২ জুলাই। গভীর রাত। ইন্ডিয়ানার ওয়েস্ট লাফায়েত তখনো নিস্তব্ধ ঘুমে আচ্ছন্ন। অথচ আমাদের ঘরে তখন অন্যরকম ব্যস্ততা। বহুদিনের লালিত স্বপ্ন অবশেষে বাস্তবের পথে যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে। বিশ্বের অন্যতম বিস্ময় নায়াগ্রা ফলসকে কাছ থেকে দেখার ইচ্ছা আমার বহুদিনের। কিন্তু সেই ইচ্ছাপূরণের দিনক্ষণ বারবার পিছিয়ে যাচ্ছিল। মূল বাধা ছিল জামাই সুদীপ্তর কর্মব্যস্ততা। ছুটি মিলছিল না কোনোভাবেই। অবশেষে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ৪ জুলাইয়ের সরকারি ছুটি নিশ্চিত হতেই আমরা আর দেরি করলাম না। সিদ্ধান্ত হলো, ২ জুলাই গভীর রাতেই রওয়ানা দেব, যাতে হাতে পর্যাপ্ত সময় নিয়ে নায়াগ্রার প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করা যায়। গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে সুদীপ্ত। তার পাশে আমি। পেছনের সারিতে নাতনি বাঁশরী দিদিভাই, তারপর আমার সহধর্মিণী ময়না, বড় মা মনি, ছোট মা মনি এবং আমার বেয়ান বিউটি দিদি। রাতের আঁধার ধীরে ধীরে ভোরের আলোয় বদলে যেতে লাগল। মহাসড়কের দুই পাশের সবুজ প্রান্তর, ছোট ছোট জনপদ আর অনন্ত পথ যেন আমাদের একটি বিশেষ দিনের দিকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে।
Advertisement
দুপুর প্রায় দুটায় আমরা পৌঁছলাম নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের বাফেলো শহরে। দীর্ঘ পথযাত্রার ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলতে আগে থেকেই বুকিং করা এয়ারবিএনবিতে গিয়ে কিছুটা বিশ্রাম নিলাম, ফ্রেশ হলাম। কিন্তু সেদিনের আসল গন্তব্য ছিল অন্য কোথাও। কিছুক্ষণ পর আমরা রওয়ানা দিলাম ১০১৯ ক্লিভল্যান্ড ড্রাইভের একটি বাড়ির উদ্দেশে। বাইরে থেকে দেখলে সেটি ছিল বাফেলোর একটি অভিজাত এলাকার সুদৃশ্য বাড়ি। কিন্তু আমার কাছে সেটি ছিল কেবল একটি বাড়ি নয়, ছিল বহুদিনের হারিয়ে যাওয়া স্নেহের ঠিকানা। সেখানে যাচ্ছিলাম কোনো আনুষ্ঠানিক নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে নয়; যাচ্ছিলাম জীবনের অমূল্য সম্পর্কের টানে, এমন ভালোবাসার কাছে, যার উষ্ণতা বত্রিশ বছরের দীর্ঘ ব্যবধানও একটুও ম্লান করতে পারেনি। কিছু সম্পর্ক রক্তের বন্ধনে গড়ে ওঠে না, গড়ে ওঠে আন্তরিকতা, মমতা আর নিঃস্বার্থ ভালোবাসার স্পর্শে। সময়ের স্রোত, দূরত্বের প্রাচীর কিংবা জীবনের ব্যস্ততা সেই সম্পর্ককে হয়তো আড়াল করে রাখে, কিন্তু মুছে দিতে পারে না। বাফেলোর পথে যেতে যেতে আমার মন বারবার ফিরে যাচ্ছিল সেই অতীতে, যেখানে জীবনের অনন্য অধ্যায় আজও সমান উজ্জ্বল হয়ে জেগে আছে। সেই গল্পের শুরু আজ থেকে ঠিক বত্রিশ বছর আগে, জামালপুর শহরে।
আরও পড়ুন শিকাগোর বুকে দর্শন ও বিশ্বাসের অনুপম মিলনক্ষেত্র১৯৯২ সালের শেষদিকে চাকরির সুবাদে আমার বদলি হয়েছিল জামালপুরে। নতুন অফিস ভাড়া নিয়েছিলাম বকুলতলার কাছে। তখন আমি ব্যাচেলর। চলাফেরার সঙ্গী ছিল একটি ১০০ সিসি হোন্ডা মোটরসাইকেল। ছোট্ট একটি সরকারি অফিস। হাতেগোনা কয়েকজন সহকর্মী ছিলেন, একজন অফিস সহকারী, একজন হিসাবরক্ষক, একজন পিয়ন এবং একজন নাইটগার্ড। নতুন শহর, নতুন সরকারি অফিস, নতুন দায়িত্ব আর নতুন মানুষকে ঘিরেই শুরু হয়েছিল আমার জামালপুর অধ্যায়। প্রতিদিন সকালে নাস্তা করতাম দয়াময়ী মোড়ের বিখ্যাত বুড়ি মার মিষ্টির দোকানে। শহরের বিশিষ্টজনদের আড্ডার অন্যতম কেন্দ্র ছিল সেই দোকান। সেখানে প্রতিদিন রাজনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি নিয়ে কত আলোচনা যে চলত, তার কোনো হিসাব নেই। সেখানেই একদিন পরিচয় হলো জামালপুরের এক উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষিকা কস্তুরী বসুর সঙ্গে। প্রথম দেখাতেই তাঁর আন্তরিক হাসি, সহজ-সরল ব্যক্তিত্ব, বিনয় আর মমতা আমাকে আপন করে নিয়েছিল। অচেনা শহরে তিনি যেন মুহূর্তের মধ্যেই আমার একান্ত আপনজন হয়ে উঠলেন। তাঁর বাড়ি ছিল দয়াময়ী মন্দিরের সামনে। একসময় তাঁর স্বামীর পরিবার জামালপুর শহরের অন্যতম প্রভাবশালী ও সম্পদশালী পরিবার হিসেবে পরিচিত ছিল। সময়ের ব্যবধানে সেই জৌলুস হয়তো কিছুটা ম্লান হয়ে এসেছিল, কিন্তু তাঁদের পারিবারিক সৌজন্য, সংস্কৃতি এবং হৃদয়ের ঐশ্বর্য বিন্দুমাত্র কমেনি। পরিচয়ের দিনই সন্ধ্যায় তাঁর বাড়িতে গেলাম। তারপর ধীরে ধীরে সেই বাড়িটিই যেন আমার দ্বিতীয় ঠিকানায় পরিণত হলো। প্রায় প্রতিদিনই সেখানে যেতাম, একসঙ্গে খেতাম, গল্প করতাম, হাসতাম। মাসিমার স্নেহে কখন যে নিজের মায়ের অভাব অনেকখানি ভুলে গিয়েছিলাম, তা নিজেও বুঝিনি। দূরের একজন মানুষকে তিনি নিজের সন্তানের মতো আগলে রেখেছিলেন।
মাসিমার একমাত্র ছেলে বাবু (অমিত কুমার দেব) তখন দশম শ্রেণির ছাত্র। অল্প দিনের মধ্যেই সে হয়ে উঠেছিল আমার আপন ছোট ভাই। বয়সের ব্যবধান থাকলেও হৃদয়ের দূরত্ব ছিল না একটুও। এরপর সময় তার নিজস্ব নিয়মে এগিয়ে গেল। দেড় বছরের মাথায় আমার বিয়ে হলো। ১৯৯৪ সালের জুন মাসে ঢাকায় বদলি হয়ে নতুন সংসার শুরু করলাম। বিদায়ের দিন বুকভরা ভালোবাসা, অগণিত আশীর্বাদ আর অশ্রুসজল চোখ নিয়ে জামালপুর ছেড়ে এসেছিলাম। তারপর জীবনের ব্যস্ততা, দায়িত্ব আর সময়ের স্রোতে সেই পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ প্রায় হারিয়েই গেল। শুধু শুনেছিলাম, মাসিমা বড় মেয়ের কাছে আমেরিকায় স্থায়ীভাবে চলে গেছেন। বাবু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চারুকলায় স্নাতকোত্তর শেষ করে জীবনের বহু চড়াই-উতরাই পেরিয়ে অবশেষে আমেরিকায় নিজের অবস্থান গড়ে তুলেছে। এখন সে বাফেলো শহরের নিজস্ব বাড়িতে থাকে।
Advertisement
২০২৪ সালে প্রথম আমেরিকায় আসার সময় বাবু ফোন করে খোঁজ নিয়েছিল। কিন্তু এবার ঘটনাটা আরও হৃদয়স্পর্শী। বাবু আমার সাথে মেসেঞ্জারে কথা বলে এবং আমাদের ভ্রমণের প্ল্যান জানতে চায়। আমি নায়াগ্রা ফলসে যাওয়ার পরিকল্পনার কথা বলতেই বাবুর একটি কথা ভেসে এলো, ‘দাদা, নায়াগ্রা ফলস যেতে হলে আমার বুকের ওপর দিয়ে যেতে হবে। আপনি কি আপনার ছোট ভাই বাবুকে না দেখে চলে যাবেন?’ একটি মাত্র বাক্য। কিন্তু সেই একটি বাক্যই যেন মুহূর্তের মধ্যে আমাকে বত্রিশ বছর আগের জামালপুরে ফিরিয়ে নিয়ে গেল। চোখের সামনে ভেসে উঠল দয়াময়ী মোড়, বুড়ির মিষ্টির দোকান, মাসিমার স্নেহভরা মুখ আর সেই ছোট্ট বাবু। মনে হলো, এত বছর পরও স্মৃতিগুলো কোথাও হারিয়ে যায়নি বরং সময়ের গভীরে নীরবে জেগে ছিল। আমি আর কোনো দ্বিধা করিনি। সিদ্ধান্ত নিলাম, সবার আগে যাব বাবুর বাড়িতে, তারপর নায়াগ্রা ফলসের পথে রওয়ানা দেব।
বাড়ির দরজায় পৌঁছাতেই বাবু ছুটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল। সেই আলিঙ্গনে ছিল বত্রিশ বছরের অপেক্ষা, অগণিত স্মৃতি আর অটুট ভালোবাসা। মনে হচ্ছিল, সময় যেন কোথাও থেমে আছে। ছোট ভাইটি আজ প্রতিষ্ঠিত, পরিণত, নিজের সংসারের কর্তা। অথচ তার চোখের উচ্ছ্বাসে আমি সেই দশম শ্রেণির কিশোর বাবুকেই খুঁজে পেলাম। তার সহধর্মিণী নন্দিতা দেব লিপি যেন অতিথি নয়, আপনজনের অপেক্ষাতেই ছিলেন। কত রকম বাঙালি খাবার যে রান্না করেছেন! প্রতিটি পদে ছিল আন্তরিকতার স্বাদ, প্রতিটি আয়োজনে ছিল শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার স্পর্শ। বিদেশের মাটিতে বসে মনে হচ্ছিল, যেন বাংলাদেশেরই কোনো আপন ঘরে দুপুরের আহারে বসেছি। খাবারের টেবিলে গল্পের শেষ ছিল না। মাসিমার স্মৃতি, জামালপুরের দিনগুলো, জীবনের সংগ্রাম, স্বপ্ন এবং সাফল্যের নানা গল্পে আমরা এতটাই ডুবে গিয়েছিলাম যে, কখন বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা নেমে এসেছে, তা টেরই পাইনি। সময় যেন সেদিন স্মৃতির আবেশে থমকে দাঁড়িয়েছিল। অবশেষে সন্ধ্যার আলো গাঢ় হতে শুরু করলে আমরা নায়াগ্রা ফলসের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম।
আরও পড়ুন আটলান্টা থেকে ওয়েস্ট লাফায়েত: পথে পথে জীবনের গল্পদিনের আলো তখন ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে। চারদিকে মানুষের ঢল। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আসা হাজারো মানুষের চোখে একই রকম বিস্ময়ের প্রতীক্ষা। ঠিক রাত দশটায় হঠাৎ আকাশজুড়ে রঙের বিস্ফোরণ ঘটল। শুরু হলো নায়াগ্রার বিখ্যাত আতশবাজির উৎসব। মুহূর্তের মধ্যেই অন্ধকার আকাশ রঙিন আলোর এক বিশাল ক্যানভাসে পরিণত হলো। লাল, নীল, সোনালি, রুপালি ও বেগুনি রঙের আলোর ফুল একের পর এক ফুটে উঠছে, আবার মিলিয়ে যাচ্ছে রাতের আকাশে। প্রতিটি আলোর রেখা যেন ছুটে গিয়ে মিশে যাচ্ছিল গর্জনরত জলপ্রপাতের শুভ্র কুয়াশার সঙ্গে। জল আর আলোর অপূর্ব মেলবন্ধনে সৃষ্টি হচ্ছিল এক স্বর্গীয় দৃশ্য, যা ভাষায় বর্ণনা করা সত্যিই কঠিন। অবিরাম গর্জনে নেমে আসা নায়াগ্রার জলধারা যেন সেই আলোর উৎসবকে আরও মহিমান্বিত করে তুলছিল। কুয়াশাভেজা শীতল বাতাস মুখে এসে স্পর্শ করছিল, আর মনে হচ্ছিল প্রকৃতি যেন নিজেই আনন্দের এক মহাউৎসবে মেতে উঠেছে। চারদিকে মানুষের বিস্ময়ভরা উচ্ছ্বাস, করতালি, শিশুদের নির্মল হাসি এবং ক্যামেরার অবিরাম ঝলকানিতে পুরো পরিবেশ প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছিল। সবকিছু মিলিয়ে সেই রাতটি আমার জীবনের এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়। তখন উপলব্ধি করলাম, নায়াগ্রার সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য শুধু তার বিশাল জলপ্রপাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তার প্রকৃত সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে প্রকৃতির অপরূপ মহিমায়, মানুষের বিস্মিত দৃষ্টিতে, সম্পর্কের গভীরতায় এবং ভালোবাসার অদৃশ্য টানে।
একটি মেসেঞ্জার বার্তা, একটি উষ্ণ আলিঙ্গন, একটি পরিবারের আন্তরিক আপ্যায়ন এবং নায়াগ্রার রঙিন সন্ধ্যা সব মিলিয়ে ২ জুলাই আমার জীবনের ভ্রমণপঞ্জিতে শুধু একটি ভ্রমণের দিন হয়ে থাকেনি। দিনটি হয়ে উঠেছে সম্পর্ক, স্মৃতি, ভালোবাসা এবং বহুদিন পর পুনর্মিলনের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। রাত গভীর হলে আমরা ফিরে এলাম আমাদের এয়ারবিএনবির নীরব ও শান্ত আশ্রয়ে। মনে হলো, সময় মানুষের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করতে পারে, কিন্তু সত্যিকারের ভালোবাসা, আন্তরিকতা এবং হৃদয়ের টান কোনো দূরত্বকেই শেষ পর্যন্ত স্থায়ী হতে দেয় না।
Advertisement
এসইউ