খেলাধুলা

ট্রাম্পের এক ফোনেই বদলে গেলো ফিফার সিদ্ধান্ত! প্রশ্নের মুখে বিশ্বকাপ

ফিফাকে বলা হয় রাষ্ট্রের চেয়েও বড় রাষ্ট্র, জাতিসংঘের চেয়েও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান। ফিফার নিয়মের ব্যত্যয় পৃথিবীর যে কোনো ক্ষমতাধর রাষ্ট্রকেও কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেয়। ফিফার আইন লঙ্ঘন করার অধিকার বা শক্তি কারও নেই। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বকাপ আয়োজন করতে গিয়ে ফিফা দেখছে নানান অনিয়ম। সাধারণ মানুষ দেখছে যুক্তরাষ্ট্র প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অযাচিত হস্তক্ষেপে নষ্ট হচ্ছে বিশ্বকাপের সৌন্দর্য।

Advertisement

বিশ্বকাপের মাঠে এখন পর্যন্ত সরাসরি দেখা যায়নি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে। কিন্তু মাঠের বাইরে নেপথ্যে তার ভূমিকা নিয়েই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনা। যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগুনের লাল কার্ড বাতিল করে ফিফা যে নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তার পেছনে ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ ছিল কি না- সেই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে ফুটবল বিশ্বে।

সোমবার বেলজিয়ামের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচের আগে হঠাৎ করেই ফিফা ঘোষণা দেয়, বালোগুনের এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে। ফলে তিনি শেষ ষোলোর ম্যাচে খেলতে পারবেন। এই ঘোষণার কিছুক্ষণ পরই ট্রাম্প নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লেখেন, ‘যা সঠিক ছিল, সেটাই করেছে ফিফা। একটি বড় অন্যায়ের সংশোধন করার জন্য ধন্যবাদ।’

ট্রাম্পের এই বার্তাই নতুন করে উসকে দিয়েছে বিতর্ক।

Advertisement

কী হয়েছিল বালোগুনের?

শেষ ৩২-এর ম্যাচে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে ২-০ ব্যবধানে জয়ের ম্যাচে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম গোলটি করেছিলেন ফোলারিন বালোগুন। তবে ম্যাচের এক পর্যায়ে প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডার তারিক মুহারেমোভিচের সঙ্গে একটি চ্যালেঞ্জে জড়িয়ে পড়েন তিনি।

মাঠের রেফারি রাফায়েল ক্লাউস প্রথমে কোনো ফাউলই দেননি। কিন্তু ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারির (ভিএআর) পরামর্শে মনিটরে গিয়ে রিপ্লে দেখে সরাসরি লাল কার্ড দেখান বালোগুনকে। ধীরগতির রিপ্লেতে দেখা যায়, বলে ট্যাকল করার পর তার পা প্রতিপক্ষের গোড়ালির ওপর পড়ে।

ফিফা পরে জানায়, এটি ‘গুরুতর ফাউল’ হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় তাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এক ম্যাচ নিষিদ্ধ থাকতে হবে।

Advertisement

আপিলের সুযোগই ছিল না

ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্র ফুটবল ফেডারেশন ও ফিফা- দুই পক্ষই জানিয়েছিল, সরাসরি লাল কার্ডের বিরুদ্ধে আপিলের কোনো সুযোগ নেই। ফিফার শৃঙ্খলা বিধিও সেটিই বলে। কিন্তু ঠিক দুদিন পর সেই অবস্থানই পাল্টে যায়।

রোববার ফিফা জানায়, তাদের ডিসিপ্লিনারি কোডের অনুচ্ছেদ ২৭ অনুযায়ী বিচার বিভাগীয় কমিটি বিশেষ পরিস্থিতিতে কোনো শাস্তি আংশিক বা পুরোপুরি স্থগিত করতে পারে। সেই ক্ষমতাবলেই বালোগুনের এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়েছে।

তবে লাল কার্ডটি পুরোপুরি বাতিল হয়নি। এটি এক বছরের জন্য তার রেকর্ডে থাকবে। এই সময়ের মধ্যে একই ধরনের গুরুতর অপরাধ করলে তখন এই এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে।

কেন এত বিতর্ক?

সমালোচকদের মতে, ফিফা নিজেদেরই প্রতিষ্ঠিত নিয়ম ভেঙেছে। কারণ বিশ্বকাপের প্রতিযোগিতা বিধিমালা, সার্কুলার এবং ম্যাচপূর্ব সমন্বয় সভাগুলোয় স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছিল, সরাসরি লাল কার্ডের পর স্বয়ংক্রিয় নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে। ফলে ফিফার এই সিদ্ধান্তকে অনেকে নজিরবিহীন এবং বিতর্কিত বলছেন।

ট্রাম্পের ফোন কি বদলে দিল সিদ্ধান্ত?

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, বিশ্বস্ত সূত্রের দাবি অনুযায়ী, বুধবার থেকে শুরু করে ট্রাম্প অন্তত তিনবার ফিফার সঙ্গে যোগাযোগ করেন, যাতে বালোগুনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়। হোয়াইট হাউজ এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। ফিফাও বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলেনি।

আরও কিছু প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, হোয়াইট হাউজের ওয়ার্ল্ড কাপ টাস্কফোর্স- যার নেতৃত্বে আছেন অ্যান্ড্রু জুলিয়ানি, ভিডিও রিপ্লেতে ধীরগতির ফুটেজ ব্যবহার করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বৈধতা নিয়েও আইনি যুক্তি তুলে ধরেছিল।

যদি সেটিই সত্যি হয়, তাহলে ভবিষ্যতে ভিএআরভিত্তিক শাস্তির বিরুদ্ধে আইনি চ্যালেঞ্জের নতুন দরজা খুলে যেতে পারে।

আগেও এমন নজির আছে

ফিফার এই অনুচ্ছেদ ২৭ আগে খুব বেশি আলোচনায় না এলেও এবারই প্রথম নয়। এর আগে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর তিন ম্যাচের নিষেধাজ্ঞাও একই বিধান ব্যবহার করে কমিয়ে এক ম্যাচ করা হয়েছিল। ফলে তিনি বিশ্বকাপের গ্রুপপর্বে খেলতে পেরেছিলেন।

এরও বহু আগে ১৯৬২ বিশ্বকাপে ব্রাজিল কিংবদন্তি গ্যারিঞ্চা সেমিফাইনালে লাল কার্ড দেখেও ফাইনালে খেলেছিলেন। যদিও সেটি হয়েছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন সময়ের প্রেক্ষাপটে।

ক্ষুব্ধ বেলজিয়াম

বালোগুনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে বেলজিয়ামের শিবিরে। দলটির কোচ রুডি গার্সিয়া মাত্র ২৪ ঘণ্টা আগ পর্যন্ত পরিকল্পনা করেছিলেন বালোগুনকে ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্রকে মোকাবিলা করার। হঠাৎ করে সেই পরিকল্পনা বদলাতে হয়েছে।

বেলজিয়ান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন এক বিবৃতিতে ফিফার সিদ্ধান্তে বিস্ময় প্রকাশ করে জানিয়েছে, এটি বিশ্বকাপের নিজস্ব নিয়মের সঙ্গেই সাংঘর্ষিক।

তাদের ভাষায়, ‘এই সিদ্ধান্ত আমাদের বিস্মিত করেছে। এটি বিশ্বকাপ ২০২৬-এর প্রতিযোগিতা বিধিমালার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। স্বয়ংক্রিয় নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি সব অংশগ্রহণকারী দেশকে আগেই জানানো হয়েছিল। আমরা আমাদের অধিকার রক্ষায় সম্ভাব্য সব আইনি পথ খতিয়ে দেখছি।’

বিতর্ক এখানেই শেষ নয়

বালোগুন এখন বেলজিয়ামের বিপক্ষে মাঠে নামতে পারবেন। কিন্তু তার চেয়েও বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে ফিফার সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে। নিয়ম কি সবার জন্য সমান? নাকি বিশেষ পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা প্রশাসনিক বিবেচনায় সিদ্ধান্ত বদলে যেতে পারে?

বিশ্বকাপের মাঠে যুক্তরাষ্ট্র ও বেলজিয়ামের লড়াই শুরু হওয়ার আগে তাই মাঠের বাইরের এই বিতর্কই এখন ফুটবল বিশ্বে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে।

আইএইচএস/