ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের ওপর বর্বর নির্যাতন ও নিপীড়নের অভিযোগে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ও দেশটির বিচারমন্ত্রীর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য যুক্তরাজ্য (ইউকে) সরকারের প্রতি জোর আহ্বান জানিয়েছেন দেশটির ডজন খানেক আইনপ্রণেতা। স্কাই নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন দলের অন্তত ৭১ জন সংসদ সদস্য (এমপি) ও পিয়ার এ বিষয়ে গত সপ্তাহে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র সচিব ইভেট কুপারের কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন।
Advertisement
লেবার পার্টির এমপি নিল ডানকান-জর্ডানের নেতৃত্বে পাঠানো ওই চিঠিতে বর্তমান ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির ৩০ জন এমপি ও সাতজন পিয়ার অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। চিঠিতে বলা হয়েছে, ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের ওপর পদ্ধতিগত ও সুনিশ্চিতভাবে প্রমাণিত নির্যাতনের চূড়ান্ত দায়ভার প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুসহ ইসরায়েল সরকারের ওপরই বর্তায়।
আইনপ্রণেতারা পররাষ্ট্র সচিব ইভেট কুপারকে ইসরায়েলের এই ‘শাস্তিহীনতা বা দায়মুক্তির সংস্কৃতির অবসান’ ঘটাতে নেতানিয়াহু ও ইসরায়েলের উপ-প্রধানমন্ত্রী, বিচারমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী ইয়ারিভ লেভিনের (Yariv Levin) ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করার আহ্বান জানান।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, গত বছর ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থি মন্ত্রী ইতামার বেন-গাভির ও বেজালেল স্মোট্রিচের ওপর যে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল, তা ফিলিস্তিনি বন্দিদের প্রতি ইসরায়েল সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে ‘খুব সামান্যই ভূমিকা’ রেখেছে। বরং এরপর থেকে কোনো প্রকার শাস্তি ছাড়াই এই নির্যাতনের মাত্রা ‘আরও বহুগুণ বৃদ্ধি’ পেয়েছে।
Advertisement
এই প্রসঙ্গে গত ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে চিঠিতে। যেখানে বলা হয়েছিল, হেফাজতে নির্যাতন এবং জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি, গণহত্যা, জীবনধারণের সব উপায় ধ্বংস ও বঞ্চনার এক নিরলস অভিযানের মাধ্যমে ফিলিস্তিনি পুরুষ, নারী ও শিশুদের দমন ও শাস্তি দেওয়ার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।
ধর্ষণ মামলা প্রত্যাহার ও ব্রিটিশ নাগরিকদের আটক
চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, কয়েক মাস আগে ইসরায়েলি সেনাদের দ্বারা এক ফিলিস্তিনি বন্দিকে ধর্ষণের অভিযোগের একটি মামলা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তকে খোদ নেতানিয়াহু প্রকাশ্যে প্রশংসা করেছিলেন। এছাড়া, দুই মাস আগে যখন ‘গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা’ নামক একটি ত্রাণবাহী নৌবহর গাজার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিল ও ইসরায়েলি বাহিনী আন্তর্জাতিক জলসীমায় সেটিকে বাধা দিয়েছিল, তখন বেশ কয়েকজন ব্রিটিশ নাগরিককে অন্যায়ভাবে সেখানে আটক করা হয়েছিল।
এই চিঠিতে যুক্তরাজ্যের গ্রিন পার্টি, প্লেইড কামরি, সিন ফেইন , এসডিএলপি, লিবারেল ডেমোক্র্যাটস, স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টির আইনপ্রণেতাদের পাশাপাশি একজন কনজারভেটিভ বা রক্ষণশীল পার্টির এমপি-ও স্বাক্ষর করেছেন।
Advertisement
যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিক্রিয়া
এই বিষয়ে যুক্তরাজ্যের ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিসের এক মুখপাত্র স্কাই নিউজকে বলেন, ইসরায়েলি বাহিনীর দ্বারা বন্দিদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের রিপোর্টগুলো অত্যন্ত লজ্জাজনক ও আমরা ইসরায়েল সরকারের কাছে এই বিষয়টি উত্থাপন করেছি। সব বন্দির সঙ্গে মানবিক মর্যাদা ও আন্তর্জাতিক আইন মেনে আচরণ করতে হবে এবং যে কোনো ধরণের নির্যাতন বা দুর্ব্যবহারের অভিযোগের পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত হওয়া আবশ্যক। যুক্তরাজ্য ইসরায়েল সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে যেন তারা ‘আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি’-কে অবিলম্বে ও কোনো বাধা ছাড়াই সব বন্দিশালায় প্রবেশের অনুমতি দেয়।
মুখপাত্রটি আরও যোগ করেন, শত শত ফিলিস্তিনি শিশুকে কোনো অভিযোগ ছাড়াই মাসের পর মাস ইসরায়েলি হেফাজতে আটকে রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের মানবাধিকার পরিস্থিতি
গত মার্চ মাসে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের মানবাধিকার পরিস্থিতি বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ কর্মকর্তা ফ্রান্সেসকা আলবানিজ জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলে দেওয়া তার প্রতিবেদনে বলেছিলেন, ইসরায়েলি কারাগার ব্যবস্থা মূলত এক ধরণের ‘পরিকল্পিত নিষ্ঠুরতার পরীক্ষাগারে’ পরিণত হয়েছে। যেখানে বোতল, লোহার রড ও ছুরি দিয়ে ফিলিস্তিনিদের নারীদের ওপর নির্যাতন করার মতো ভয়াবহ কর্মকাণ্ড অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় ইসরায়েলি গণহত্যা শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ১০০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি বন্দি ইসরায়েলি হেফাজতে মারা গেছেন বলে জানা গেছে। তবে এটি ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করা হয় যে, প্রকৃত চিত্রটি এর চেয়েও অনেক বেশি হতে পারে।
এর আগে ২০২৪ সালের নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগে নেতানিয়াহু ও তার সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালন্টের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছিল।
এসএএইচ