মতামত

আর্জেন্টিনা, ইসরায়েল, ফুটবল ও সমসাময়িক ভূরাজনীতির নতুন সমীকরণ

বিশ্বায়নের যুগে খেলাধুলা, বিশেষ করে ফুটবল, আর কেবল বিনোদন বা প্রতিযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি আজ রাষ্ট্রের পরিচয়, কূটনৈতিক বার্তা, নরম শক্তি (Soft Power) এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গাজা যুদ্ধ, ইউক্রেন সংকট, ফকল্যান্ড প্রশ্ন কিংবা জাতীয় পরিচয়সংক্রান্ত নানা ইস্যু ফুটবল মাঠে প্রতীকীভাবে উপস্থিত হয়েছে। এই প্রবন্ধে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইর ইসরায়েলমুখী পররাষ্ট্রনীতি, আর্জেন্টিনা–ইসরায়েল সম্পর্কের নতুন বাস্তবতা এবং তার সম্ভাব্য প্রতিফলন আন্তর্জাতিক ফুটবল ও সমসাময়িক ভূরাজনীতির আলোকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

Advertisement

ফুটবল, ভূরাজনীতি ও বৈশ্বিক রাজনৈতিক প্রতীক

ফুটবল এবং ভূরাজনীতিঃ ফুটবলকে প্রায়ই বলা হয় "The Beautiful Game"—একটি খেলা যা রাজনীতি, ধর্ম ও জাতিগত বিভাজনের ঊর্ধ্বে থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে আন্তর্জাতিক ফুটবল বহুবার রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি, জাতীয়তাবাদ এবং ভূরাজনৈতিক সংঘাতের প্রতিফলন ঘটিয়েছে। ১৯৭৮ সালের আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ থেকে শুরু করে ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধ-পরবর্তী আর্জেন্টিনা–ইংল্যান্ড ম্যাচ, কিংবা সাম্প্রতিক গাজা যুদ্ধ—সব ক্ষেত্রেই ফুটবল একটি রাজনৈতিক প্রতীকী মঞ্চে পরিণত হয়েছে। ২০২৩ সালে প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই ক্ষমতায় আসার পর আর্জেন্টিনার পররাষ্ট্রনীতি নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়। তাঁর সরকার ইসরায়েলকে অন্যতম প্রধান কৌশলগত মিত্র ঘোষণা করে এবং যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলমুখী অবস্থান গ্রহণ করে। এর প্রভাব শুধু কূটনীতিতেই নয়, আন্তর্জাতিক ফুটবলের গ্যালারিতেও প্রতিফলিত হতে শুরু করেছে।  আগের আর্জেন্টাইন সরকারগুলো সাধারণত মধ্যপ্রাচ্য প্রশ্নে তুলনামূলক ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নিত। কিন্তু মিলেই সরকার একটি স্পষ্ট আদর্শিক পরিবর্তন আনে। ২০২৩ সালের পর গাজা যুদ্ধ বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনেও বড় বিভাজন সৃষ্টি করে। বিশ্বের বিভিন্ন স্টেডিয়ামে দেখা যায়—ফিলিস্তিনের পতাকা, ইসরায়েলের পতাকা, যুদ্ধবিরতির দাবি এবং রাজনৈতিক ব্যানার।

১৯৩৬ সালের বার্লিন অলিম্পিক নাৎসি জার্মানির রাজনৈতিক প্রচারণার অংশে পরিণত হয়েছিল। ১৯৭৮ সালের আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ সামরিক জান্তার বৈধতা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার সঙ্গে যুক্ত ছিল। ১৯৮৬ সালের আর্জেন্টিনা–ইংল্যান্ড ম্যাচে "Hand of God" গোল ফকল্যান্ড যুদ্ধ-পরবর্তী জাতীয় আবেগের প্রতীক হয়ে ওঠে। সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ এবং কাতার বিশ্বকাপ ঘিরেও মানবাধিকার ও রাজনীতির প্রশ্ন আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। ফলে ফুটবল মাঠ ধীরে ধীরে একটি Global Political Theatre-এ পরিণত হতে শুরু করে এবং এটি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।

ফুটবল বিশ্বকাপ-২০২৬-এ আর্জেন্টিনা-মিশর খেলাঃ ২০২৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা–মিশর ম্যাচ একটি সাধারণ নকআউট ম্যাচ ছিল না। ম্যাচটিতে কয়েকটি বিষয় একসঙ্গে উপস্থিত হয়—মিশরের কোচ গাজার মানুষের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন, কিছু মিশরীয় সমর্থক ফিলিস্তিনের পতাকা বহন করেন, এর জবাবে কিছু আর্জেন্টিনা সমর্থক ইসরায়েলের পতাকা প্রদর্শন করেন এবং সামাজিক মাধ্যমে ম্যাচটি দ্রুত গাজা যুদ্ধের প্রতীকী সংঘর্ষে রূপ নেয়। এটি ছিল দর্শকদের একটি অংশের রাজনৈতিক অবস্থানের বহিঃপ্রকাশ। তবে এ বিষয়ে FIFA বা আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (AFA) কোনো আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক অবস্থান প্রকাশ করেনি।  বিশ্লেষণে, অনেক গবেষক মনে করেন—মিলেই সরকারের প্রকাশ্য ইসরায়েলপন্থি অবস্থান কিছু সমর্থককে একই ধরনের রাজনৈতিক পরিচয় প্রকাশে উৎসাহিত করেছে। অন্যদিকে অনেক বিশ্লেষক বলেন—কয়েকজন সমর্থকের কর্মকাণ্ডকে পুরো আর্জেন্টিনা জাতির অবস্থান হিসেবে দেখা উচিত নয়। কারণ—আর্জেন্টিনায় উল্লেখযোগ্য ফিলিস্তিনি-সমর্থক নাগরিকও আছেন, দেশটির রাজনৈতিক মতাদর্শ অত্যন্ত বহুমাত্রিক এবং ফুটবল সমর্থকদের আচরণ রাষ্ট্রের নীতির সরাসরি প্রতিফলন নাও হতে পারে।

Advertisement

পরবর্তীতে একই বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডকে হারানোর পর আর্জেন্টিনার কয়েকজন খেলোয়াড় "Las Malvinas son Argentinas" লেখা ব্যানার প্রদর্শন করেন। এটি ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের ওপর আর্জেন্টিনার সার্বভৌমত্বের দাবির রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখা হয় এবং FIFA-র রাজনৈতিক বার্তা নিষিদ্ধ করার নীতির আলোচনায় আসে। এর ফলে বুঝা যে, ফুটবল মাঠে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং ফকল্যান্ড, ইউক্রেন, কসোভো, কাশ্মীর ফিলিস্তিন সহ বহু ভূরাজনৈতিক প্রশ্ন প্রবেশ করছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দৃষ্টিকোণ থেকে ফুটবল এখন একটি Soft Power, Public Diplomacy এবং Strategic Communication-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। যখন কোনো দেশের সরকার একটি নির্দিষ্ট পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করে, তখন তার সাংস্কৃতিক ক্ষেত্র—যেমন ফুটবল সেই নীতির প্রতীকী প্রভাব বহন করতে পারে।

মিলেই সরকারের পররাষ্ট্রনীতি ও আর্জেন্টিনা–ইসরায়েল সম্পর্কের নতুন অধ্যায়

আর্জেন্টিনা–ইসরায়েলের কূটনৈতিক সম্পর্কঃ উপর্যুক্ত ঘটনার জন্যে অনেকেই আর্জেন্টিনার বর্তমান প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই- এর ভূমিকার কথা বলে। সাম্প্রতিক সময়ে আর্জেন্টিনা ও ইসরায়েলের কূটনৈতিক সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হয়েছে। প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই (Javier Milei) ক্ষমতায় আসার পর থেকে দুই দেশের সম্পর্ক নতুন পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রেসিডেন্ট মিলেই ঘোষণা দিয়েছেন যে আর্জেন্টিনা ২০২৬ সালে ইসরায়েলে তাদের দূতাবাস তেল আবিব থেকে জেরুজালেমে স্থানান্তর করবে। এই সিদ্ধান্তকে ইসরায়েলের প্রতি আর্জেন্টিনার দৃঢ় রাজনৈতিক সমর্থনের প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে। আর্জেন্টিনা ও ইসরায়েল যৌথভাবে "Isaac Accords" নামে একটি কূটনৈতিক উদ্যোগ চালু করেছে। এর লক্ষ্য লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বাড়ানো। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং প্রেসিডেন্ট মিলেই একাধিক বৈঠকে নিরাপত্তা, বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগে সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে একমত হন। দুই দেশের মধ্যে সরাসরি বিমান চলাচল নিয়েও অগ্রগতি হয়েছে।  আর্জেন্টিনা ইসরায়েলের নিরাপত্তা নীতির প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন জানিয়েছে এবং ইরান-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে ইসরায়েলের অবস্থানের সঙ্গে নিজেদের অবস্থান মিলিয়েছে।

বর্তমান বিশ্বে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও খেলাধুলার মধ্যকার দূরত্ব দ্রুত কমে আসছে। রাষ্ট্রগুলো এখন কেবল সামরিক বা অর্থনৈতিক শক্তির মাধ্যমে নয়, বরং সংস্কৃতি, ক্রীড়া এবং জনকূটনীতির মাধ্যমেও নিজেদের বৈশ্বিক অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। আর্জেন্টিনার সাম্প্রতিক পররাষ্ট্রনীতি এবং বিশ্বকাপে ঘটে যাওয়া প্রতীকী ঘটনাগুলো সেই বৃহত্তর পরিবর্তনেরই প্রতিফলন। তবে গবেষণার ক্ষেত্রে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব পাওয়া উচিত—কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা বা কয়েকজন সমর্থকের আচরণকে সমগ্র জাতির রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে ব্যাখ্যা করা উচিত নয়।

'আইজ্যাক অ্যাকর্ডস' (Isaac Accords) এবং আর্জেন্টিনা : আইজ্যাক অ্যাকর্ডস হলো আর্জেন্টিনা ও ইসরায়েলের নেতৃত্বে গঠিত একটি নতুন কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত উদ্যোগ, যার উদ্দেশ্য ইসরায়েল এবং লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা। এটি ২০২০ সালের আব্রাহাম অ্যাকর্ডস-এর আদলে তৈরি হয়েছে, তবে এর লক্ষ্য আরব বিশ্বের পরিবর্তে লাতিন আমেরিকা। "Isaac" (ইসহাক) ইহুদি ধর্মের অন্যতম পিতৃপুরুষ। "Abraham Accords"-এর ধারাবাহিকতায় প্রতীকীভাবে এই নতুন উদ্যোগের নাম রাখা হয়েছে "Isaac Accords"। ২০২৫ সালের জুনে আর্জেন্টিনার ইসরায়েলস্থ রাষ্ট্রদূত রাব্বি শিমন অ্যাক্সেল ওয়ানিশ প্রথম এ উদ্যোগের ঘোষণা দেন। ২০২৬ সালের ১৯ এপ্রিল জেরুজালেমে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আনুষ্ঠানিকভাবে এটি উদ্বোধন করেন।

Advertisement

এই উদ্যোগের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারী দেশগুলো—ইসরায়েলের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করবে, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি করবে, প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), কৃষি ও স্বাস্থ্য খাতে সহযোগিতা করবে, সন্ত্রাসবাদ, মাদক পাচার ও ইহুদি-বিরোধী কর্মকাণ্ড (Antisemitism) মোকাবিলায় একসঙ্গে কাজ করবে এবং গণতন্ত্র ও পশ্চিমা মূল্যবোধ রক্ষায় সহযোগিতা করবে। প্রাথমিকভাবে আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে, পানামা এবং কোস্টারিকা এই Accords-এ যুক্ত। পরবর্তীতে ব্রাজিল, চিলি, কলম্বিয়া, ইকুয়েডর, গুয়াতেমালা, হন্ডুরাn আরও কয়েকটি দেশকে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রেসিডেন্ট মিলেই ২০২৫ সালে Genesis Prize লাভ করেন। তিনি পুরস্কারের ১০ লাখ মার্কিন ডলার নিজে গ্রহণ না করে এই উদ্যোগে দান করেন। এই অর্থ দিয়ে American Friends of Isaac Accords (AFOIA) নামে একটি অলাভজনক সংস্থা গঠন করা হয়, যা প্রকল্পটি বাস্তবায়নে কাজ করছে। তবে এই Accords ইতোমধ্যে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সমালোচকদের মতে— গাজা যুদ্ধের সময় ইসরায়েলের প্রতি দৃঢ় সমর্থন দেওয়ায় এই উদ্যোগ রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত। এটি লাতিন আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতিতে বিভাজন সৃষ্টি করতে পারে এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে ওই অঞ্চলেও প্রভাবিত করতে পারে। তবে Isaac Accords-এর গুরুত্ব কেবল আর্জেন্টিনা ও ইসরায়েলের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এটি লাতিন আমেরিকায় পশ্চিমা প্রভাবকে আরও সুসংহত করার একটি কৌশলগত উদ্যোগ, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর আঞ্চলিক স্বার্থও পরোক্ষভাবে প্রতিফলিত হতে পারে। অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, এই উদ্যোগ মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক বিভাজনকে লাতিন আমেরিকার কূটনীতিতেও প্রভাবিত করতে পারে। ফলে এর দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক প্রভাব এখনো মূল্যায়নের পর্যায়ে রয়েছে।

জেনেসিস প্রাইজ এবং প্রেসিডেন্ট মিলেই : জেনেসিস প্রাইজ হলো একটি আন্তর্জাতিক পুরস্কার, যা প্রতি বছর এমন একজন ইহুদি ব্যক্তিত্বকে দেওয়া হয় যিনি তাঁর পেশাগত ক্ষেত্রে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছেন, মানবকল্যাণে অবদান রেখেছেন এবং ইহুদি মূল্যবোধ ও পরিচয়কে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রেখেছেন। এ কারণে এটিকে অনেক সময় "Jewish Nobel Prize" বা "ইহুদিদের নোবেল পুরস্কার" বলা হয়। এটি প্রতিষ্ঠিত হয় ২০১২ সালে এবং ২০১৪ সালে প্রথম পুরস্কার প্রদান করা হয়। Genesis Prize Foundation এটি পরিচালনা করে, যা ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং Jewish Agency for Israel-এর সহযোগিতায় কাজ করে। জেনেসিস প্রাইজ মানির মূল্য ১০ লাখ (১ মিলিয়ন) মার্কিন ডলার। অধিকাংশ বিজয়ী এই অর্থ ব্যক্তিগতভাবে না রেখে দাতব্য বা সামাজিক প্রকল্পে দান করেন। তবে উল্লেখ্য, Genesis Prize একটি বেসরকারি ফাউন্ডেশন কর্তৃক প্রদত্ত আন্তর্জাতিক পুরস্কার; এটি কোনো রাষ্ট্রীয় বা নোবেল ফাউন্ডেশনের পুরস্কার নয়।

অতি সম্প্রতি আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই এই পুরস্কার পান। ২০২৫ সালে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই ইসরায়েলের প্রতি তাঁর দৃঢ় সমর্থনের জন্য জেনেসিস প্রাইজ লাভ করেন। তাঁর পদক্ষেপগুলোর মধ্যে ছিল—জাতিসংঘে ইসরায়েলপন্থি অবস্থান গ্রহণ, হামাস ও হিজবুল্লাহকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা, আর্জেন্টিনার দূতাবাস জেরুজালেমে স্থানান্তরের ঘোষণা এবং ১৯৯০-এর দশকে আর্জেন্টিনায় ইহুদি ও ইসরায়েলি স্থাপনায় হামলার তদন্ত পুনরায় শুরু করা। এই পুরস্কারকে ঘিরেও বিতর্ক রয়েছে। সমর্থকদের মতে এটি ইহুদি সম্প্রদায়ের অসামান্য অবদানকে স্বীকৃতি দেয়। অনেক সমালোচকদের মতে, পুরস্কারটি কখনও কখনও রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত হওয়ায় এটি নিরপেক্ষ নয় এবং ইসরায়েলের পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত বিতর্কও সৃষ্টি করে।

আর্জেন্টিনার বর্তমান প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই (Javier Milei)-এর ইসরায়েল প্রীতিঃ   আর্জেন্টিনার বর্তমান প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই (Javier Milei) ইসরায়েলের কাছে একজন প্রিয় ব্যক্তি।  যদিও তিনি রোমান ক্যাথলিক পরিবারে জন্মগ্রহণ ও বেড়ে ওঠেন। তবে গত কয়েক বছর ধরে তিনি ইহুদি ধর্ম (Judaism) অধ্যয়ন করছেন, তোরাহ পড়েন এবং ইহুদি রাব্বিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছেন। তিনি একাধিকবার বলেছেন যে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব শেষ হওয়ার পর ইহুদি ধর্ম গ্রহণ (conversion) করতে চান। জেনেসিস প্রাইজ সাধারণত ইহুদি ব্যক্তিত্বদের দেওয়া হলেও, ২০২৫ সালে হাভিয়ের মিলেই ছিলেন প্রথম অ-ইহুদি (non-Jewish) ব্যক্তি যিনি এই পুরস্কার পান। তাঁকে এই সম্মান দেওয়া হয় ইসরায়েলের প্রতি তাঁর দৃঢ় সমর্থন, ইহুদিবিদ্বেষের বিরুদ্ধে অবস্থান এবং আর্জেন্টিনা-ইসরায়েল সম্পর্ক জোরদারে ভূমিকার জন্য। অর্থাৎ ব্যক্তিগতভাবে তার ইহুদি ধর্মের প্রতি গভীর অনুরাগ রয়েছে এবং রাষ্ট্রপতির মেয়াদ শেষে ইহুদি ধর্ম গ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। ২০২৩ সালের শেষ থেকে প্রেসিডেন্ট মিলেই ঘোষণা করেন যে ইসরায়েল আর্জেন্টিনার প্রধান কৌশলগত মিত্রদের একটি। আর্জেন্টিনা হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করে এবং ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকারের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন জানায়। জাতিসংঘে ফিলিস্তিন-সম্পর্কিত একাধিক প্রস্তাবে আর্জেন্টিনা আগের অবস্থান পরিবর্তন করে ইসরায়েলপন্থি ভোট দেয় বা ইসরায়েলের অবস্থানের কাছাকাছি অবস্থান গ্রহণ করে। যেমন, ২০২৪ সালে ফিলিস্তিনকে জাতিসংঘের পূর্ণ সদস্য করার প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভোট দেয়। সরকার তেল আবিব থেকে জেরুজালেমে দূতাবাস স্থানান্তরের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে, যা ইসরায়েলের একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অগ্রাধিকার। বর্তমান তথ্য ও প্রকাশিত সংবাদ বিশ্লেষণ থেকে কিছু সম্ভাব্য সম্পর্ক নির্ণয় করা গেলেও, আর্জেন্টিনা সরকারের পররাষ্ট্রনীতি, জাতীয় ফুটবল দলের আনুষ্ঠানিক অবস্থান এবং গ্যালারিতে উপস্থিত কিছু সমর্থকের রাজনৈতিক আচরণকে একাকার করে দেখা অ্যাকাডেমিকভাবে যথাযথ নয়। এ তিনটি বিষয়ের মধ্যে সম্পর্ক থাকতে পারে, কিন্তু তারা অভিন্ন নয়।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, ভবিষ্যৎ তাৎপর্য ও লেখকের মূল্যায়ন

ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় লাতিন আমেরিকার ভূমিকা ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় লাতিন আমেরিকার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, লাতিন আমেরিকার কয়েকটি দেশের সমর্থন না পেলে ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘের বিভাজন পরিকল্পনা (UN Partition Plan) পাস নাও হতে পারত। ১৯৪৭ সালের ২৯ নভেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে রেজ্যুলেশন ১৮১-এ ব্রিটিশ ম্যান্ডেট প্যালেস্টাইনকে একটি ইহুদি রাষ্ট্র ও একটি আরব রাষ্ট্রে ভাগ করার প্রস্তাব গৃহীত হয়। যার সমার্থনে ছিল এবং এই ৩৩টি সমর্থনকারী দেশের মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশই ছিল লাতিন আমেরিকার দেশ। দেশগুলি হলোঃ গুয়াতেমালা, উরুগুয়ে, ব্রাজিল, বলিভিয়া, কোস্টারিকা, ডোমিনিকান রিপাবলিক, ইকুয়েডর, হাইতি্‌, নিকারাগুয়া, পানামা, রাগুয়ে, পেরু এবং ভেনেজুয়েলা। আর্জেন্টিনা ভোটদানে বিরত (abstain) থাকে। লাতিন আমেরিকার সমর্থনের পেছনে কয়েকটি কারণ ছিল। যাম মধ্যে- যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক প্রভাব, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও হলোকাস্টের পর ইহুদিদের জন্য একটি রাষ্ট্র গঠনের প্রতি সহানুভূতি, কিছু দেশে শক্তিশালী ইহুদি সম্প্রদায়ের উপস্থিতি এবং পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক দৃঢ় রাখার আগ্রহ। ১৯৪৮ সালের ১৪ মে ইসরায়েল স্বাধীনতা ঘোষণা করার পেছনে ১৯৪৭ সালের জাতিসংঘের এই ভোট ছিল আইনি ও কূটনৈতিক ভিত্তি। আর সেই ভোটে লাতিন আমেরিকার সমর্থন ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

লেখকের বিশ্লেষণ : বর্তমান বিশ্বে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও খেলাধুলার মধ্যকার দূরত্ব দ্রুত কমে আসছে। রাষ্ট্রগুলো এখন কেবল সামরিক বা অর্থনৈতিক শক্তির মাধ্যমে নয়, বরং সংস্কৃতি, ক্রীড়া এবং জনকূটনীতির মাধ্যমেও নিজেদের বৈশ্বিক অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। আর্জেন্টিনার সাম্প্রতিক পররাষ্ট্রনীতি এবং বিশ্বকাপে ঘটে যাওয়া প্রতীকী ঘটনাগুলো সেই বৃহত্তর পরিবর্তনেরই প্রতিফলন। তবে গবেষণার ক্ষেত্রে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব পাওয়া উচিত—কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা বা কয়েকজন সমর্থকের আচরণকে সমগ্র জাতির রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে ব্যাখ্যা করা উচিত নয়। একইভাবে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত এবং সমাজের বহুমাত্রিক মতামতের মধ্যেও পার্থক্য রয়েছে। তাই এ ধরনের বিষয় বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে তথ্য, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং বহুমাত্রিক গবেষণার ওপর নির্ভর করা অপরিহার্য। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গবেষণার দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, আগামী দশকে Sports Diplomacy, Soft Power, Strategic Communication এবং Geopolitical Competition—এই চারটি ধারণা আন্তর্জাতিক ফুটবল বিশ্লেষণের কেন্দ্রীয় উপাদানে পরিণত হবে। ফলে ফুটবল কেবল বিশ্বসেরা দলের প্রতিযোগিতা নয়; এটি রাষ্ট্রের পরিচয়, কূটনৈতিক বার্তা এবং বৈশ্বিক ক্ষমতার প্রতীকী প্রতিযোগিতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছে।

রেফারেন্স-

Levermore, R., & Budd, A. (Eds.). (2004). Sport and International Relations: An Emerging Relationship. Routledge. Nye, J. S. (2004). Soft Power: The Means to Success in World Politics. PublicAffairs. FIFA. (2024). FIFA Disciplinary Code. Fédération Internationale de Football Association. United Nations. (1947). Resolution 181 (II): Future Government of Palestine. Genesis Prize Foundation. (2025). Genesis Prize Laureates and Award Information. Ministry of Foreign Affairs of Argentina. (2025–2026). Argentina–Israel Bilateral Relations. Reuters. (2025–2026). Reports on Argentina–Israel diplomatic relations and FIFA political controversies. Al Jazeera. (2026). Reports and analyses on the Argentina–Egypt World Cup match and political symbolism. Associated Press (AP). (2025–2026). Coverage of Argentina's Middle East policy and international football. The Guardian. (2026). Analysis of geopolitics and symbolism during the FIFA World Cup.

লেখক: এসপিপি, পিএসসি, নিরাপত্তা ও কৌশলগত বিষয়ক বিশ্লেষক, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক এবং গবেষক। বর্তমানে BAIUST এর রেজিস্ট্রার। 

এইচআর/জেআইএম