(পূর্ব প্রকাশের পর-৭ম পর্ব)
Advertisement
কলেজে ভর্তি হওয়ার জন্য কিছু উপদেশ সম্বলিত ছোট কাকার পরামর্শ আব্বা কুইনাইনের বড়ির মতো গলাধঃকরণ করলেন। উপদেশ ছিল—মাসের প্রথমেই থাকা ও খাওয়ার বিল পরিশোধ কর। আর যাই হোক, গাছতলায় ঘুমাতে কিংবা না খেয়ে থাকতে হবে না। দেবীদ্বার থেকে কুমিল্লার দূরত্ব প্রায় ২৭ মাইল। মুড়ির টিন বাসে সময় লাগত ঘণ্টা দেড়েক। আম্মা অশ্রুসিক্ত নয়নে আমাকে ফুঁ দিয়ে বিদায় জানালেন। আব্বার রাগও বেশ প্রশমিত হয়ে অ্যাঙ্গার থার্মোমিটারে ১০ থেকে ৫-এ নেমে এল।
সেই কালে কুমিল্লা পরিচিত ছিল পুকুর আর দীঘির শহর হিসেবে। কমলাঙ্ক বা ‘পদ্মের পুকুর’ থেকে কুমিল্লা নামের উৎপত্তি। এর আগে এটি ত্রিপুরা জেলা ছিল, কিন্তু ১৯৬০ সাল থেকে নাম হয় কুমিল্লা। ছিমছাম শান্ত শহরটির উত্তর-দক্ষিণে রানীর দীঘির পাড় ঘেঁষে অবস্থিত কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ। এটি মহারাণী ভিক্টোরিয়ার নামে এবং রায়বাহাদুর আনন্দচন্দ্র রায়ের প্রচেষ্টায় ১৮৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত। তৎকালীন পাকিস্তানের অন্যতম খ্যাতনামা বেসরকারি কলেজটিতে আমি যখন ১৯৬৫ সালে ভর্তি হই, তখন কলেজটির বয়স প্রায় ৬৬ বছর; এখন ১২৭ বছর। রানীর দীঘির চারটি পাড়ই পাকা, আর পাড় ঘেঁষে রয়েছে পাকা রাস্তা। কুমিল্লায় এলে কবি নজরুল পা ফেলতেন এই দীঘির পাড়ে—সে স্মৃতি ফলকে সংরক্ষিত। শুনেছিলাম, ১৯২১ থেকে ১৯২৪ সালের মধ্যে কবি পাঁচবার কুমিল্লায় আসেন এবং কলেজসংলগ্ন রানীর দীঘির পশ্চিম পাড়ে একটি কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে বসে নিয়মিত কবিতা ও গানের আসর বসাতেন, প্রেমপত্র ও গান লিখতেন (‘মাধবী লতা দোলে...’)। আরও শুনেছিলাম, সম্ভবত উনিশ শতকের প্রথম ভাগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও মহাত্মা গান্ধীও এক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার প্রেক্ষিতে কুমিল্লায় এসেছিলেন।
কলেজ রোডের এক পাশে লিকলিকে স্বাস্থ্য, সুন্দর চেহারার সুখেন্দুদার মিষ্টির দোকান, আর অপর পাশে ‘প্যানোরামা’ বইয়ের স্টল ও লিবার্টি সিনেমা হল—মিলে তরুণদের এক তীর্থস্থান। বিশেষ করে সুখেন্দুদার দোকানের ছানার সন্দেশ ও লুচির প্রতি লোলুপ দৃষ্টি আজও স্মৃতিপটে ভেসে ওঠে। এই কলেজ রোড ধরে রানীর দীঘির পশ্চিম তীরে টিনের চাল ও পাকা দেয়াল নিয়ে দানবের মতো দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল দুই-তিনটি ঘরের একটিতে আমাদের ক্লাস হতো (সেকশন ডি)। এর পাশেই ছিল টিচার্স কমনরুম এবং প্রিন্সিপালের অফিস। আমার ভর্তি হওয়ার সময় কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন ড. আব্দুল করিম। কয়েক মাসের মধ্যেই এলেন মেসবাউল বার চৌধুরী। দীর্ঘদেহী, পেটানো শরীর, গায়ের রং ইংরেজদের মতো। খাঁটি সিলেটি ভাষায় কথা বলতেন। তাঁর খাঁকারি শুনলে কলেজের বাঘ-মোষ এক ঘাটে জল খেত।
Advertisement
আমাদের ক্লাসে প্রায় দেড় শ থেকে দুই শ ছাত্রের বিপরীতে মেয়ে ছিল মাত্র চার-পাঁচজন। একটু দূরে মেয়েদের বসার জন্য আলাদা বেঞ্চ ছিল—বক্তৃতামঞ্চের বাঁ দিকে। তারা শিক্ষকের সঙ্গে ক্লাসে আসত। শিক্ষক আসার আগে ক্লাসরুমে হৈচৈ লেগেই থাকত; পেছনের বেঞ্চে চলত ‘টুয়েন্টি নাইন’ তাস খেলা। এত উঁচুতে থাকা সিলিং ফ্যানের বাতাসে ‘চিলড’ হওয়ার বদলে ‘কিলড’ হওয়ার অবস্থা! মনে আছে, এক ‘ধনীর দুলাল’ এক ধনীর দুলালির পিছু নিতে গিয়ে প্রকাশ্যে ধোলাই খেয়েছিল। শাহজাদা নামের বেঁটেখাটো, উজবুক চেহারার এক সহপাঠী আমার প্যান্ট-শার্ট আর জুতা পরে ক্লাস শুরুর ঠিক আগে মেয়েদের সামনে ডিসকো নাচ দিত। মেয়েরা তাকে দেখে খিলখিল করে হাসত, আর সে ভাবত—‘নিশানা মিল গয়া, কেল্লা ফতে।’ একদিন পা পিছলে মেঝেতে পড়ে গেলে, যাদের জন্য এই কসরত, সেই মেয়েরাই হাসিতে লুটোপুটি খেল (নারী, তুমি নির্দয়!)। সেই সঙ্গে শেষ হলো ‘হামারি আধুরি কাহানি’।
শরৎচন্দ্রের ভাষা ধার করে বলি, “তারপর সেই মন্দ ছেলেটি যে কেমন করিয়া অনাদরে, অবহেলায়, মন্দের আকর্ষণে মন্দ হইয়া, ধাক্কা খাইয়া, ঠোক্কর খাইয়া অজ্ঞাতসারে অবশেষে একদিন অপযশের ঝুরি কাঁধে ফেলিয়া কোথায় সরিয়া পড়ে—সুদীর্ঘ দিন তাহার কোনো উদ্দেশই পাওয়া যায় না।”
আমার কলেজজীবনের শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষকগণ ছিলেন একঝাঁক মেধাবী মানুষ। সবাই ছিলেন প্রগতিশীল মানসিকতার। আকাশে তারার মেলা দেখে যেমন অবাক হতাম, মর্ত্যের এই তারার হাট দেখেও তেমনি বিস্মিত হতাম। ওইসব শিক্ষকের অনেকেই আজ বেঁচে নেই; কিন্তু কথায়, কাজে, নিষ্ঠায় ও সততায় তাঁরা বেঁচে আছেন আমার এবং হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীর মনে—মনের বাঁকে বাঁকে, চেতনার চৌহদ্দিতে।
ইংরেজি পড়াতেন বেঁটেখাটো ননীগোপাল রায় স্যার (এন. জি. রায়)। তিনি রবার্ট ব্রাউনিংয়ের Patriot কবিতার ব্যাখ্যা শেষে যখন বলতেন, Thus I entered, and thus I go!, তখন দেশপ্রেমিকদের দুর্দিন দেখে সত্যিই দুঃখ লাগত। এমনভাবে তিনি পড়াতেন যে, না মুগ্ধ হয়ে উপায় ছিল না। ইংরেজির আরেক শিক্ষক, সুন্দর-পরিপাটি লায়লা নুর ম্যাডাম, সব সময় সেজেগুজে আসতেন। তিনি একজন ভাষাসৈনিক ছিলেন। তখনকার দিনে মহিলা শিক্ষক পাওয়া যেন হাতে চাঁদ পাওয়ার মতো ব্যাপার। ম্যাডাম লায়লা নুরকে দেখলেই সবাই হা করে তাকিয়ে থাকত। বস্তুত তাঁদেরই হাত ধরে বায়রন, কিটস, ওয়ার্ডসওয়ার্থ ও শেক্সপিয়রের সঙ্গে আমাদের পরিচয়।
Advertisement
বাংলা পড়াতেন নুরুল ইসলাম, মোবাশ্বের আলী, বদরুল হাসান, শওকত আলী প্রমুখ। মুক্তিযুদ্ধের সময় বদরুল হাসানের ভরাট কণ্ঠে আবৃত্তি—‘বল বীর, বল উন্নত মম শির’—শুনলে গায়ের লোম খাড়া হয়ে যেত। সর্বদা সাদা ধুতি ও সাদা পাঞ্জাবি পরিহিত সুদর্শন অশোক কুমার স্যার রবীন্দ্রনাথের ‘হৈমন্তী’ গল্প রসিয়ে রসিয়ে পড়াতেন। তিনি আমাদের কাছে ব্যাখ্যা চাইতেন—‘নরমাংসের স্বাদ পাইলে মানুষের সম্বন্ধে বাঘের যে দশা হয়, স্ত্রী সম্বন্ধে তাহার ভাবটা সেইরূপ হইয়া উঠে’ কিংবা ‘মানুষ পণ করে পণ ভাঙিয়া ফেলিয়া হাঁফ ছাড়িবার জন্য; অতএব কথা না-দেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।’ হাই বেঞ্চের ওপর হাত রেখে চিবুক চেপে স্যারের দিকে তন্ময় হয়ে তাকিয়ে থাকতাম আর মনে মনে বলতাম—তুমি কেমন করে পড়াও হে গুণী, অবাক হয়ে শুনি।
গুরুগম্ভীর, দীর্ঘদেহী, মোটা কালো ফ্রেমের চশমা পরা আখতারুল হক স্যার পড়াতেন লজিক—‘তোমার হাত টেবিলে, টেবিলের পায়া মাটিতে; সুতরাং তোমার হাতও মাটিতে’—অঙ্গ কখনো পুরো শরীর নয়; আর যদি তা ভাবো, তবে সেটা হবে Fallacy of Composition। কিংবা Post hoc ergo propter hoc—মধ্যরাতে কুকুর ডেকেছিল বলে পরীক্ষার ফল খারাপ হয়েছে। আখতার স্যার ইংরেজিতে শুরু করে ইংরেজিতেই পুরো পাঠ শেষ করতেন। বিশেষ করে তাঁর ভারী কণ্ঠ সেই সময়ের বিখ্যাত অভিনেতা ছবি বিশ্বাসের কথা মনে করিয়ে দিত। আসলে বাংলা ছাড়া আমাদের প্রায় সব লেকচারই হতো ইংরেজি ভাষায়, পরীক্ষাও দিতাম ইংরেজিতে। সেই অর্থে বলতে হয়, আমরা অনেকটাই ইংরেজি-মাধ্যমের পরিবেশে পড়াশোনা করেছি।
কমার্সের মোহাম্মদ তোয়াহা এবং রসায়নের খুরশিদ আলম স্যার ছাত্রছাত্রীদের কাছে যেমন পাঠদানে প্রিয় ছিলেন, তেমনি সংগ্রাম-আন্দোলনেও; বিশেষত বাঙালিদের স্বায়ত্তশাসনের প্রতি তাঁদের প্রকাশ্য কিংবা অপ্রকাশ্য সমর্থনের জন্য। সম্ভবত ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে খুরশিদ আলম স্যার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। সদাহাস্যময় ইতিহাসের আব্দুল মোমেন স্যারও ছাত্রবান্ধব মনোভাবের জন্য খুবই জনপ্রিয় ছিলেন। তিনি ডিগ্রি কলেজ হোস্টেলের সুপারিনটেনডেন্ট ছিলেন।
আমার কলেজজীবনের শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষকগণ ছিলেন একঝাঁক মেধাবী মানুষ। সবাই ছিলেন প্রগতিশীল মানসিকতার। আকাশে তারার মেলা দেখে যেমন অবাক হতাম, মর্ত্যের এই তারার হাট দেখেও তেমনি বিস্মিত হতাম। ওইসব শিক্ষকের অনেকেই আজ বেঁচে নেই; কিন্তু কথায়, কাজে, নিষ্ঠায় ও সততায় তাঁরা বেঁচে আছেন আমার এবং হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীর মনে—মনের বাঁকে বাঁকে, চেতনার চৌহদ্দিতে।
রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর একটি পঙ্ক্তি ঘুরিয়ে বলি—আমার ভেতরে, বাহিরে, অন্তরে অন্তরে আছ তোমরা হৃদয়জুড়ে...
কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্ররাজনীতিতে ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন ছিল নেক টু নেক—কেহ কারে নাহি ছাড়ে, সমানে সমান। ১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক ছয় দফা আন্দোলন ছাত্রলীগকে আরও তেজোদীপ্ত করে তোলে। ছাত্র ইউনিয়ন তখনও বিভক্ত হয়নি; তারা পাকিস্তানের কাঠামোর মধ্যেই সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন দেখত বলে মনে হতো। আমার দুর্বলতা ছিল ছাত্র ইউনিয়নের দিকে। নামমাত্র অস্তিত্ব নিয়ে ছিল এনএসএফ, আর মোটামুটি শক্তি নিয়ে ছাত্রশক্তি। তখনকার ছোট-বড় ছাত্রনেতারা একটি রাজনৈতিক আদর্শ বুকে ধারণ করে রাজনীতি করতেন। দলের প্রতি তাঁদের আনুগত্য ছিল প্রশ্নাতীত, আর সমাজও তাঁদের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করত। আন্তঃছাত্রসংগঠনের মধ্যে মারপিট যে ছিল না, তা বলা যাবে না; তবে তা ছিল দফে দফে। কিল, ঘুষি, চড়, চাপড় কিংবা হকিস্টিকের আঘাতে দফারফা হতো ছাত্রলীগের শিবনারায়ণ দাশের নেতৃত্বে।
এই শিবনারায়ণ দাশ মানচিত্র অঙ্কনে বিশেষ প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে তিনিই ছাত্রনেতাদের সামনে সর্বপ্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকার নকশা উপস্থাপন করেন। সেই পতাকার গাঢ় সবুজ জমিনের মাঝে লাল বৃত্তের ভেতর ছিল সোনালি বাংলাদেশের মানচিত্র, যা পরবর্তীকালে বর্তমান জাতীয় পতাকার রূপ লাভ করে। তাঁর পিতাকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী হত্যা করে। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের গর্বিত ছাত্র প্রয়াত শিবনারায়ণ দাশের আত্মার শান্তি কামনা করি।
(চলবে)
লেখক : অর্থনীতিবিদ, কলামিস্ট। সাবেক উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
এইচআর/জেআইএম