দেশজুড়ে

যমুনার গ্রাসে বিলীন অর্ধশতাধিক বসতভিটা

এক সময় যে উঠোন শিশুদের হাসি আর খেলাধুলায় মুখর থাকতো সকাল-সন্ধ্যা, যে ঘরের প্রতিটি কোনায় জড়িয়ে ছিল পরিবারের অগণিত স্মৃতি আর স্বপ্ন, আজ সেখানে শুধুই যমুনার গর্জন। চোখের সামনে নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে একের পর এক বসতভিটা, ফসলি জমি আর সারা জীবনের তিল তিল করে গড়ে তোলা সঞ্চয়।

Advertisement

অসহায় চোখে মানুষ শুধু দেখছে, নদী কীভাবে গ্রাস করছে তাদের শেষ আশ্রয়টুকুও। পানি বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জামালপুরের বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ রূপ নিয়েছে নদীভাঙন। প্রতিটি ভাঙনের সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে এক একটি পরিবারের ঠিকানা, শৈশবের স্মৃতি, আর নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন।

জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার ডেবরাইপ্যাচ গ্রামের খয়রাত হোসেনের জীবনের গল্পই যেন নদীপাড়ের হাজারো মানুষের জীবনের প্রতিচ্ছবি।

স্ত্রী ও চার সন্তানকে নিয়ে যে বসতভিটায় কাটিয়েছেন জীবনের তিন দশকেরও বেশি সময়। সেই বাড়ি এখন গিলে খাচ্ছে যমুনার আগ্রাসী ভাঙন। বাঁশ, গাছ ও বিভিন্ন উপকরণ ফেলে ভাঙন ঠেকানোর শেষ চেষ্টা করেছেন। কিন্তু প্রবল স্রোতের কাছে সব প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছে। জীবনের শেষ বয়সে এসে নতুন করে মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজছে খয়রাত হোসেন। ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা আর অসহায়ত্বের ভার যেন আরও ভারী হয়ে উঠেছে তার কাঁধে।

Advertisement

শুধু খয়রাত হোসেন নন, ইসলামপুর উপজেলার ডেবরাইপ্যাচ, বকশীগঞ্জ উপজেলার কুতুবের চর ও বাঙ্গালপাড়া এবং দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার চর ডাকাতিয়াপাড়া সহ যমুনা, জিঞ্জিরাম ও দশআনি নদীর তীরবর্তী বিভিন্ন এলাকায় একই চিত্র। টানা এক সপ্তাহের ভাঙনে অর্ধশতাধিক ঘরবাড়ি ও বিঘা বিঘা ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে আরও শতাধিক বসতভিটা ও বিস্তীর্ণ কৃষিজমি। আতঙ্কে অনেকেই ঘরবাড়ি নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছেন, আবার কেউ শেষ সম্বলটুকু রক্ষার আশায় নদীর সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।

ভুক্তভোগী রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতিদিনই নদী একটু একটু করে ভাঙছে। কখন যে আমাদের ঘরটাও নদীতে চলে যায়, সেই আতঙ্কে দিন কাটছে। কোনো রকমে ঘরবাড়ি সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি। দ্রুত ভাঙন রোধে ব্যবস্থা না নিলে আমাদের মতো আরও অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে যাবে।’

স্থানীয় বাসিন্দা সৈকত মিয়া বলেন, ‘প্রতি বছরই নদীভাঙনের শিকার হচ্ছি। একবার নয়, একাধিকবার বসতভিটা হারিয়েছি। এখন আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। সরকার যদি দ্রুত স্থায়ী ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে পুরো এলাকাই নদীতে বিলীন হয়ে যাবে।’

আরেক ভুক্তভোগী সালাম মিয়া বলেন, ‘নদী শুধু আমাদের ঘরবাড়ি নয়, আবাদি জমিও কেড়ে নিচ্ছে। জীবিকা হারিয়ে অনেক পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করছে। আমরা চাই, জরুরি ভিত্তিতে ভাঙন রোধের কাজ শুরু হোক এবং দীর্ঘমেয়াদি নদীশাসনের ব্যবস্থা নেওয়া হোক।’

Advertisement

স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে ভাঙন চললেও স্থায়ী কোনো সমাধান হয়নি। দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নিলে চলতি মৌসুমে আরও বহু পরিবার সর্বস্ব হারাবে বলে আশঙ্কা তাদের।

এ বিষয়ে জামালপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নকিবুজ্জামান খান বলেন, ‘নদীভাঙনকবলিত এলাকাগুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ভাঙনের তীব্রতা বিবেচনা করে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পাশাপাশি বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। স্থায়ীভাবে ভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণের বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’

তবে নদীপাড়ের মানুষের প্রত্যাশা, শুধু আশ্বাস নয়, প্রয়োজন বাস্তব উদ্যোগ। তাদের দাবি, টেকসই নদীশাসন ও স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে যমুনার ভয়াল ভাঙন থেকে রক্ষা করা হোক জনপদ, যাতে কারো বসতভিটা নদীর গর্ভে হারাতে না হয়।

হৃদয় আহম্মেদ/কেজে/জেআইএম