দেশজুড়ে

দখল-দূষণে বিপন্ন দাউদকান্দির কালাডুমুর নদী

কালাডুমুর নদীরও ভরা যৌবন ছিলো। তার বুক দিয়ে প্রবাহমান থৈ থৈ পানিতে লঞ্চ-স্টিমার চলতো। নদী পাড়ের বাসিন্দাদের পানি ও মাছের চাহিদা পূরণ করতো। ব্যবসা বাণিজ্যের সারি সারি পাল তোলা নৌকা যাতায়াত করতো। বর্তমানে এগুলোর আর দেখা পাওয়া যায় না। এসব এখন প্রবীণ ও স্থানীয়দের স্মৃতিমাখা গল্প। দখল ও দূষণে মরা নদীতে পরিণত দাউদকান্দির কালাডুমুর নদীটি। নদী পাড়ের ৫০ হাজার বিঘা ফসলি জমি এখন সেচ সংকটে। এ কারণে রবি শস্য উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্থানীয় কৃষক।

Advertisement

সরেজমিন ঘুরে জানা যায়, কালাডুমুর নদীর উৎসমুখ গোমতী নদীর গৌরীপুর এলাকা। গৌরীপুরের এ উৎসমুখ ও ১৩ কিলিমিটারেরর মাথা ইলিয়টগঞ্জে ময়লা ফেলে ভরাট করা হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে খনন না হওয়ায় নদীটির পেট এখন পলি, আবর্জনা আর কচুরিপানায় ভরাট হয়ে আছে। এতে ব্যাহত হচ্ছে কুমিল্লা ও চাঁদপুর জেলার অন্তত চার উপজেলার হাজারো কৃষকের চাষাবাদ। কালাডুমুর নদীর দুই পাড়ের জেলার প্রায় লক্ষাধিক মানুষ এ নদীর পানির ওপর নির্ভরশীল।

নদীর গৌরীপুর থেকে ইলিয়টগঞ্জ ব্রিজ পর্যন্ত ১৩ কিলোমিটার অংশ খনন করা হলে হাসি ফুটবে কৃষকের মুখে। স্থানীয় কৃষক, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি ও নানা শ্রেণিপেশার নাগরিকরা নদীটি খননের জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন।

সিংঙ্গুলা গ্রামের কৃষক রহিম মোল্লা (৬৫), আদমপুর গ্রামের আশ্রাফ আলী (৬০), সুরুজ মিয়া (৬০) ও পুটিয়া গ্রামের হাবিল মিয়া (৭০) জানান, কালাডুমুর নদীর পানি দিয়ে আমরা বোরো ধানে সেচ দিয়ে আবাদ করি। একসময় এ নদী দিয়ে পালতোলা নৌকা চলতো। আমরা দলে বলে মাছ ধরতাম। এখন পানি নেই, ফসলও নেই আগের মতো। নদীটি শীঘ্রই পুনঃখনন করে খরা মৌসুমে পানিপ্রবাহ চলমান রাখার অনুরোধ জানাচ্ছি।

Advertisement

গৌরীপুর ভয়েজার ইংলিশ স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রিন্সিপাল মোহাম্মদ সুমন সরকার বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে গৌরীপুর বাজারের ময়লা-আবর্জনা কালাডুমুর নদীর উৎসমুখ এবং খালে ফেলা হচ্ছে। এতে ময়লা-আবর্জনার পচা দুর্গন্ধে আশপাশের বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং এলাকাবাসী অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে।’

ইলিয়টগঞ্জ নাগরিক পরিষদের আহ্বায়ক এস এম মিজান বলেন, ‘আমাদের ইলিয়টগঞ্জের অক্সিজেন কালাডুমুর নদী। চার-পাঁচটি জেলাঞ্চলের নৌবাণিজ্যিক প্রধান কেন্দ্র ছিলো ইলিয়টগঞ্জ হাট। এখন আবর্জনা ফেলে একরকম ধ্বংস করে ফেলছে। আমরা এর প্রতিকার চাই।’

নদী পাড়ের বাসিন্দা কৃষি উদ্যোক্তা ও জাতীয় কৃষি পদকপ্রাপ্ত মতিন সৈকত বলেন, 'নদীটি খননের দাবিতে কৃষকরা ১৯৯০ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে মানববন্ধন, সংবাদ সম্মেলন, প্রতীকী অনশন, কোদাল মিছিলসহ নানা কর্মসূচি পালন করে আসছেন। একই দাবিতে কৃষি মন্ত্রণালয়, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন, পানি উন্নয়ন বোর্ড, জেলা ও উপজেলা প্রশাসনে আবেদন করা হয়েছে।‘

গৌরীপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মো. আবুল হাসেম বলেন, ‘আমার সময়ে নদী প্রবাহমান ছিলো। বর্তমানে কালাডুমুর নদীর উৎসমুখে ময়লা ফেলে ভরাট করা হয়েছে। এতে গৌরীপুর ইউনিয়নসহ পাশের কয়েকটি ইউনিয়নের কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দ্রুত খননের দাবী জানাচ্ছি।’

Advertisement

দাউদকান্দি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নিগার সুতানা বলেন, ‘নদীর পানি দিয়ে এই অঞ্চলের চারটি উপজেলার অন্তত ৫০ হাজার বিঘা জমি চাষ হয়। নদীটি খনন করা জরুরি। তাহলে ফসল উৎপাদন দ্বিগুণ বেড়ে যাবে।’

দাউদকান্দি উপজেলা সহকারী কমিশনার ভূমি রেদওয়ান ইসলাম বলেন, 'নদীর উৎসমুখে ময়লা-আবর্জনা ফেলা বন্ধ করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এলাকার জনপ্রতিনিধি ও স্বেচ্ছাসেবীদের সাথে নিয়ে নদী মুখের ময়লা পরিষ্কার করার কাজ চলছে। তবে, নদীটি খনন কাজ শুরু হবে বলে জানতে পেরেছি।’

কেজে/এএসএম