দেশজুড়ে

ভিডিও ঘিরে সমালোচনা: যা বলছেন শিক্ষক বিউটি পাল

সিলেট নগরীর আম্বরখানা কলোনী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে ৭-৮ জন শিক্ষার্থীকে নিয়ে ছাতা হাতে দাঁড়িয়ে রয়েছেন একজন শিক্ষক। শিক্ষকের চারপাশে ঘুরে ঘুরে শিক্ষার্থীরা গাইছে- ‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে…’। দিপা মন্ডল নামে আরও একজন শিক্ষক স্কুল মাঠে বৃষ্টিতে ভেজার ভিডিও ধারণ করে ফেসবুকে পোস্ট করেছেন। সঙ্গে যোগ করেছেন একই গান।

Advertisement

ফেসবুক স্ক্রল করলেই চোখে পড়ছে এই গানের নিজর ভিডিও। এখন এটি অভিনব এক প্রতিবাদ। শুধু সিলেট না, দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষক, সুশীল ও সংস্কৃতিকর্মীরা গানটি গেয়ে নেচে ভিডিও ধারণ করে ফেসবুকে ছড়িয়ে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। 

এই প্রতিবাদের সূত্রপাত সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিউটি রানী পালের একটি রিল ভিডিও থেকে। গত বৃহস্পতিবার শিক্ষক বিউটি রানী পালের একটি রিল ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। 

আরও পড়ুন ‘আজ কেন মন উদাসী’ গানে নেচে ভাইরাল ‘শ্রেষ্ঠ শিক্ষিকা’ বিউটি পাল

এরপর তাকে ঘিরে শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা। তবে সমালোচনার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষক, লেখক, সাংবাদিক ও নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ তার প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছেন। এমনকি দেশের বিভিন্ন এলাকার শিক্ষকরা নিজেদের বিদ্যালয়ের সামনে একই ধরনের ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করে অভিনব পন্থায় শিক্ষক বিউটি রানীর পাশে দাঁড়িয়েছেন। একইসঙ্গে রিল ভিডিও ধারণ করে ফেসবুকে পোস্ট করাকেও অন্যায় হিসেবেও দেখছেন না শিক্ষা কর্মকর্তারা।

Advertisement

তবে সারাদেশের সংস্কৃতিপ্রেমি ও সুশীল ব্যক্তিরা শিক্ষক বিউটি রানীর পাশে দাঁড়ালেও তার প্রতিষ্ঠানের আশেপাশের এলাকার স্থানীয় বাসিন্দারা এখনও এই বিষয়টিকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লেখালেখি করছেন। ফেঞ্চুগঞ্জের স্থানীয় কিছু ব্যক্তি ফেসবুক লাইভে এসে তার সমালোচনা করছেন, যা তাকে আরও হেনস্তা করছে। এ অবস্থায় কর্মস্থলে নিজেকে অনিরাপদ মনে করছেন প্রধান শিক্ষক বিউটি রানী পাল। 

সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী ও সুনামগঞ্জ জেলার বাসিন্দা বিউটি রানী পাল ২০১৬ সালে ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। চাকরি জীবনের শুরুর পর থেকে টানা ১০ বছর ধরেই রয়েছেন একই প্রতিষ্ঠানে। অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে শিক্ষকতা করে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের কাছে বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। ২০২৬ সালে পেয়েছেন সিলেট জেলার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক পদক।

বিউটি রানী পাল দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়ের পাঠদান, শিক্ষার্থীদের শরীরচর্চা, নাচ-গানের মাধ্যমে পাঠ শেখানো, বৃক্ষরোপণ ও পরিবেশবিষয়ক নানা কার্যক্রমের ভিডিও নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে প্রকাশ করে আসছিলেন। সম্প্রতি বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে হাঁটার একটি রিল ভিডিও পোস্ট করার পর সেটিকে কেন্দ্র করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়।

জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার তিনি নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি গানের সঙ্গে স্কুল প্রাঙ্গণে হাঁটার দৃশ্যসংবলিত রিল প্রকাশ করেন। ভিডিওটিতে তাকে শাড়ি পরিহিত ও পরিপাটি অবস্থায় দেখা যায়। পরে ভিডিওটি একটি ফেসবুক পেজ থেকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে প্রচার শুরু করলে তা দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে তিনি ভিডিওটি নিজের অ্যাকাউন্ট থেকে সরিয়ে নেন।

Advertisement

‘ফেঞ্চুগঞ্জ প্রতিদিন’ পেজে প্রকাশিত ভিডিও পর্যালোচনায় দেখা যায়, সেখানে ভিডিওটির সঙ্গে কৃত্রিম কণ্ঠ ব্যবহার করে সংবাদধর্মী উপস্থাপনা করা হয়েছে। ভিডিওতে স্থানীয় সচেতন মহল ও অভিভাবকদের প্রতিক্রিয়ার কথা উল্লেখ করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য উপস্থাপন করা হয়নি। একই সঙ্গে একটি লিখিত প্রতিবেদনে সাধারণ হাঁটার দৃশ্যকে ‘অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। 

এ ঘটনায় শুক্রবার ফেঞ্চুগঞ্জ থানায় ‘ফেঞ্চুগঞ্জ প্রতিদিন’ ও আসিফ ইকবাল হিরণ নামে এক ব্যক্তির ফেসবুক পেজের বিরুদ্ধে সাধারণ ডায়রি করেছেন ওই শিক্ষক। ফেঞ্চুগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. লুৎফুর রহমান বলেন, ‘একজন শিক্ষক ভিডিও ভাইরাল নিয়ে সাধারণ ডায়রি করেছেন। এ বিষয়ে পুলিশ কাজ করছে।’ 

আরও পড়ুন ‘আজ কেন মন উদাসী হয়ে’ গানে শিক্ষিকার রিলস, তদন্ত কমিটি

প্রধান শিক্ষক বিউটি রানী পাল অভিযোগ করেন, ‘ফেঞ্চুগঞ্জ প্রতিদিন’ নামের একটি ফেসবুক পেজ তার ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট থেকে ভিডিওটি ডাউনলোড করে নেতিবাচকভাবে প্রচার করেছে। ওই পেজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আসিফ ইকবাল হিরণ তাকে সাইবার বুলিং ও সামাজিকভাবে হেনস্তা করেছেন। নতুন করে ‘প্রিয় ফেঞ্চুগঞ্জ’ নামে আরেকটি ফেসবুক পেজ থেকে নেতিবাচক হিসেবে ভিডিও প্রচার করা হচ্ছে। যদি অভিযুক্ত ব্যক্তি তার ভুল স্বীকার না করেন, তবে সাইবার নিরাপত্তা আইনে মামলা করতে বাধ্য হবেন বলে জানান শিক্ষক বিউটি রানী পাল।

বর্তমানে চরম মানসিক বিপর্যস্ত অবস্থার মধ্যে রয়েছেন উল্লেখ করে বিউটি রানী পাল জাগো নিউজকে বলেন, ফেঞ্চুগঞ্জের স্থানীয় কিছু ব্যক্তি ফেসবুক লাইভে এসে তার সমালোচনা করছেন, যা তাকে আরও হেনস্তা করছে। এ অবস্থায় কর্মস্থলে আসা-যাওয়ার ক্ষেত্রে নিজেকে অনিরাপদ মনে করছেন তিনি।

বিউটি পাল মনে করেন, শিক্ষকদের কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডি নেই; তারা দেশের এবং সমাজের সব মানুষের জন্য। আমরা যদি একদিকে আধুনিক ও উন্নত শিক্ষাব্যবস্থার কথা বলি, আর অন্যদিকে মানসিকতায় সংকীর্ণ থাকি, তাহলে দেশকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে আমাদের চিন্তাভাবনাতেও পরিবর্তন আনতে হবে।

তিনি বলেন, ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে মুঠোফোনে বিষয়টি জানিয়েছেন এবং ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ করেছেন। সারাদেশের মানুষ এবং শিক্ষকরা তার পাশে দাঁড়িয়ে এই ঘটনার প্রতিবাদ করায় সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।

সিলেট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাখাওয়াত এরশেদ জাগো নিউজকে বলেন, এ বিষয়টিকে আমরা অন্যায় হিসেবে দেখছি না। এ ঘটনায় কোনো তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়নি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। প্রয়োজন হলে তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে।

বিষয়টি নিয়ে রোববার সিলেট সফরকালে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ সাংবাদিকদের জানান, তিনি ভিডিওটি দেখেননি। তবে অন্যদের কাছ থেকে জেনেছেন, এতে কোনো অশ্লীলতা নেই।

তিনি বলেন, ‘গান গাওয়া বা এমন একটি ভিডিও প্রকাশ করাকে আমি অন্যায় মনে করি না। কেউ একমত হোক বা না হোক, আমার অবস্থান সেটিই।’

এদিকে শিক্ষক বিউটি রানী পালের ভিডিওকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নেতিবাচকভাবে ছড়ানো প্রতিবাদে সরব শিক্ষক ও সংস্কৃতিকর্মীসহ সুশীল সমাজ।

আবুল হোসেন নামে একজন স্কুল শিক্ষক লিখেছেন, ‘ভিডিওর বিষয়টি এতো সাধারণ যে, ইচ্ছা করলে নিন্দুকেরা ছাড় দিতে পারতো কিন্তু দেয়নি। কারণ তিনি একজন সুশ্রী মহিলা। ভালো ভিউ হবে। আর এখন ভিউয়ের জন্য টিকটকার/কথিত সাংবাদিক যে কাউকে দিগম্বর করে দিতে পারে।’

রোকসানা নামে একজন ফেসবুক পোস্টে লিখেন, ‘একজন ম্যাডামকেও হেনস্তার চেষ্টা করবেন না। প্রতিটি সাহসী শিক্ষকই একেকজন বিউটি রানী। আমরা মাথা নত করা শিক্ষা দেই না, মাথা উঁচু করে এগিয়ে যাওয়ার শিক্ষা দেই। আমরা মাথা নত করব না, সম্মান নিয়ে এগিয়ে যাবো।’

সিলেট-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য হাবিবুর রহমান হাবিব তার ফেসবুক পোস্টে লিখেন, ‘শিক্ষক বিউটি রানীর একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে তাকে বুলিং ও মানসিকভাবে হেনস্তা করা হয়েছে। এই ঘটনার প্রতিবাদে সারা বাংলাদেশের শিক্ষক সমাজ রিল ও টিকটকের মাধ্যমে সংহতি প্রকাশ করেছেন। ফেঞ্চুগঞ্জ শান্তি, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সম্প্রীতির জনপদ। সেই ফেঞ্চুগঞ্জে এমন একটি ঘটনা শুধু দুঃখজনকই নয়, আমাদের সামাজিক মূল্যবোধের জন্যও লজ্জাজনক।’

আহমেদ জামিল/এফএ