পটুয়াখালীর পর্যটননগরী কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতে অব্যাহত ভাঙন ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। পূর্ণিমার জোয়ার, বৈরী আবহাওয়া ও উত্তাল সাগরের ঢেউয়ে ঝুঁকিতে পড়েছে জিরো পয়েন্ট সংলগ্ন সমুদ্র সৈকত জামে মসজিদ, শ্রী শ্রী রাধাকৃষ্ণ মন্দির এবং ট্যুরিস্ট পুলিশ বক্সসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী, পর্যটনসংশ্লিষ্ট ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ। তারা দ্রুত স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
Advertisement
সরেজমিনে দেখা গেছে, কয়েকদিনের টানা জোয়ার ও উত্তাল ঢেউয়ে সৈকতের বিভিন্ন অংশে বালু সরে গিয়ে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। জোয়ারের সময় ঢেউ এসে উপকূলের অনেক ভেতর পর্যন্ত আঘাত হানছে। এতে সৈকতের পূর্ব ও পশ্চিম অংশে ভাঙনের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, জিরো পয়েন্টের পূর্বপাশে অবস্থিত সৈকত জামে মসজিদের সামনের বিস্তীর্ণ বালুচর এরইমধ্যে সরে গেছে। একইভাবে শ্রী শ্রী রাধাকৃষ্ণ মন্দিরের সামনেও স্পষ্ট ভাঙনের চিহ্ন দেখা দিয়েছে। ট্যুরিস্ট পুলিশের অস্থায়ী পুলিশ বক্সের নিচের মাটিও ধসে যেতে শুরু করায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, গত কয়েক বছর ধরেই কুয়াকাটা সৈকতের বিভিন্ন স্থানে ভাঙন দেখা দিলেও এবার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। পর্যটন মৌসুমে প্রতিদিন হাজার হাজার দর্শনার্থী এ এলাকায় আসেন। গুরুত্বপূর্ণ এসব স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হলে ধর্মীয় ও প্রশাসনিক সেবার পাশাপাশি দেশের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটার ভাবমূর্তিও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
Advertisement
স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. রাসেল রুম্মান বলেন, প্রতিদিন জোয়ারের সময় ঢেউ আগের চেয়ে অনেক বেশি ভেতরে চলে আসছে। কয়েক মাস আগেও যেখানে পর্যটকরা নিশ্চিন্তে হাঁটাচলা করতেন, এখন সেখানে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। মসজিদ, মন্দির ও পুলিশ বক্সের খুব কাছ পর্যন্ত পানি চলে আসছে। আমরা ব্যবসায়ীরা চরম উদ্বেগের মধ্যে আছি। দ্রুত স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে শুধু এসব স্থাপনাই নয়, আশপাশের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও পর্যটন অবকাঠামোও মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে।
ঢাকা থেকে আসা পর্যটক তাহমিদ হোসেন বলেন, কুয়াকাটার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে এসেছি, কিন্তু সৈকতের ভয়াবহ ভাঙনের দৃশ্য দেখে সত্যিই হতাশ হয়েছি। দেশের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্রের এমন অবস্থা মেনে নেওয়া যায় না। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং সৈকতের সৌন্দর্য রক্ষায় সরকারকে দ্রুত কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নিতে হবে।
কুয়াকাটা শ্রী শ্রী রাধাকৃষ্ণ মন্দির তীর্থযাত্রী সেবাশ্রমের সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী নিহার রঞ্জন মণ্ডল বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ড গত পাঁচ বছর ধরে বর্ষা মৌসুমে জরুরি ভিত্তিতে কিছু জিও ব্যাগ ফেলে অস্থায়ীভাবে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। প্রতিবছর একই সমস্যা দেখা দেয়। কুয়াকাটা দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন ও ধর্মীয় স্থান, তাই বার্ষিক বরাদ্দের মাধ্যমে স্থায়ী উপকূল সুরক্ষা প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। অন্যথায় শুধু মন্দির নয়, পুরো সমুদ্রসৈকতই একসময় ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে পড়বে।
ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব কুয়াকাটা’র (টোয়াক) সভাপতি রুমান ইমতিয়াজ তুষার বলেন, গত এক দশকে কুয়াকাটা ঘিরে শত শত কোটি টাকার বেসরকারি বিনিয়োগ হয়েছে। আধুনিক হোটেল, রিসোর্ট, রেস্টুরেন্ট, ট্রাভেল এজেন্সি ও বিভিন্ন পর্যটনসেবা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। কিন্তু সৈকতের ভাঙন এবং পর্যটকদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার বার্তা ছড়িয়ে পড়লে এই শিল্প বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে। এতে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হুমকির মধ্যে পড়বে। কুয়াকাটার টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে উপকূল রক্ষায় দ্রুত মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত জরুরি।
Advertisement
কলাপাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাহ আলম বলেন, কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের ভাঙন রোধে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রায় ৭৫৯ কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদিত হলে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সৈকত সংরক্ষণ, ভাঙন প্রতিরোধ এবং পর্যটন এলাকার স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এর পাশাপাশি জরুরি ভিত্তিতে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে অস্থায়ী সুরক্ষা কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে।
পটুয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য এবিএম মোশাররফ হোসেন বলেন, কুয়াকাটা শুধু পটুয়াখালীর নয়, এটি বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্র। এ এলাকার উন্নয়ন ও সমুদ্রসৈকত সংরক্ষণের বিষয়টি সরকার অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। সৈকতের ভাঙন রোধ, নান্দনিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা, আধুনিক পর্যটন অবকাঠামো নির্মাণ এবং আন্তর্জাতিক মানের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ চলছে। সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় কাজ করছে।
এফএ/এএসএম