অনেকে মনে করেন কর্মক্ষেত্রে নিজের পক্ষে কথা বলা মানেই ঝগড়া বা অপ্রয়োজনীয় তর্কে জড়িয়ে পড়া। বাস্তবে বিষয়টি অনেকটাই ভিন্ন। এর অর্থ হতে পারে নিজের প্রাপ্য কৃতিত্ব দাবি করা বা কোনো বিষয় অন্যায্য মনে হলে চুপ না থেকে মত প্রকাশ করা।
Advertisement
অনেক সময় নিজের অবস্থান স্পষ্ট করার অর্থ হতে পারে অবাস্তব সময়সীমা মেনে নিতে বিনয়ের সঙ্গে আপত্তি জানানো, কোনো প্রকল্পে নিজের অবদানের স্বীকৃতি চাওয়া কিংবা কোনো সিদ্ধান্তকে অন্যায্য মনে হলে নীরব না থেকে মতামত প্রকাশ করা। এগুলো পেশাদার আচরণেরই অংশ।
তবে অনেক কর্মী এসব বিষয়ে মুখ খোলেন না। কারণ তারা আশঙ্কা করেন, এতে সহকর্মী বা ঊর্ধ্বতনরা তাদের কঠিন স্বভাবের, অসহযোগিতাপূর্ণ বা অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ হিসেবে দেখবেন। কিন্তু বারবার নিজের প্রয়োজন বা অনুভূতি চেপে রাখলে ধীরে ধীরে মানসিক চাপ বাড়ে, কর্মক্ষয় (বার্নআউট) দেখা দিতে পারে এবং আত্মবিশ্বাসও কমে যায়।
মনে রাখতে হবে, নিজের কথা বলা মানেই সংঘাত তৈরি করা নয়। বরং শান্ত, স্পষ্ট ও ভদ্র ভাষায় নিজের অবস্থান তুলে ধরলে পারস্পরিক সম্মান বজায় থাকে এবং ভুল বোঝাবুঝিও কমে। আসুন, অপ্রয়োজনীয় দ্বন্দ্ব সৃষ্টি না করেই কর্মক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজের অবস্থান তুলে ধরার পাঁচটি কার্যকর উপায় জেনে নেওয়া যাক।
Advertisement
নিজের মতামত প্রকাশ করুন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে
১. কোথায় সীমা টানবেন, তা স্পষ্ট করুনঅনেক মানুষ অতিরিক্ত কাজের চাপে পড়েন শুধু এ কারণে যে তারা নিজের সীমাবদ্ধতার কথা জানান না। প্রতিটি অতিরিক্ত কাজের অনুরোধে রাজি হওয়া, গভীর রাত পর্যন্ত বার্তার উত্তর দেওয়া বা নিজের দায়িত্বের বাইরে গিয়ে কাজ করতে থাকলে অন্যরা ধরে নিতে পারেন, আপনি সব সময়ই প্রস্তুত।
সীমা নির্ধারণের অর্থ সাহায্য করতে অস্বীকার করা নয়। বরং আপনি বাস্তবে কতটুকু কাজ সামলাতে পারবেন, সে বিষয়ে সৎ থাকা। দৈনন্দিন কাজের সূচি যদি আগেই পূর্ণ যায়, তাহলে পরে হিমশিম খাওয়ার চেয়ে শুরুতেই ভদ্রভাবে তা জানিয়ে দেওয়াই ভালো। স্পষ্ট সীমারেখা অনেক সময় নীরবে ক্ষোভ পুষে রাখার চেয়ে বেশি সম্মান এনে দেয়।
২. রাগ জমতে দেওয়ার আগে কথা বলুনমানুষের অন্যতম বড় ভুল হলো, সহ্যের সীমা শেষ না হওয়া পর্যন্ত চুপ করে থাকা। তখন আবেগ অনেক বেড়ে যায়, ফলে পরিস্থিতি সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে।
Advertisement
কোনো সহকর্মী যদি বারবার আপনার কথা কেটে দেন, আপনার মতামত উপেক্ষিত হয় বা কাজের চাপ অযৌক্তিকভাবে বেড়ে যায়, তাহলে শুরুতেই বিষয়টি নিয়ে কথা বলুন। দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ নিয়ে আবেগপূর্ণ বিতর্কে জড়ানোর চেয়ে সমস্যা ছোট থাকতেই শান্তভাবে আলোচনা করা অনেক বেশি কার্যকর।
৩. আত্মবিশ্বাসী ভাষা ব্যবহার করুন, ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গি নয়ক্ষমা চেয়ে বা দ্বিধা প্রকাশ করে কথা শুরু করার বদলে নিজের মতামত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে প্রকাশ করার অভ্যাস গড়ে তুলুন। যেমন, ‘দুঃখিত, আমি শুধু ভাবছিলাম যদি আমরা...’ বলার পরিবর্তে বলতে পারেন, ‘আমি এ বিষয়ে আলোচনা করতে চাই’ অথবা ‘এ বিষয়ে আমার ভিন্ন একটি মতামত রয়েছে।’
আত্মবিশ্বাসীভাবে কথা বলার অর্থ কখনোই আক্রমণাত্মক হওয়া নয়। বরং শান্ত, স্পষ্ট ও সরাসরি ভাষায় নিজের অবস্থান তুলে ধরলে অন্যরা বুঝতে পারে যে আপনি নিজের মতামতকে গুরুত্ব দেন। আপনি যত পরিষ্কার ও দৃঢ়ভাবে নিজের কথা বলবেন, অন্যরাও আপনার ভাবনা, উদ্বেগ ও মতামতকে তত বেশি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করবে।
৪. নিজের প্রাপ্য কৃতিত্ব নিজেই তুলে ধরুনঅনেকেই বিশ্বাস করেন, ভালো কাজ করলে সেটি একসময় না একসময় সবার নজরে আসবেই। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে বাস্তবতা সব সময় এমন হয় না। ব্যস্ততা, একাধিক প্রকল্প কিংবা বড় টিমে কাজ করার কারণে অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ অবদানও আড়ালে থেকে যায়। তাই আপনি যদি কোনো প্রকল্পের নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন, জটিল কোনো সমস্যার সমাধান করে থাকেন বা প্রতিষ্ঠানের সাফল্যে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে থাকেন, তাহলে মূল্যায়ন সভা, পারফরম্যান্স রিভিউ বা অগ্রগতি প্রতিবেদনে নিজের কাজের কথা তুলে ধরা একেবারেই স্বাভাবিক।
নিজের অর্জনের কথা জানানো অহংকার নয়। বরং এটি আপনার পরিশ্রম, দক্ষতা এবং দায়িত্বশীলতার যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করার একটি পেশাদার উপায়।
আরও পড়ুন ক্যারিয়ারে সাফল্য পেতে নিয়মিত ছুটি নিন ৫. অস্বস্তিকর আলোচনাতেও শান্ত থাকুননিজের পক্ষে কথা বলার অর্থ তর্কে জয়ী হওয়া নয়। বরং নিজের অবস্থান স্পষ্টভাবে জানানো, তবে আত্মসংযম বজায় রেখে। আলোচনা উত্তপ্ত হয়ে উঠলে কণ্ঠস্বর উঁচু করা বা আবেগের বশে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেওয়া থেকে বিরত থাকুন। মনোযোগ দিয়ে অন্যের কথা শুনুন, নিজের অবস্থান পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করুন এবং আবেগের পরিবর্তে তথ্যের ওপর গুরুত্ব দিন।
আরও পড়ুন বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ৩-৩-৩ নীতি কেন জরুরিমানুষ সাধারণত তখনই বেশি ইতিবাচক সাড়া দেয়, যখন তারা অনুভব করে যে এটি সম্মানজনক আলোচনা, কোনো সংঘাত নয়।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া
আরএএইচইউএল/ এসএকেওয়াই