প্রবাস

জার্মানির বিলাসী জীবনের আড়ালে যে গল্প ঢাকা পড়ে যায়

এমকে হক, জার্মানি

Advertisement

ফেসবুকের নিউজফিড স্ক্রল করলেই চোখে পড়ে প্রবাসীদের সুন্দর সুন্দর ছবি আর সফলতার গল্প। ঝকঝকে রাস্তা, ইউরোপের নান্দনিক স্থাপত্য কিংবা ক্যাফেতে বসে কফির কাপে চুমুক দেওয়ার হাসিমুখগুলো দেখে দেশের মানুষের মনে হতে পারে- প্রবাস মানেই বুঝি এক টুকরো স্বর্গ। কিন্তু বাস্তবতার জমিনটা সম্পূর্ণ ভিন্ন।

সেই চকচকে হাসিমুখগুলোর পেছনে যে কতটা কঠোর পরিশ্রম, আত্মত্যাগ আর মানসিক টানাপোড়েন লুকিয়ে থাকে, সেই রিয়েল স্টোরিটা সাধারণত সোশ্যাল মিডিয়ার ফ্রেমে বন্দি হয় না।

বাংলাদেশ থেকে যখন কেউ উচ্চশিক্ষা, আউসবিল্ডুং কিংবা চাকরির উদ্দেশ্যে প্রথমবার জার্মানি আসেন, তখন শুরুর দিনগুলো মোটেও রূপকথার মতো সহজ হয় না। দেশ থাকতে যারা হয়তো কোনোদিন নিজের ঘরের এক কোনায় পড়ে থাকা ময়লাটাও হাত দিয়ে তোলেননি, এখানে আসার পর তাদের লাইফস্টাইল একদম ৩৬০ ডিগ্রি বদলে যায়।

Advertisement

সকালে কনকনে ঠান্ডার মধ্যে ঘুম থেকে উঠে ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাসে দৌড়ানো। ক্লাস শেষ হতেই একটুও জিড়িয়ে নেওয়ার সুযোগ না পেয়ে কোনো রেস্টুরেন্ট, ওয়্যারহাউজ বা পার্ট-টাইম জবের শিফটে ছুটে যাওয়া।

সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে যখন রাতে নিজের নিস্তব্ধ রুমে ফেরা হয়, তখন ক্লান্তিতে শরীর আর চলতে চায় না। কিন্তু তাও বেঁচে থাকার তাগিদে রান্নাঘরে গিয়ে নিজেকেই ভাত বসাতে হয়, নিজের কাপড় নিজেকেই কাচতে হয়।

তবে আমার পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতা বলে, প্রবাস জীবনের সবচেয়ে বড় লড়াইটা কিন্তু শারীরিক নয়; আসল লড়াইটা হলো মানসিক। সপ্তাহের কর্মব্যস্ত দিনগুলো এক রকম কেটে গেলেও, উইকেন্ড বা ছুটির দিনগুলোতে যখন সারা জার্মানি নিস্তব্ধ হয়ে যায়, বাইরে টিপটিপ বৃষ্টি পড়ে, তখন ঘরের কোণে এক অদ্ভুত একাকীত্ব গ্রাস করে।

দেশের মা-বাবার মুখটা মনে করে যে তীব্র হোমসিকনেস তৈরি হয়, তা কেবল একজন প্রবাসীই উপলব্ধি করতে পারেন। অথচ, চোখের কোণের জলটা আড়াল করে ফোনের ওপাশে অত্যন্ত স্বাভাবিক কণ্ঠে বলতে হয়।

Advertisement

‘আম্মু, আমি খুব ভালো আছি, কোনো চিন্তা করো না।’ ভেতরের ঝড় লুকিয়ে রেখে ফোনের ওপাশে এই যে সান্ত্বনা দেওয়ার অভিনয়, এটাই সম্ভবত প্রবাস জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।

আমি নিজে আজ জার্মানির আইটি সেক্টরে একজন ওয়েব ডেভেলপার হিসেবে কাজ করছি। কিন্তু আজকের এই পজিশনে আসার আগে আমাকেও এই দীর্ঘ পথ, তীব্র একাকীত্ব এবং কঠোর স্ট্রাগলের মধ্য দিয়েই যেতে হয়েছে। তাই খুব কাছ থেকে এই রূপান্তরটা আমি দেখেছি এবং অনুভব করেছি।

আজ এই কথাগুলো বলার একটাই উদ্দেশ্য- যারা এই মুহূর্তে জার্মানির কোনো একটা ছোট্ট সাবলেট রুমে বসে ক্লান্ত শরীরে ভাবছেন ‘আমাকে দিয়ে মনে হয় হবে না’, তাদের মনে করিয়ে দেওয়া- আপনাকে দিয়েই হবে!

শুরুর এই অন্ধকার সময়টাই মূলত আপনাকে মানসিকভাবে পরিপক্ব ও শক্ত করবে, যা জার্মানির মাটিতে একদিন মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শেখাবে। প্রবাস জীবনের এই রিয়েল স্ট্রাগলটাই আমাদের দিনশেষে প্রকৃত সফলতার স্বাদ দেয় এবং ভেতর থেকে একজন খাঁটি মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে। দিনশেষে এই লড়াইয়ের গল্পটাই আমাদের সফলতার আসল চালিকাশক্তি।

এমআরএম