাজে আসছে না। ফলে মূল মশার জোনগুলো ওষুধের বাইরেই থেকে যাচ্ছে। পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে তৈরি হওয়া ঘিঞ্জি পরিবেশ এবং একটু বৃষ্টিতেই শহরের দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে।
সবশেষে তিনি নাগরিকদের আচরণগত সমস্যা ও উদাসীনতাকে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন। ডা. তারেকুল ইসলাম লিমন মনে করেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু সরকার বা সিটি করপোরেশনের ওপর দায় চাপালে চলবে না। সাধারণ মানুষের নিজেদের ঘরবাড়ি ও আশপাশ নিয়মিত পরিষ্কার না রাখার মানসিকতা এবং যেখানে-সেখানে ময়লা-আবর্জনা ফেলে কৃত্রিম প্রজননক্ষেত্র তৈরি করার অভ্যাস মশার বংশবৃদ্ধি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাই প্রাতিষ্ঠানিক ও বৈজ্ঞানিক পদক্ষেপের পাশাপাশি নাগরিক সচেতনতার আমূল পরিবর্তন ছাড়া এই বহুমাত্রিক সংকট থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়।
এসইউজে/কেএসআর/ এমএফএ