ফিচার

মুক্তিযুদ্ধে ফুটবল ছিল অস্ত্র, স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের ইতিহাস জানেন?

বিশ্বজুড়ের চলছে ফুটবল-উন্মাদনা। একেকটি ম্যাচ একেকভাবে চমক দিচ্ছে ফুটবলপ্রেমীদের। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় কিছু মানুষ এই ‘ফুটবলকেই’ আশ্রয় করে সারাবিশ্বের মানুষের মনোযোগ কেড়েছিল। দেশের পক্ষে সমর্থন আদায়ে তাদের ‘হাতিয়ার’ ছিল ফুটবল। মুক্তিযুদ্ধের অনন্য সেনানী স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের আদ্যোপান্ত জানাচ্ছেন আমির খসরু সেলিম-

Advertisement

১৯৭১ সালের জুন মাস। মুক্তিযুদ্ধ তখন সংগঠিত হয়েছে। শামসুল হকের চেষ্টায় কলকাতায় প্রতিষ্ঠা পায় বাংলাদেশ ক্রীড়াসমিতি। আলোচনায় বেরিয়ে আসে, একটা ফুটবল টিম গঠন করা হবে। দলটি ভারতজুড়ে খেলবে। সমর্থন আদায় করবে স্বাধীন বাংলার স্বীকৃতির জন্য। অর্থ সংগ্রহ করবে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য। দলগঠন করার কাজে এগিয়ে এলেন সমিতির প্রথম সেক্রেটারি লুতফর রহমান, কোচ আলী ইমাম ও ইস্ট এন্ড ক্লাবের সাবেক ফুটবলার সাঈদুর রহমান প্যাটেল।

অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের স্বাক্ষরিত চিঠিতে ‘স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের’ কথা উল্লেখ করে খেলোয়াড়দের সেখানে যোগ দিতে বলা হয়। বিষয়টিকে আরও ছড়িয়ে দিতে সাহায্য নেওয়া হলো ভারতীয় বেতার আকাশবাণীর।

যুদ্ধের সংঘর্ষ এড়িয়ে শেষ পর্যন্ত জনাতিরিশেক ফুটবলার একত্র হতে পারলেন। তাদের চোখে ভিন্ন স্বপ্ন। এই তিরিশজন থেকে বাছাই করা হয় পঁচিশজনকে। পরে অবশ্য ভারত সফরের সময় দলে অনেক রদবদল হয়। কলকাতার পার্ক সার্কাস এভিনিউয়ের কোকাকোলা বিল্ডিংয়ের একটি রুমে থাকতেন ফুটবলাররা। অনুশীলন করতেন পাশের মাঠে।

Advertisement

দলটি ২৩ জুলাই মুজিবনগর থেকে নদিয়ায় আসে। তাদের অভ্যর্থনা জানান সেখানকার ডিসি দীপক কান্ত ঘোষ এবং স্পোর্টস এসোসিয়েশনের কর্মকর্তারা। ২৪ জুলাই স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল লাল-সবুজের জার্সি পড়ে প্রথমবারের মতো মাঠে খেলতে নামে কৃষ্ণনগর স্টেডিয়ামে। প্রথম প্রতিপক্ষ ছিল কৃষ্ণনগর একাদশ। ম্যাচ দেখতে অসংখ্য বাংলাদেশী চলে আসে মেহেরপুর সীমান্ত দিয়ে।

আরও পড়ুন আর্জেন্টিনার জার্সির পেছনে ‘১৮৯৩’ লেখার কারণ জানেন?

খেলা শুরুর আগে জাতীয় সংগীত পরিবেশিত হয়। খেলোয়াড়রা লাল-সবুজ পতাকা নিয়ে মাঠ প্রদক্ষিণ করেন। কি অসাধারণ এক দৃশ্য! দেশের মাটিতে হানাদারদের বিরুদ্ধে লড়াই করে চলছেন অসংখ্য বাঙালি। ঠিক তখনই বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের পরিচয়কে প্রতিষ্ঠিত করতে মাঠে নামছেন ফুটবলাররা। এ যেন মুক্তিযুদ্ধের ভিন্ন দিক! খেলা ২-২ গোলে ড্র হয়। কিন্তু প্রত্যয় আর উচ্ছ্বাসের কোনো কমতি ছিল না। কিন্তু বাদ সাধে বিশ্বমিডিয়া। যেহেতু তখনো বাংলাদেশ স্বাধীনরাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি, তাই নানারকম তর্ক বাঁধে সেসব নিয়ে। সাসপেন্ড হন নদিয়ার জেলা প্রশাসক। ভারতীয় ফুটবল এসোসিয়েশন (আইএফএ) বাধ্য হয় নদিয়া ফুটবল এসোসিয়েশনের সহযোগি পদ বাতিল করতে।

আরও পড়ুন বিশ্বকাপ ফুটবলে নরওয়ের ভাইরাল উদযাপন, কী এই ‘ভাইকিং রো’

২০১৭ সালে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের অধিনায়ক জাকারিয়া পিন্টুর সাক্ষাৎকার নেওয়ার সুযোগ হয়েছিল আমার। সেসময় তিনি স্মৃতিচারণ করেছিলেন স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের উত্থান এবং পথচলার। তিনি বলেছিলেন, ‘এই ঘটনার পর প্রতিপক্ষ আর অফিসিয়াল নাম ব্যবহার করতে পারেনি। এমনকি মোহনবাগান খেলেছে গোষ্টপাল একাদশ নামে। মজা হয়েছিল মুম্বাইয়ে। মহারাষ্ট্র একাদশের হয়ে খেলেছিলেন স্বয়ং নবাব মনসুর আলী খান পতৌদি এবং আমাদের বিপক্ষে একটি গোলও করেন। আমার এখনো চোখে ভাসে, স্বয়ং দিলীপ কুমার এসেছিলেন ম্যাচটি দেখতে এবং ২০ হাজার রুপি অনুদানও দেন দলকে।’

ভারতের মাটিতে খেললেও দলটির যাত্রা মোটেও সহজ ছিল না। পাকিস্তান ফুটবল ফেডারেশন অভিযোগ করেছিল ফিফার কাছে। আন্তর্জাতিক ফুটবলের নানা বাঁধা সামনে এসে দাঁড়াচ্ছিল। ফুটবলারদের আত্মীয়স্বজনেরা নানাভাবে আক্রান্ত হচ্ছিলেন পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে। তবুও দমেননি বীরের দল। এগিয়ে গেছেন অদম্য সাজে।

Advertisement

বিভিন্ন এলাকায় মোট ১৬টি ম্যাচ খেলে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল। ম্যাচগুলো থেকে পাওয়া পাঁচলাখ টাকা মুক্তিযুদ্ধের ফান্ডে জমা দেওয়া হয়। ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয়ের পর দেশে ফেরেন দলের সদস্যরা। যুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের ফুটবলকে চাঙ্গা করতে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল কাজ করে দীর্ঘদিন।

২০০৯ সালে এই দলকে নিয়ে তৈরি হয়েছে ১৯ মিনিট দৈর্ঘ্যরে তথ্যচিত্র ‘মুক্তির জন্য ফুটবল’। পরিচালক খিজির হায়াত খান পরিচালিত চলচ্চিত্র ‘জাগো’ তৈরির মূল অণুপ্রেরণা এই স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে জনমত অর্জনের কাজ ভালভাবেই করে। মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করতে খেলার মাধ্যমেই তারা অর্থ সংগ্রহ করে। পৃথিবীর ইতিহাসে এটাই প্রথম যুদ্ধকালীন ফুটবল দল। পরে ফিলিস্তিনি ফুটবল দলকেও এধরনের কাজে অংশ নিতে দেখা গেছে।

আরও পড়ুন শিশুদের হাত ধরে কেন মাঠে আসেন খেলোয়াড়রা? জানুন এর রহস্য একনজরে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল

ম্যানেজার: তানভীর মাজহারুল ইসলাম তান্না, কোচ: ননীবসাক, জাকারিয়া পিন্টু (অধিনায়ক), প্রতাপ শংকরহাজরা (সহ-অধিনায়ক), কাজী সালাউদ্দিন, কে এন নওশেরুজ্জামান, মেজর জেনারেল (অব.) খন্দকার নুরুন্নবী, তসলিমউদ্দিন শেখ, আইনুল হক, ফজলে হোসাইন খোকন, লুৎফর রহমান, শেখ আশরাফ আলী, অমলেশ সেন, আবুল হাকিম, আমিনুল ইসলাম সুরুজ, বিমল কর, সুভাষ চন্দ্র সাহা, মুজিবর রহমান, মোহাম্মদ কায়কোবাদ, ছিরু, সাত্তার, সনজিত কুমার দে, আব্দুল মমিন জোয়ারদার, সাঈদুর রহমান প্যাটেল, মনিরুজ্জামান পেয়ারা, এনায়েতুর রহমান খান, শাহজাহান আলম, অনিরুদ্ধ চ্যাটার্জি, নিহারকান্তি দাস, প্রাণগোবিন্দ কুন্ডু, আলী ইমাম, মনসুর আলী লালু, মাহমুদুর রশিদ, আমিনুল ইসলাম, দেওয়ান মোহাম্মদ সিরাজউদ্দিন প্রমুখ।

কেএসকে