জাতীয়

ধর্ষণ-বাল্যবিয়েসহ বিভিন্ন সহিংসতায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে কন্যাশিশুরা

দেশে নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে একটি গভীর জাতীয় সংকটে পরিণত হয়েছে বলে এক সমীক্ষা প্রতিবেদনে জানিয়েছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ।

Advertisement

প্রতিবেদনে বলা হয়, ধর্ষণ, দলবদ্ধ ধর্ষণ, ধর্ষণের চেষ্টা, হত্যা, আত্মহত্যা, যৌতুক ও বাল্যবিবাহসহ বিভিন্ন ধরনের সহিংসতার ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে নারী ও কন্যাশিশুরা।

বিচারহীনতার সংস্কৃতি, প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ, তদন্তে বিলম্ব ও ভুক্তভোগীকেই দোষারোপ করার প্রবণতা অপরাধীদের দায়মুক্তিকে উৎসাহিত করছে বলে মনে করছে মহিলা পরিষদ।

আরও পড়ুন নানি না থাকায় ৭ বছরের নাতনিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ, গ্রেফতার ১

সোমবার (২৭ জুলাই) সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী মিলনায়তনে ‘বাংলাদেশে নারী ও কন্যা নির্যাতন চিত্র-২০২৫’ শীর্ষক সমীক্ষা প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা এসব কথা বলেন।

Advertisement

সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব ও সঞ্চালনায় ছিলেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম। সমীক্ষার তথ্য উপস্থাপন করেন সংগঠনটির সিনিয়র প্রশিক্ষণ ও গবেষণা কর্মকর্তা আফরুজা আরমান।

সমীক্ষা অনুযায়ী, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ সংরক্ষিত ১৪টি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতার ঘটনার ভিত্তিতে এ বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

আরও পড়ুন শিশুকে যৌন হয়রানির অভিযোগে মুদি দোকানি গ্রেফতার

প্রতিবেদনে বলা হয়, কন্যাশিশুরা দলবদ্ধ ধর্ষণ (১৪২), আত্মহত্যা (২০৩) এবং ধর্ষণের চেষ্টা (১১৭) ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। অন্যদিকে প্রাপ্তবয়স্ক নারীরা হত্যার (৭৫৬), ধর্ষণের (৩৭৬) এবং যৌন হয়রানির (১২৫) ঘটনায় সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছেন।

এতে আরও বলা হয়, বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে- শৈশবে যৌন সহিংসতার ঝুঁকি বেশি থাকলেও বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হত্যা ও আত্মহত্যার ঝুঁকিও বৃদ্ধি পাচ্ছে। পেশাভিত্তিক বিশ্লেষণে গৃহিণীরা হত্যার ৫৮ শতাংশ, আত্মহত্যার ৬৩ শতাংশ এবং যৌতুক-সংক্রান্ত সহিংসতার ৯৪ শতাংশ ঘটনার শিকার হয়েছেন।

Advertisement

অন্যদিকে শিক্ষার্থী কন্যাশিশুরা ধর্ষণের চেষ্টা (৮০ শতাংশ), আত্মহত্যা (৬৭ শতাংশ), দলবদ্ধ ধর্ষণ (৩৯ শতাংশ) এবং বাল্যবিবাহের (১০০ শতাংশ) ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

আরও পড়ুন কিস্তির টাকা তুলতে এসে শিশুকে ধর্ষণ, এনজিওকর্মী আটক

সমীক্ষায় আরও উঠে এসেছে, গৃহ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান- উভয় স্থানই নারী ও কন্যাশিশুর জন্য ক্রমেই অনিরাপদ হয়ে উঠছে। পাশাপাশি বিচারহীনতার সংস্কৃতি, তদন্তে বিলম্ব, সাক্ষ্য-প্রমাণের দুর্বলতা এবং সামাজিকভাবে ভুক্তভোগীকেই দায়ী করার প্রবণতা অপরাধীদের দায়মুক্তি নিশ্চিত করছে।

সংবাদ সম্মেলনে ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, সমীক্ষার পর্যবেক্ষণ দেশের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক বাস্তবতা তুলে ধরেছে। ছয় বছরের শিশু থেকে শুরু করে ষাটোর্ধ্ব নারী—জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে নারীরা সহিংসতার ঝুঁকিতে রয়েছেন। বিশেষ করে ছয় থেকে নয় বছর বয়সী শিশুকন্যাদের ধর্ষণের ঘটনা সবচেয়ে বেশি হওয়া সমাজের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়।

তিনি বলেন, এই চিত্র প্রমাণ করে ধর্ষণের জন্য কখনোই ভুক্তভোগী দায়ী নয়; দায়ী অপরাধী এবং সেই সামাজিক মানসিকতা, যা অপরাধকে প্রশ্রয় দেয়। একই সঙ্গে ধর্ষণের পাশাপাশি হত্যার ঘটনাও বেড়ে যাওয়ায় নারীদের জীবন আরও অনিরাপদ হয়ে উঠছে।

আরও পড়ুন ১১ বছরের শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে কিশোর গ্রেফতার

গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শুধু ঘটনা প্রকাশ করাই যথেষ্ট নয়; সহিংসতার সামাজিক ও কাঠামোগত কারণও তুলে ধরতে হবে। পাশাপাশি ভুক্তভোগীর পরিচয় ও ব্যক্তিগত তথ্যের পরিবর্তে অপরাধীদের পরিচয় ও জবাবদিহি সামনে আনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

ডা. ফওজিয়া মোসলেম আরও বলেন, ধর্ষণ, হত্যা ও এ ধরনের সহিংসতা ফৌজদারি অপরাধ। এসব ঘটনার বিচার স্থানীয় সালিশের মাধ্যমে নিষ্পত্তির চেষ্টা আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। আদালতের মাধ্যমেই এসব অপরাধের বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, নারী নির্যাতন শুধু নারীর সমস্যা নয়; এটি সমাজের সামগ্রিক নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের প্রশ্ন। তাই নারী ও কন্যাশিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর আইন প্রয়োগ, দ্রুত বিচার, জবাবদিহি এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে সরকার, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ ও নারী আন্দোলনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

ইএইচটি/বিএ